যৌনতা কি কখনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে?

আধুনিক সমাজে অনেক কিছুই বদলেছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বীকৃতি বেড়েছে, কিন্তু যৌনতা এখনো একটি সামাজিক বাধ্য বাধকতার সীমার মধ্যে বন্দি। কিন্তু কেন ?

যৌনতা দীর্ঘকাল ধরে মানব সমাজে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও, তার প্রকাশ্য রূপ বরাবরই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে, আর সমাজের অস্তিত্ব যতদিন আছে এই বাধা আর প্রতিরোধের মুখে তাকে পড়তেই হবে । মাঝে মাঝে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় , সেটা হলো, প্রকাশ্য যৌনতা বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কিছু সমাজ ভালভাবে গ্রহণ করে না। কখনও তা প্রকাশ্যে চলে এলেও সমাজ এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়, যেন সমাজ ধ্বংসের কোনো কাজ হয়ে গেছে। এই ব্যাপারটার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । এই সম্ভাব্য কারণ যতটা না ধার্মিক বা ধর্ম জড়িত, তার চেয়ে বেশি সামাজিক আর সামাজিক মূল্যবোধের রক্ষার মাত্রাটা বেশি । হয়ত এই প্রকাশ্য যৌনতা রুখতে গিয়ে সামাজিক মানুষজন ধর্মের আশ্রয় নেয় কিন্তু সেটা আসলে সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার তাগিদই যেন বেশি থাকে। কারন সামাজিক মূল্যবোধের রক্ষা এক ধরনের ক্ষমতা চর্চাকে বৈধতা দেয় আর ধর্ম হচ্ছে এই ক্ষমতা প্রয়োগের একটি মাধ্যম মাত্র।

তবে মুল কথায় ফিরে আসা যাক! যদিও এখন প্রেম-ভালোবাসার মতো কিছু বিষয় সমাজ অনেকটাই মেনে নিচ্ছে কারন আধুনিক রাষ্ট্র এত বেশি সমাজে প্রেশার ক্রিয়েট, সামাজিকতা কে নিয়ন্ত্রন করতে চাচ্ছে যে সমাজ কিছু ব্যক্তি স্বাধীনতা কে গ্রহন করছে। এই উত্তরাধুনিক রাষ্ট্রে সমাজ আধুনিকতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ইচ্ছার প্রকাশ এবং আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দিলেও সমাজ রাষ্ট্রের প্রেশার কে বাইপাস করে, এগুলাকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এক ধরনের মোরাল পুলিশিং চালায় ।

তবে সমাজ রাষ্ট্রের কিছু মূল্যবোধ কে গ্রহণ করলেও, এমন কিছু সম্পর্ক বা আচরণ রয়েছে বা নয়া মূল্যবোধ , যেগুলো সমাজ ও সামাজিকতা এখনো গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এসব বিষয় সমাজ ঘৃণা করে, কিন্তু সরাসরি বাধা দেয় না ,মাঝে মাঝে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে। যেমন, অবিবাহিতদের মধ্যকার মিউচুয়াল সম্পর্ক বা প্রেম ,এটা এখন অনেকাংশেই স্বীকৃতি পেয়েছে বলা যায়। কারণ সমাজ এ ধরনের সম্পর্কে তার আগের মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে সমাজ সব ধরনের মিউচুয়াল রিলেশনকে গ্রহণ করবে। সেটা কিন্তু নয়। কারণ, সমাজ জানে ,এই পর্যায়ের পর আরও সুযোগ দিলে তা সমাজের অস্তিত্ব ও তার গঠিত কাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে আর এই কারণেই যে কোনো আনকনভেনশনাল মিউচুয়াল রিলেশনকে সমাজ তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। উদাহরণস্বরূপ, বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম বা সমকামিতার মতো বিষয়। আর ঠিক এজন্যে ওপেন সোসাইটিতেও এ ধরনের বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

মানুষের মনে রাখা উচিত, যৌনতা যতই ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে পড়ুক না কেন, প্রকাশ্য যৌনতার অধিকার কোনো সমাজই সহজে গ্রহণ করবে না। যৌনতা ব্যক্তিগত হলেও যখন তা প্রকাশ্যে আসে, তখন সমাজ তার সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কাঠামোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে বলে মনে করে। ফলে, ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সামাজিক নৈতিকতা , এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়।। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কিছুকে বৈধতা দিলেও সমাজ প্রয়োজনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারে

এই ধরনের কোনো সামাজিক রীতিকে সমাজ সহজে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। রাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েও সমাজ এসব প্রতিহত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকাকে বলা হয় ওপেন সোসাইটি এবং যারা কোন সামাজিকতাকেই পাত্তা দেয় না , যেখানে মনে করা হয় মানুষ সামাজিকতার বাঁধনকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু দেখা গেলো, ঠিক এই সমাজেই এল/জি/বি/টি+ এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের মতো ইস্যুতে এমন এক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে ,এই মুক্ত সমাজের মানুষেরাই এক ধরনের পাগলাটে প্রেসিডেন্টকেও নির্বাচিত করে ফেলেছে

আনকনভেনশনাল যৌন সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে বা সামাজিক পরিসরে দৃশ্যমান হয়, তখন তা কেবল নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিরুদ্ধে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সুতরাং যারা ভাবছেন এমন এক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে এইসব নতুন সামাজিকতা সহজে গৃহীত হবে, তারা একটু ভুল ভাবছেন। এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে আনা প্রায় অসম্ভব। সমাজের মানুষ যে কোনো উপায়েই হোক না কেন, এর বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা তৈরি করবে। আর আপনি যতই মুক্ত সমাজ গঠন করেন না কেন, নতুন শিক্ষা আর সামাজিকীকরণ নিয়ে আসেন না কেন ? সব কিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে । পশ্চিমা জগতের প্রতিক্রিয়ায় তার প্রমাণ যেখানে না আছে ধর্মের কোন প্রভাব, না সামাজিক কোন বন্ধনের ছিটে ফোটা তবুও এই ধরনের আনকনভেনশনাল সামাজিক ধ্যান ধারনা কে তারা ছুড়ে ফেলেছে আর আমাদের মত ধর্মীয় প্রভাবাধীন আর কঠোর সামাজিক বন্ধনের দেশে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে তাতো ভাবায় যায় না

 

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...