মানুষ কেন তার জীবনের স্থিতি বা বিবাহের জন্য একজন সংসারী, কালচারড এবং সমাজে সর্বাঙ্গীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে চায়?

আমাদের নয়া জেনারেশনের একটা ভুল ধারনা হচ্ছে যে বিয়ে হচ্ছে দুই জন ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের জোড় বা বন্ধন কিন্তু এইটা বুঝতে হবে যে বিয়ে হচ্ছে সামাজিক নির্ধারিত এক কাঠামো যা সমাজের অনেকেই এর সাথে জড়িত । আর ব্যক্তি যতই বলুক না কেন বা কাঙ্ক্ষিত ভাবে চাক না কেন, বিয়েতে আসলে সবার মতামত , ভালো লাগা - না লাগা , কিবা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে হবে...। তবে না হলেও যে সমাজের নিয়মের বরখেলাপ হয় তা কিন্তু না! কেন বিয়ে মানেই ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন । আর ব্যক্তি যা ইচ্ছা করে তার অধিকাংশই সমাজের সমষ্টির ইচ্ছা কে রিপ্রেজেন্ট করে। কেননা আন্থনি গিডেন্সের মতে আধুনিক সমাজে সম্পর্কগুলো হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধিমূলক (reflexive)মানুষ তার সম্পর্ক নিয়ে ক্রমাগত ভাবে, পরীক্ষা করে, এবং তা নিয়ে তার পরিচয় গঠন করে। আর এইটা করতে গিয়ে ব্যক্তি যা করে তাকেই বলে সোশাল প্র্যাকটিস বা সামজিক অভ্যাস যা ব্যক্তিগত নয় বরং যৌথভাবে গঠিত। আর বিয়েতে আমরা এটারই প্রতিফলন দেখি । মানুষ কেন তার জীবনের স্থিতি বা বিবাহের জন্য একজন সংসারী, কালচারড এবং সমাজে সর্বাঙ্গীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ( প্রতিষ্ঠিত মানে অর্থনৈতিক ভাবে নয়, সামগ্রিক ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত) ব্যক্তিকে চায়? আর এই উত্তরে আমি দুইটা উত্তর খুজে পেয়েছি। যদিও এখানে আমি ধর্মকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে না দেখে, সামাজিক সমষ্টির আকাঙ্ক্ষা এবং আধুনিক জীবনের জটিলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছি। ।

মেয়েরা যেমন চায় তার স্বামী হোক দায়িত্বশীল, সংসারী, পরিবারের প্রতি যত্নশীল, আইডিয়াল হাজবেন্ড ! তারা আরও চায়, তার স্বামী হোক ঠিক তার মনের মতো, সুধুই তাকেই লক্ষ্য করবে, অন্য কোনো কিছুতে সে তার মত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করবে না । তেমনি অনেক ছেলেই চায়, তার বউ হোক ধার্মিক, পর্দানশীল, কিবা ডিপ পিউর ক্যারেক্টার-এর অধিকারী, আর যেন সে হয়ে ওঠে স্বামী-ভক্তা। এর পেছনে কি কোনো ধর্মীয় কারণ আছে? ধর্ম হয়ত এখানে একটা ফ্যাকটর, বাট সোল রিজন নয়।

সুতরাং এর পিছনে রয়েছে মানুশের চিরায়িত ধ্যান-চিন্তা-চেতনা ও সাইকোলজি। এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে রয়েছে গোপন সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ , বিশেষ করে সমাজের কাঠামো এবং সুপ্ত কালচারাল কোডসমূহের প্রতি মানুশের এক অকৃত্তিম বিশ্বাস। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে সমাজ-মনোবিজ্ঞান বা 'সোশ্যাল সাইকোলজি'র আলোকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যদিও আমাদের সমাজের মানুষ এই বিষয়টিকে রিলিজিয়ন-এর শেইপ দিতে চায়, কিন্তু যতই রিলিজিয়ন বা ধর্মের একটা শেইপ মানুষ দিতে চায় না কেন , এটা মূলত মানুষের ইনার বা হিডেন সাইকোলজি । যা চিরায়িত ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে কোড অব সোশ্যাল ডিসিপ্লিন ও বলা যেতে পারে। আবার যতই আমরা ভালোবাসা ও সম্পর্ককে ব্যক্তিগত বলি না কেন , এরা মুলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গঠিত। মিডিয়া, সিনেমা, মার্কেটিং এবং ধর্ম, পরিবার, বন্ধু ও সমাজ সব মিলে একধরনের রোমান্টিক কল্পনার উৎপাদন করে, যেখানে সংসারী, ত্যাগী স্ত্রী অথবা প্রতিষ্ঠিত, ধর্মভীরু স্বামীকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়

