আমাদের নয়া জেনারেশনের একটা ভুল ধারনা হচ্ছে যে বিয়ে হচ্ছে দুই জন ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের জোড় বা বন্ধন কিন্তু এইটা বুঝতে হবে যে বিয়ে হচ্ছে সামাজিক নির্ধারিত এক কাঠামো যা সমাজের অনেকেই এর সাথে জড়িত । আর ব্যক্তি যতই বলুক না কেন বা কাঙ্ক্ষিত ভাবে চাক না কেন, বিয়েতে আসলে সবার মতামত , ভালো লাগা - না লাগা , কিবা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে হবে...। তবে না হলেও যে সমাজের নিয়মের বরখেলাপ হয় তা কিন্তু না! কেন বিয়ে মানেই ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন । আর ব্যক্তি যা ইচ্ছা করে তার অধিকাংশই সমাজের সমষ্টির ইচ্ছা কে রিপ্রেজেন্ট করে। কেননা আন্থনি গিডেন্সের মতে আধুনিক সমাজে সম্পর্কগুলো হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধিমূলক (reflexive)। মানুষ তার সম্পর্ক নিয়ে ক্রমাগত ভাবে, পরীক্ষা করে, এবং তা নিয়ে তার পরিচয় গঠন করে। আর এইটা করতে গিয়ে ব্যক্তি যা করে তাকেই বলে সোশাল প্র্যাকটিস বা সামজিক অভ্যাস যা ব্যক্তিগত নয় বরং যৌথভাবে গঠিত। আর বিয়েতে আমরা এটারই প্রতিফলন দেখি । মানুষ কেন তার জীবনের স্থিতি বা বিবাহের জন্য একজন সংসারী, কালচারড এবং সমাজে সর্বাঙ্গীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ( প্রতিষ্ঠিত মানে অর্থনৈতিক ভাবে নয়, সামগ্রিক ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত) ব্যক্তিকে চায়? আর এই উত্তরে আমি দুইটা উত্তর খুজে পেয়েছি। যদিও এখানে আমি ধর্মকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে না দেখে, সামাজিক সমষ্টির আকাঙ্ক্ষা এবং আধুনিক জীবনের জটিলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছি। ।
মেয়েরা যেমন চায় তার স্বামী হোক দায়িত্বশীল, সংসারী, পরিবারের প্রতি যত্নশীল, আইডিয়াল হাজবেন্ড ! তারা আরও চায়, তার স্বামী হোক ঠিক তার মনের মতো, সুধুই তাকেই লক্ষ্য করবে, অন্য কোনো কিছুতে সে তার মত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করবে না । তেমনি অনেক ছেলেই
চায়, তার বউ হোক ধার্মিক, পর্দানশীল, কিবা ডিপ পিউর ক্যারেক্টার-এর অধিকারী,
আর যেন সে হয়ে ওঠে স্বামী-ভক্তা। এর পেছনে কি কোনো ধর্মীয়
কারণ আছে? ধর্ম হয়ত এখানে একটা ফ্যাকটর, বাট সোল রিজন নয়।
সুতরাং এর পিছনে রয়েছে মানুশের চিরায়িত ধ্যান-চিন্তা-চেতনা ও সাইকোলজি। এই আকাঙ্ক্ষার
পেছনে রয়েছে গোপন সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ , বিশেষ করে সমাজের কাঠামো
এবং সুপ্ত কালচারাল কোডসমূহের প্রতি মানুশের এক অকৃত্তিম বিশ্বাস। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে
সমাজ-মনোবিজ্ঞান বা 'সোশ্যাল সাইকোলজি'র আলোকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যদিও আমাদের সমাজের মানুষ এই বিষয়টিকে
রিলিজিয়ন-এর শেইপ দিতে চায়, কিন্তু যতই রিলিজিয়ন বা ধর্মের একটা শেইপ মানুষ দিতে চায় না কেন , এটা মূলত মানুষের ইনার বা
হিডেন সাইকোলজি । যা চিরায়িত ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে কোড অব সোশ্যাল ডিসিপ্লিন ও বলা
