মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ ও আসাদউদ্দিন ওয়াইসিদের মনোপলির রাজনীতি এবং ভারতীয় মুসলমানদের দুরবস্থা


আমার মনে হয়, ইন্ডিয়ান মুসলিমদের বর্তমান দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই অনেকাংশে দায়ী। দেখুন, গতকাল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে TMC এর বহিষ্কৃত নেতা হুমায়ুন কবির সাহেব বাবর নামে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা দেওয়ার দিনটিও তিনি বেছে নিয়েছেন ঠিক সেই দিন, যেদিন ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। হয়তো সেই আবেগ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মসজিদটি তিনি নিজস্ব অর্থে বা জনগণের চাঁদায় তৈরি করবেন। কিন্তু তিনি জেনে বা না জেনে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ করে দিলেন। আমার মনে হয়, এর ফলে মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব স্পষ্টভাবেই কমে যাবে এবং আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। শুধু হুমায়ুন কবির সাহেব নন ,এর আগের নির্বাচনেও পীরজাদা সিদ্দিক সাহেব মুসলিম ভোট মনোপলি করার কারণে মমতা ব্যানার্জিকে ব্যাকফুটে যেতে হয়েছিল। আর এই নির্বাচনেও আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সাহেবের মতো মুসলিম মনোপলি রাজনৈতিক দলগুলো রাজ্যে আসার ঘোষণা দিয়েছেন, এবং পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিমরা তাদের ভোট দেবে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এর ফলে স্বার্থন্বেষী এসব পলিটিক্যাল লিডারদের ভোট পাওয়াই শেষমেশ বিজেপিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব কিছুটা পড়বে এটা নিশ্চিত।

আমি খেয়াল করলাম, হুমায়ুন কবির সাহেবের এই মূর্খতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণ ভারতীয় মুসলিমদের কাছে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছে। তারা ভাবছেন তারা মহৎ কোনো কাজ করছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না এটা তাদের নিজেদের ধ্বংসের পথকেই আরও ত্বরান্বিত করছে। বাবর নামের এই মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে, এবং সামনের নির্বাচনে বিজেপির প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পাবে। দুঃখজনক হলো ,সাধারণ ভারতীয় মুসলিমরা যেন পাগলামি ও উন্মাদের মতো নিজ হাতে বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা তুলে দিচ্ছেন, অথচ তারা বিষয়টি উপলব্ধিই করতে পারছেন না।

এই কারণেই শিক্ষার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, এবং ইন্ডিয়ান মুসলিমদের এখন আরও সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের বুঝতে হবে , তারা কোথায় দাঁড়িয়ে, কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন এবং কোন আবেগ কখন ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহারে পরিণত করা যায় ,এ নিয়েও ভাবতে হবে।

কিছুদিন আগে বিহার নির্বাচনে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির পার্টি ছয়টি সিট জিতেছে। অনেক ভারতীয় মুসলিম এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন, এবং আমি লক্ষ্য করেছি অনেকেই সেটা সেলিব্রেটও করেছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, আগের টার্মে যেখানে ২৪ বা ২৫ জন মুসলিম বিধায়ক ছিলেন, এইবার তা নেমে ১২ কিবা ১৪ তে এসেছে। অর্থাৎ ওয়াইসি সাহেবের মুসলিম ভোট মনোপলির কারণে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা কার্যত অর্ধেকে নেমে গেছে। তার পার্টির সিট বাড়লেও মোট মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমে গেছে। সাধারণ মুসলিমদের এটা বোঝানো কঠিন। ফলে তারা এখনও বুঝে উঠতে চাইছেন না যে ওয়াইসি সাহেবের মতো নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সন্দেহের চোখে দেখাটা জরুরি। মুসলিম ভোট যত বেশি মনোপলি হবে, বিজেপির জন্য তত ভালো এটাই বিজেপির মূল কৌশল। তাই আপনি দেখবেন ,ওয়াইসি সাহেবদের মতো নেতাদের বিজেপি অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সাপোর্ট করে। বিজেপির মূল লক্ষ্য মুসলিমদের ভোট মুসলিমরাই পাক এবং হিন্দুদের ভোট বিজেপিতে পড়ুক। 

আপনি লক্ষ্য করবেন, ভারতের অধিকাংশ মুসলিম রাজনৈতিকভাবে খুব সীমিত ও পশ্চাদমুখী চিন্তাধারার মধ্যে আবদ্ধ। ঠিক আছে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সাহেব সাহসী, বিদ্বান, তাত্ত্বিক এবং বিতর্কিত নেতা হিসেবে মুসলিমদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে দরকারীও। কিন্তু তিনি যেভাবে নতুন নতুন প্রদেশে গিয়ে মুসলিমদের কার্যকর অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছেন, তা সন্দেহ তৈরি করে। আবার কংগ্রেসের মুসলিম নেতারাও তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেন না। তারা মুসলিমদের দুরবস্থা বোঝেন না, তবুও মুসলিম জনতা তাদেরকেই সমর্থন দিয়ে যান। আর কংগ্রেসি মুসলিম নেতাদের অকার্যকারিতায় হতাশ হয়েও মুসলিমরা ওয়াইসি সাহেবদের মতো মনোপলাইজড নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন।

এক্ষেত্রে আলেম-ওলামাদেরও কিছু দায় আছে। তারা নিজেদের কণ্ঠ যথাযথভাবে তুলতে পারছেন না। আরও মজার ব্যাপার হলো, ভারতের টিভি টকশোগুলোতে যেসব আলেম-ওলামাদের আনা হয়, তাদের দেখে মনে হয় না তারা আলেম-ওলামা; বরং কোনো মাস্তানসুলভ চরিত্র। তাদের কথা অগোছালো, উদ্দেশ্যহীন, মনে হয় যেন বিতর্ক তৈরির জন্যই আনা হয়। প্রশ্ন আসে ভারতের ১৬ কোটি মুসলিমের মধ্যে কি এমন কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা নেতা নেই, যারা বিপদগ্রস্ত ভারতীয় মুসলিমদের সঠিক পথ দেখাতে পারেন?

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...