তাছাড়া, মানুষ মূলত চায়, সবাই সমাজের নিয়ম মেনে চলুক, সোশ্যাল ডিসিপ্লিন ফলো করুক, সোশ্যাল অ্যানার্কি যাতে না হয়, এর জন্য সে সমাজের অন্য মানুষের কাছে অনেক এক্সপেকটেশন রাখে যাতে সেই ব্যক্তিও সোশাল হইয়া উঠুক আর সমাজ কে অ্যানারকি থেকে বাচিয়ে দিক। সুতরাং, সেও চায়, তার আশেপাশের মানুষ বা তার সোসাইটির সব সোশ্যাল ভ্যালুজ, আর কোড অব সোশ্যাল ইনস্টিটিউশনগুলোকে ফুল্লি এন্ডোর্স করুক

তার ভাই, ফ্রেন্ডস, পরিবার, কিংবা তার আশেপাশের মানুষরা যখনই সোশ্যাল রুলসগুলোকে মেনে চলে, তখন তার মনে একটা সাইকো-হ্যাপিনেস কাজ করে। আর এরই এক্সটেনশন হিসাবে মানুষ চায় তার পার্টনারও এমন হোক। অর্থাৎ, মানুষ চায় তার ওয়াইফ বা হাজবেন্ড ঠিক তেমনই হোক যেমনটা সোসাইটি চায় । একজন সামাজিক মানুষের হইয়া উঠুক তার পার্টনার। সে হয়ে উঠুক একজন সোশ্যাল সুপার ভ্যালু মেইন্টেইনড সোশ্যাল বিইং এবং ফলো করুক হাজার বছরের মানুষের সুপ্ত সোশ্যাল কালচার। সে শুধু নিজের জীবনেই নয়, বরং তার চারপাশের মানুষদের মধ্যেও একটি কাঙ্ক্ষিত সামাজিক চরিত্র প্রত্যাশা করে। সে চায়, তার পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী , এমনকি জীবনসঙ্গী , সবাই যেন সেই সামাজিক রুলস বা সাংস্কৃতিক কোডের অনুসারী হন, যা সমাজের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে

এই চিন্তাটাকে আপনি যেমন খুশি অন্য কোনো নামে ডিফাইন করতে পারেন। যেমন , আপনার সমাজে প্রতিষ্ঠিত বা সবচেয়ে অনুসৃত ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে, অথবা আধুনিক সমাজচিন্তার আলোকে যেভাবে এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হয়, সেভাবেও একে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা যত না রিলিজিয়ন বা অন্য আর কোনো রিজন জড়িত, তার চেয়েও বেশি হচ্ছে মানুষের সোসাইটি-কেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা থেকে

প্রত্যকের আমাদের চাওয়া আমরা এক একজন সোশালি আইডিয়াল হয়ে উঠি। আর আইডিয়াল হাজবেন্ড বা আইডিয়াল ওয়াইফ তার বাইরে নয়। যাতে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক প্রতিষ্ঠা মানসিক শান্তির জন্য কাজ করে যেতে পারি। আর এই জন্যেই আমরা আমাদের পাশের জনের কাছ থেকে এইটা প্রত্যাশা করি ।