যেতে পারে। আবার যতই আমরা ভালোবাসা ও সম্পর্ককে ব্যক্তিগত বলি না কেন , এরা মুলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গঠিত। মিডিয়া, সিনেমা, মার্কেটিং এবং ধর্ম, পরিবার, বন্ধু ও সমাজ সব মিলে
একধরনের রোমান্টিক কল্পনার উৎপাদন করে, যেখানে সংসারী, ত্যাগী স্ত্রী অথবা প্রতিষ্ঠিত, ধর্মভীরু স্বামীকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তাছাড়া, মানুষ মূলত চায়, সবাই সমাজের নিয়ম মেনে চলুক, সোশ্যাল ডিসিপ্লিন ফলো করুক, সোশ্যাল অ্যানার্কি যাতে না হয়, এর জন্য সে সমাজের অন্য মানুষের কাছে অনেক এক্সপেকটেশন রাখে যাতে সেই ব্যক্তিও
সোশাল হইয়া উঠুক আর সমাজ কে অ্যানারকি থেকে বাচিয়ে দিক। সুতরাং, সেও চায়, তার আশেপাশের মানুষ বা তার
সোসাইটির সব সোশ্যাল ভ্যালুজ, আর কোড অব সোশ্যাল ইনস্টিটিউশনগুলোকে ফুল্লি এন্ডোর্স করুক।
তার ভাই, ফ্রেন্ডস, পরিবার, কিংবা তার আশেপাশের মানুষরা যখনই সোশ্যাল রুলসগুলোকে মেনে চলে, তখন তার মনে একটা
সাইকো-হ্যাপিনেস কাজ করে। আর এরই এক্সটেনশন হিসাবে মানুষ চায় তার পার্টনারও এমন
হোক। অর্থাৎ, মানুষ চায় তার ওয়াইফ বা হাজবেন্ড ঠিক তেমনই হোক যেমনটা সোসাইটি চায় । একজন
সামাজিক মানুষের হইয়া উঠুক তার পার্টনার। সে হয়ে উঠুক একজন সোশ্যাল সুপার ভ্যালু মেইন্টেইনড সোশ্যাল বিইং এবং ফলো করুক
হাজার বছরের মানুষের সুপ্ত সোশ্যাল কালচার। সে শুধু নিজের জীবনেই নয়, বরং তার চারপাশের মানুষদের
মধ্যেও একটি কাঙ্ক্ষিত সামাজিক চরিত্র প্রত্যাশা করে। সে চায়, তার পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী , এমনকি জীবনসঙ্গী , সবাই যেন সেই সামাজিক রুলস
বা সাংস্কৃতিক কোডের অনুসারী হন, যা সমাজের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
এই চিন্তাটাকে আপনি যেমন খুশি অন্য কোনো নামে ডিফাইন করতে পারেন। যেমন , আপনার সমাজে প্রতিষ্ঠিত বা
সবচেয়ে অনুসৃত ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে, অথবা আধুনিক সমাজচিন্তার আলোকে যেভাবে এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হয়, সেভাবেও একে সংজ্ঞায়িত করা
যেতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা যত না রিলিজিয়ন বা অন্য আর কোনো রিজন জড়িত, তার চেয়েও বেশি হচ্ছে মানুষের সোসাইটি-কেন্দ্রিক
চিন্তা-ভাবনা থেকে।
প্রত্যকের আমাদের চাওয়া আমরা এক একজন সোশালি আইডিয়াল হয়ে উঠি। আর আইডিয়াল
হাজবেন্ড বা আইডিয়াল ওয়াইফ তার বাইরে নয়। যাতে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক প্রতিষ্ঠা মানসিক
শান্তির জন্য কাজ করে যেতে পারি। আর এই জন্যেই আমরা আমাদের পাশের জনের কাছ থেকে এইটা
প্রত্যাশা করি ।
তাছাড়া আমাদের আধুনিক সম্পর্কগুলো হয়ে উঠেছে ভঙ্গুর, অনিশ্চিত এবং দ্রুত
পরিবর্তনশীল। এই অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ও
স্থায়িত্বের আকাঙ্ক্ষা জন্মে যা একজন সংসারী,
আস্থাশীল জীবনসঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। তাই আমরা দেখি, এমনকি স্বাধীনচেতা ব্যক্তি
ও লিবারেল মানসিকতার মানুষও একসময় এমন পার্টনার চায় যে নিয়মের মধ্যে থাকে। এ
এক ধরনের নিরাপত্তার সামাজিক আকাঙ্ক্ষা।