বিবাহ কেন?

 একটা স্ট্রং সোসাইটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিবাহ। আমাদের সমাজ বর্তমানে একটি বড় শিফটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর এই শিফটটি হচ্ছে পার্সোনাল রাইটসের দিকে। অর্থাৎ ব্যক্তি, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা এবং ব্যক্তি-স্বেচ্ছাচারিতাই এখন কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফলে সবকিছুই ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ব্যক্তি তার জীবনে অন্য কাউকে, কিংবা অন্য কারো হস্তক্ষেপকে কামনা করছে না। এমনকি সে মনে করছে না যে তার জীবনে একজন পার্টনার দরকার, যে তার চিন্তা, চেতনা, ইন্টিমেসি, রিলেশনশিপ ও মনোভাবের জগতে তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। 

এর ফল হিসেবে বিবাহের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আন্তরিকতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এখনও আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, দরিদ্র সমাজগুলোতে বিবাহের গুরুত্ব ও প্রচলন অনেকাংশে টিকে আছে। এর কারণ এই সমাজগুলোতে এখনও মানুষের পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, ধনী দেশগুলোতে বা অর্থনৈতিকভাবে অ্যাডভান্সড আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে যেমন ইউরোপীয় বা আমেরিকান সমাজে, বিবাহের প্রচলন ও সামাজিক গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেখানে ডিভোর্স, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, পার্সোনাল রাইটস, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রবণতা দ্রুত বেড়ে চলেছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও সামাজিক সচলতা।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মাথায় রাখতে হবে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেই সমাজ টিকে থাকবে, এমন নয়। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালেই দেখতে পাই, সেখানে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, সমাজের কোর ভ্যালু ও নৈতিকতার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। এর বিপরীতে, দরিদ্র কিংবা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে সংযুক্ত সমাজগুলোতে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতার চেয়ে কালেক্টিভনেস বা সমষ্টিগত চেতনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কারণেই এসব সমাজে মানুষ বিবাহের প্রতি বেশি ঝুঁকে থাকে।
আমি এখানে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা সচ্ছলতার দোহাই দিয়ে বিবাহের তুলনা করছি না। আমার মূল বক্তব্য হলো, একটি স্ট্রং সোসাইটির পূর্বশর্তই হচ্ছে বিবাহ। মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা ও কাঠামোর কেন্দ্রে বিবাহের প্রচলন রয়েছে। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কিছু মৌলিক নিড নিয়ে জন্মায়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শারীরিক ও যৌন চাহিদা। এই চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের দরকার ইন্টিমেসি ও সম্পর্ক। বর্তমানে এই সম্পর্ক অপোজিট সেক্স বা সেম সেক্স, যাই হোক না কেন, মূল বিষয় অপরিবর্তিত থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিবাহ এই যৌন ও শারীরিক চাহিদাকে একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। সমাজ সবসময়ই প্রো-শৃঙ্খল, প্রো-স্ট্রাকচার্ড এবং প্রো-কালেক্টিভ। সমাজ কখনোই বিশৃঙ্খলা, চরম ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা, স্বেচ্ছাচারিতা বা একাকিত্বকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে না। কারণ সমাজ জানে, এই প্রবণতাগুলো তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তাই সমাজ এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে মানুষকে একটি মেলবন্ধনের মধ্যে আনা হয়। এই সিস্টেমটাই হলো বিবাহ।

বিবাহ সমাজের প্রজনন ব্যবস্থা, ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণের ভিত্তি। সমাজের এক্সপ্যান্ড করার জন্য বিবাহ অপরিহার্য। শুধু একটি সমাজে নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানব সমাজেই এটি দেখা যায়। এমনকি তথাকথিত আদিম বা বর্বর সমাজেও, যখন একজন মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তার যৌন চাহিদা তৈরি হয়, তখন সমাজ তাকে একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সেই চাহিদা পূরণের অনুমতি দেয়। এই ব্যবস্থার রূপ ও রিচুয়াল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূল ধারণাটি এক, যাকে আমরা বিবাহ বলি। বিবাহ ছাড়া কোনো টেকসই মানব সমাজ বা মানব সংগঠন ইতিহাসে পাওয়া যায় না। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষ যখন একাকিত্বে থাকে, বিশেষ করে তরুণ বয়সে, যখন তার ওপর কোনো দায়িত্ব থাকে না এবং তার জীবনে কোনো পার্টনার থাকে না, তখন তার মধ্যে একধরনের সীমাহীনতা তৈরি হয়। সে মনে করে, তার কিছু হারানোর নেই। এই মানসিকতা থেকেই ব্যক্তির ধ্বংসাত্মক প্রবণতা, বর্বরতা ও অসভ্য আচরণ জন্ম নেয়।

কিন্তু বিবাহের মাধ্যমে যখন একজন মানুষ একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত পার্টনারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, তখন তার ভেতরে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। তার মধ্যে sense of belonging ও sense of attachment আসে। সে আর শুধু নিজের জন্য ভাবে না, সে তার পার্টনার, পরিবার এবং সন্তানের জন্য ভাবতে শেখে। সন্তান তখন তার উত্তরাধিকার, তার অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই সমাজ বিবাহকে এমন একটি সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা সহিংসতা কমায়, ব্যক্তি-স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যক্তি-ব্যক্তি সংঘর্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হ্রাস করে এবং মানুষকে দয়া, মায়া, মমতা ও একসাথে থাকার শিক্ষা দেয়।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...