তাছাড়া আমাদের আধুনিক সম্পর্কগুলো হয়ে উঠেছে ভঙ্গুর, অনিশ্চিত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের আকাঙ্ক্ষা জন্মে যা একজন সংসারী, আস্থাশীল জীবনসঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। তাই আমরা দেখি, এমনকি স্বাধীনচেতা ব্যক্তি ও লিবারেল মানসিকতার মানুষও একসময় এমন পার্টনার চায় যে নিয়মের মধ্যে থাকে। এ এক ধরনের নিরাপত্তার সামাজিক আকাঙ্ক্ষা


সংস্কারচিন্তার আগে: বাস্তবতা ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা

আপনি যদি সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার আনতে চান, তাহলে প্রথমেই ভাবতে হবে ,আপনি কার প্রতিনিধি হয়ে এই কথা বলছেন? আপনি কি এই সমাজের মানুষের বড় একটি অংশের মতামত তুলে ধরছেন? এবং আপনি যে সমাজে এই পরিবর্তন আনতে চাইছেন, সেই সমাজের বাস্তবতা আপনি কতটা বুঝে উঠেছেন?

শুধু কোনো প্রস্তাব দিলেই সেটা সংস্কার হয়ে যায় না। যেকোনো প্রস্তাব বাস্তবসম্মত, যুক্তিসম্মত ও প্রযোজ্য হতে হবে। আপনি যে বিষয়েই মতামত দিন না কেন, সেটা যেন সরাসরি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে না যায়, এই বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

হতে পারে আপনার কাছে ধর্ম একটা সহজ, বিতর্কযোগ্য কিবা হালকা কোন বিষয় মনে হতেই পারে , কিন্তু অনেক মানুষের জন্য ধর্ম মানে গভীর বিশ্বাস, আবেগ আর পরিচয়ের জায়গা। তাই নিজের মতামত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ধর্ম নিয়ে হালকা করে কথা বললে বা আঘাত করলে তা অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে

যদি আপনি এমন কোনো আইন বা মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা ধর্মের বিরোধী, তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে, এই পথে হাঁটা সহজ নয়। এমন উদ্যোগ সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা এবং সহিংসতার দিকেও নিয়ে যেতে পারে। অন্যভাবে বললে, ধর্মবিরোধী সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়াস রক্তপাত ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার পথেও গড়াতে পারে। অতএব, সংস্কারের প্রয়াসে দায়িত্বশীলতা, বাস্তববোধ , সামাজিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা অপরিহার্য

 

যৌনতা কি কখনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে?

আধুনিক সমাজে অনেক কিছুই বদলেছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বীকৃতি বেড়েছে, কিন্তু যৌনতা এখনো একটি সামাজিক বাধ্য বাধকতার সীমার মধ্যে বন্দি। কিন্তু কেন ?

যৌনতা দীর্ঘকাল ধরে মানব সমাজে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও, তার প্রকাশ্য রূপ বরাবরই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে, আর সমাজের অস্তিত্ব যতদিন আছে এই বাধা আর প্রতিরোধের মুখে তাকে পড়তেই হবে । মাঝে মাঝে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় , সেটা হলো, প্রকাশ্য যৌনতা বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কিছু সমাজ ভালভাবে গ্রহণ করে না। কখনও তা প্রকাশ্যে চলে এলেও সমাজ এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়, যেন সমাজ ধ্বংসের কোনো কাজ হয়ে গেছে। এই ব্যাপারটার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । এই সম্ভাব্য কারণ যতটা না ধার্মিক বা ধর্ম জড়িত, তার চেয়ে বেশি সামাজিক আর সামাজিক মূল্যবোধের রক্ষার মাত্রাটা বেশি । হয়ত এই প্রকাশ্য যৌনতা রুখতে গিয়ে সামাজিক মানুষজন ধর্মের আশ্রয় নেয় কিন্তু সেটা আসলে সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার তাগিদই যেন বেশি থাকে। কারন সামাজিক মূল্যবোধের রক্ষা এক ধরনের ক্ষমতা চর্চাকে বৈধতা দেয় আর ধর্ম হচ্ছে এই ক্ষমতা প্রয়োগের একটি মাধ্যম মাত্র।

তবে মুল কথায় ফিরে আসা যাক! যদিও এখন প্রেম-ভালোবাসার মতো কিছু বিষয় সমাজ অনেকটাই মেনে নিচ্ছে কারন আধুনিক রাষ্ট্র এত বেশি সমাজে প্রেশার ক্রিয়েট, সামাজিকতা কে নিয়ন্ত্রন করতে চাচ্ছে যে সমাজ কিছু ব্যক্তি স্বাধীনতা কে গ্রহন করছে। এই উত্তরাধুনিক রাষ্ট্রে সমাজ আধুনিকতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ইচ্ছার প্রকাশ এবং আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দিলেও সমাজ রাষ্ট্রের প্রেশার কে বাইপাস করে, এগুলাকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এক ধরনের মোরাল পুলিশিং চালায় ।

তবে সমাজ রাষ্ট্রের কিছু মূল্যবোধ কে গ্রহণ করলেও, এমন কিছু সম্পর্ক বা আচরণ রয়েছে বা নয়া মূল্যবোধ , যেগুলো সমাজ ও সামাজিকতা এখনো গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এসব বিষয় সমাজ ঘৃণা করে, কিন্তু সরাসরি বাধা দেয় না ,মাঝে মাঝে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে। যেমন, অবিবাহিতদের মধ্যকার মিউচুয়াল সম্পর্ক বা প্রেম ,এটা এখন অনেকাংশেই স্বীকৃতি পেয়েছে বলা যায়। কারণ সমাজ এ ধরনের সম্পর্কে তার আগের মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে সমাজ সব ধরনের মিউচুয়াল রিলেশনকে গ্রহণ করবে। সেটা কিন্তু নয়। কারণ, সমাজ জানে ,এই পর্যায়ের পর আরও সুযোগ দিলে তা সমাজের অস্তিত্ব ও তার গঠিত কাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে আর এই কারণেই যে কোনো আনকনভেনশনাল মিউচুয়াল রিলেশনকে সমাজ তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। উদাহরণস্বরূপ, বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম বা সমকামিতার মতো বিষয়। আর ঠিক এজন্যে ওপেন সোসাইটিতেও এ ধরনের বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

মানুষের মনে রাখা উচিত, যৌনতা যতই ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে পড়ুক না কেন, প্রকাশ্য যৌনতার অধিকার কোনো সমাজই সহজে গ্রহণ করবে না। যৌনতা ব্যক্তিগত হলেও যখন তা প্রকাশ্যে আসে, তখন সমাজ তার সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কাঠামোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে বলে মনে করে। ফলে, ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সামাজিক নৈতিকতা , এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়।। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কিছুকে বৈধতা দিলেও সমাজ প্রয়োজনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারে

এই ধরনের কোনো সামাজিক রীতিকে সমাজ সহজে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। রাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েও সমাজ এসব প্রতিহত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকাকে বলা হয় ওপেন সোসাইটি এবং যারা কোন সামাজিকতাকেই পাত্তা দেয় না , যেখানে মনে করা হয় মানুষ সামাজিকতার বাঁধনকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু দেখা গেলো, ঠিক এই সমাজেই এল/জি/বি/টি+ এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের মতো ইস্যুতে এমন এক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে ,এই মুক্ত সমাজের মানুষেরাই এক ধরনের পাগলাটে প্রেসিডেন্টকেও নির্বাচিত করে ফেলেছে

আনকনভেনশনাল যৌন সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে বা সামাজিক পরিসরে দৃশ্যমান হয়, তখন তা কেবল নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিরুদ্ধে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সুতরাং যারা ভাবছেন এমন এক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে এইসব নতুন সামাজিকতা সহজে গৃহীত হবে, তারা একটু ভুল ভাবছেন। এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে আনা প্রায় অসম্ভব। সমাজের মানুষ যে কোনো উপায়েই হোক না কেন, এর বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা তৈরি করবে। আর আপনি যতই মুক্ত সমাজ গঠন করেন না কেন, নতুন শিক্ষা আর সামাজিকীকরণ নিয়ে আসেন না কেন ? সব কিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে । পশ্চিমা জগতের প্রতিক্রিয়ায় তার প্রমাণ যেখানে না আছে ধর্মের কোন প্রভাব, না সামাজিক কোন বন্ধনের ছিটে ফোটা তবুও এই ধরনের আনকনভেনশনাল সামাজিক ধ্যান ধারনা কে তারা ছুড়ে ফেলেছে আর আমাদের মত ধর্মীয় প্রভাবাধীন আর কঠোর সামাজিক বন্ধনের দেশে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে তাতো ভাবায় যায় না

 

ভঙ্গুর সমাজ, স্বৈরাচারী স্বাধীন ব্যক্তিসত্বাঃ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত দ্বন্দ্ব

আগামী সমাজ কোন দিকে যাবে, সেটি নিয়ে মানুষ মানুষের চিন্তার শেষ নেই তবে মানুষ যে আগামীর সমাজ-সংস্কৃতি কোন দিকে যাবে তার ভবিষ্যৎ করবে না তাতো হয় না । কেউ বলেছে সভ্যতা ধ্বংস হবে, কেউ বলেছে প্রযুক্তি মানুষকে মুক্ত করবে, কেউ বলেছে মানুষই হবে ভবিষ্যতের ঈশ্বর। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা যেন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে, আমরা আসলে কোন ভাল দিকেই যাচ্ছি কিনা ? কারণ চারপাশের বাস্তবতা ক্রমাগত এমন এক জটিলতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যতের আভাসও যেন অন্ধকারময় । আর এই জটিল বাস্তবতা গুলা তৈরি করেছে আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও সামাজিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ভাঙন আর এগুলোর চাইতেও ভয়ংকর হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ব্যক্তি স্বৈরাচারীতা যা ব্যক্তির সমস্ত রকম চিন্তা-চেতনার ভাঙন ধরাচ্ছে। যদিও ব্যক্তি এখানে কিছুটা দ্বন্দ্বমূলক অবস্থায় রয়েছে সে দ্বন্দ্ব তার অভ্যন্তরীণ আরে বাহ্যিক বিভিন্ন বিষয়ে জড়িয়ে আছে তবে ব্যক্তি নিজেকে এত বেশি পাওয়ারফুল মনে করছে যার কোন কিছু কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ  মনে হচ্ছে না । এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এই উত্তরাধুনিক পৃথিবীতে ভাইরাসের মত ছড়িয়েছে আর এই বিষয় কোন আঞ্চলিক বা দেশ- মহাদেশে আবদ্ধ নেই, উন্নত কি অনুন্নত প্রায় সব দেশেই এই সমস্যা। আর এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা পৃথিবীতে হিউম্যানিজম বা হিউম্যান সেন্ট্রিক চিন্তার উত্থান ঘটিয়েছে …।

আজকের সমাজে ব্যক্তির ভূমিকা যতটা বাড়ছে, সমাজের শক্তি যেন ততটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যক্তি হয়ে উঠছে শক্তিশালী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী, নিজের জীবনের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা। পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকেও তার দূরত্ব বাড়ছে। ডেভিড হার্ভে যেভাবে নব্যউদারবাদের ভাষ্যে তুলে ধরেছেন, ব্যক্তির উপর বাজারের নির্ভরতা বাড়ছে ঠিক ততটাই, যতটা সমাজের ওপর নির্ভরতা কমছে।তাছাড়া ব্যক্তি এখন যতটা না স্বাধীন তার চেয়ে বেশিই পরাধীন এখন যদিও সে নিজেকে স্বাধীন ভাবে তবে সে মূলত এত পরিমাণ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে আটকে গেছে যে এই পুঁজিবাদী সমাজ ও পৃথিবীতে সেও মূলত ভোগকারী ছাড়া কিছুই নয় কেননা পুঁজিবাদী সমাজের সমস্ত পণ্যের ক্রেতা বা ভোগকারিই মূলত ব্যক্তি । যদিও ব্যক্তির কাছে মনে হয় সেই কেন্দ্র আর সবকিছু গৌণ তাইতো তার মধ্যে একটা প্রচণ্ডরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছে যার কাছে আর অন্যকিছুর কোন মূল্য নেই। ছেড়েছে। সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সম্প্রদায়ভিত্তিক সম্পর্ক ,সবকিছু যেন পিছিয়ে পড়ছে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে যদিও এধরনের চিন্তা ব্যক্তিকে দ্রুতই একাকী করে দিচ্ছে সাথে সাথে সমাজবিরোধীও । এই অবস্থাই তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি শোশাল চিন্তার সম্মীলনও ঘটছে। এধরনের পরিস্থিতি ব্যক্তিকে ভঙ্গুর আর নিরাপত্তাহীন করে। দুর্খাইমের ভাষায় বললে, সমাজের এই অবক্ষয় ও মূল্যবোধের ভাঙন আমাদের এক ধরনের Anomie-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন, বিচ্ছিন্ন এবং একা। এমন এক সময়ে যখন ব্যক্তি সর্বশক্তিমান, তখনই সে হয়ে উঠছে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন। বর্তমান সমাজ-রাষ্ট্র যেন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কাছে প্রতিনিয়ত কনফ্লিক্টের মূখামূখী হচ্ছে । তবে রাষ্ট্রের জন্য এইটা মোকাবিলা করার ঊপায় থাকলেও সমাজ সামহাও একটা সমস্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে । কারণ ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রের কাছে আইন আদালত থাকলেও সমাজের জন্য ব্যক্তিকে বাধ্য করবে এমন কোন কিছু নেই। সুতরাং সামনের দিন গুলা সমাজের জন্য অস্তিত্বের হুমকির মত হতে পারে। তবে রাষ্ট্রযে খূব ঝামেলার মধ্যে থাকবে না এইটা ভালভাবে বলা যায় না এখনও। কারণ ব্যক্তির স্বাধীনতার যে ধারনা এই সময় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে সহজে ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ভালোই বেগ পেতে হবে মণে হয়। কারণ রাষ্ট্র যদিও আইন করে ব্যক্তির সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে এইটা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য ব্যাকফায়ার করতে পারে বলে ধারনা করা যায়। আমরা ফুকোর Biopower ধারণাও রাষ্ট্রের জন্য আজকের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক দেখি । রাষ্ট্র কেবল আইন করে নয়, বরং জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ম  স্বাস্থ্য, যৌনতা, পরিবার, নিরাপত্তা, সবকিছুর ওপর ক্ষমতা চালিয়ে ব্যক্তি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু যখন এই কাঠামো ভেঙে পড়ে বা দুর্বল হয়, তখন একপ্রকার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম হয়। তখন রাষ্ট্রেই একধরনের অ্যানারকি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক পরিসরেও এই সংকট বিদ্যমান। যখন রাষ্ট্র ব্যক্তি ও সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখনই দেখা দেয় ক্ষমতার নতুন কাঠামো, যার ভিতরে লুকিয়ে থাকে উগ্র নেতৃত্ব, চরম আদর্শ, এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি। আর এই পরিস্থিতিই আমরা দেখি ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই । ধর্মীয় গোড়ামী, ধর্মীয় রাজনীতি আর সোশীও-রিলীজিয়াশ মূল্যবোধ সংরক্ষণের নামে সামাজিক মোরাল পুলিশিঙ, মানুষের মাঝে আইডেন্টিটি পলিটিক্সের জন্য জাতপাত প্রথার বাড়ন্ত। ফলে মানুষ হয়ে পড়েছে নৈতিকতাহীন আর নিজস্ব মূল্যবোধহীন ফলে সে হয়েছে আত্ম-শক্তিহীনও। গ্রামসির হেজেমনি ধারণায় যেমন দেখা যায়, ক্ষমতা তখন কেবল বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিতেও পরিণত হয়। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই মেনে নেয় সেই আদর্শ, যেটা তাকে অবচেতনভাবে শাসন করছে। এর ফলে মানুষ খূজে ফেরে এমন কিছুর যা তাকে মানসিক ও আত্মিক-শান্তি দেবে। এই কারণেই মানুষ মূলে ফেরার এক তাড়না দেখা যায় তার মধ্যে। এরজন্য সে রাষ্ট্রীয় কীবা যেকোন ধরনেরই হোক না কেন নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব মেনে প্রস্তুত থাকে। এর ফলেই আধুনিক রাষ্ট্রগুলা তে আমারা বিভিন্ন ক্রেজি নেতৃত্ব দেখছি , আরও দেখছি ফার রাইট উত্থান। যারা সমাজ-রাষ্ট্র উভয়ের জন্য হুমকি হয়ে আসতে যাচ্ছে।    

আর এত সব ঘটনা আর ভবিষ্যৎবানী যাই হোক না কেণ আমাদের নিজেদের মধ্যে একধরনের অস্তিত্বের সঙ্কট হিসাবে দেখা যাচ্ছে, যেন একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি আমরা। এই অনিশ্চয়তা আমাদের মূল্যবোধেও আঘাত করছে। এই অনিশ্চয়তা আমাদের নতুন কিছুকে পজেটিভ বা ভালভাবে গ্রহণ করার শক্তিও হ্রাস করেছে। আমরা নতুন ভাল কিছুকে আর ভাল বলে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়, সেটা নলেজ বা বস্তু যাই হোক না কেন? আমরা আছি এক ডিশটোপিয়াণ ঘোরের মধ্যে। ফলে মানুষ কোন নতুন আদর্শকে আর বিশ্বাস করা ভুলে গেছে।  Jean-François Lyotard এর মতে, আজকের বিশ্বে 'গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ' ,বড়ো কোনো আদর্শিক কাঠামো—এর মৃত্যু ঘটেছে। ফলে আমরা আর কোনো বড় সত্যে বিশ্বাস রাখতে পারি না, ছোট ছোট, বিচ্ছিন্ন সত্যের ভিতরে খুঁজে নিতে হয় আমাদের অবস্থান। ফলে রাজনৈতিক আদর্শ, নৈতিক বিশ্বাস, এমনকি প্রেমও, ভালবাসা, লয়ালীটি বা বিশ্বাস, বন্ধন, আত্মীয়তার মত সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ উলরিচ বেক-এর Risk Society ধারণায় যেমন বলা হয়েছে, আধুনিকতা নিজের ভেতরেই এমন সব বিপদ তৈরি করে যার নিয়ন্ত্রণ আর মানুষের হাতে থাকে না। পরিবেশ বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা, অর্থনৈতিক ধস ,সবই এমন জটিলতা তৈরি করছে যা আগের নিয়মে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছে অনির্ধারিত, অনিরাপদ।সবমিলিয়ে সমাজ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে ভবিষ্যতের প্রশ্ন কেবল ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, বরং বর্তমানের কাঠামোকে কতটা আমরা ধরে রাখতে পারছি, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যক্তির স্বাধীনতা যদি সমাজকে ভেঙে ফেলে, তবে সেই স্বাধীনতা কি সত্যিই মুক্তি, না কি এক নতুন প্রকারের নিঃসঙ্গতা?

এই প্রশ্নগুলো আজ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ সমাজ তার নিজের ভবিষ্যত নিয়েই আজ নিশ্চিত নয়। আর এই অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়েই গড়ে উঠবে এক নতুন ইতিহাস ,হয়তো বিকল্প সমাজের, হয়তো বিকল্প ভবিষ্যতের। 

বাংলাদেশের সম্ভাব্য ইসলামী পুনর্জাগরণ

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় এক নীরব ধর্মীয় নবজাগরণের সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই নবজাগরণ কোনো সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসলামি মূল্যবোধ, জ্ঞানচর্চা সাংগঠনিক সক্রিয়তার বিস্তার এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। এই নবজাগরণ কীভাবে সংঘটিত হচ্ছে, কী ধরনের সাংস্কৃতিক কাঠামো এর ভিত নির্মাণ করছে, এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র সমাজে এর প্রভাব কী হতে পারে। তাই তো ধারনা করা যায় বাংলাদেশের সমাজে এক ধরনের নীরব উত্তরণ লক্ষ করা হচ্ছে যা অনেকের নজরের বাইরে রয়ে গেলেও, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এই উত্তরণ কোনো সরাসরি বিপ্লব নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মভিত্তিক নবজাগরণ যা তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এবং ধীরে ধীরে দেশের সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের এই পরিবর্তন একটি সম্ভাব্য ইসলামী নবজাগরণকে নির্দেশ করে, যার ফলাফল ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিতে পারে।

বর্তমান প্রজন্মের ইসলামকে শুধু  আনুষ্ঠানিক আচার হিসেবে নয়, বরং একটি জীবনবোধ আদর্শিক অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করছে। এই তরুণরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি ইসলামি স্কলারশিপ, আর ধর্মীয় স্ক্রিপচারের মাধ্যমে তাদের চিন্তা নির্মাণ করছে। তাদেরকে আর নিছক অনুসারী  না হয়ে তারা হয়ে উঠছে জিজ্ঞাসু, বিশ্লেষক এবং প্রচারক আর তারা সমাজে এর মাধ্যমে তারা এখন ন্যায্য হিস্যার দাবিও করছে। এই প্রজন্ম নিজেদের ইচ্ছায় হিফজখানা বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছে, বিভিন্ন ইসলামি কোর্স আয়োজন করছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে(ফেসবুক, ইউটিউব, পডকাসট)  ইসলামি দাওয়াহ নিয়ে কাজ করছে। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আজ গ্রামে গ্রামে এই তরুণ ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছে গত দশ বছরে এত পরিমান মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে যা কল্পনাও করা যায় না।  আপনারা আর আশ্চর্যন্বিত হবেন যে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার তাদের সন্তান কে সরকার পরিচালিত স্কুলে পাঠানোর চাইতে এইসব মাদ্রাসাই পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

 গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সাথে বিভিন্ন ঘরনার ইস্লামিক বক্তা, তরুণ, ইন্টেলেকচুয়াল , আর আলেম ওলামা  ব্যাপকভাবে দমন-পীড়নের সম্মুখীন হয়েছে। আর তাদের উপর এই দমন পীড়ন দেখে তরুণরা নিজেদের কে আরও পরিশীলিত করেছে , তারা মনে করেছে তাদের কোন অভিভাবক কেই নির্যাতন করা হচ্ছে। এইটাতে তারা যেমন মানসিক ভাবে আঘাত পেয়েছে এবং একে তাদের এই শোক দুঃখ কে উৎসাহে রুপান্তর করেছে কিন্তু এই দমনমূলক নীতি কার্যত ইসলামি চেতনার বিকাশকে থামাতে পারেনি, বরং তাকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে সাংস্কৃতিক শিক্ষামূলক পরিসরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে, আজ যে পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি, তা স্লোগাননির্ভর রাজনীতি বা  লোক দেখানো সামাজিক কোন উথান বা আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, সাহিত্য, মিডিয়া এবং সমাজচর্চার মাধ্যমে গঠিত হচ্ছে।  এই পরিবর্তন অনেকটাই অবচেতনভাবে ঘটছে, যেখানে এক শ্রেণির তরুণ রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে। যে পরিবর্তনগুলো আমরা দেখছি তা শুধু আবেগ নয়, বরং সংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক। তরুণেরা নিজস্ব ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট, পাঠচক্র, ইসলামি থিংক ট্যাংক এবং সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলছে। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রম, অনলাইন কোর্স এবং স্কলারশিপ প্রোগ্রাম চালু করেছে।  একটি লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হলো এই তরুণ উদ্যোগগুলোর মধ্যে অনেকেই ইসলামি আদর্শের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা যুক্ত করছে, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের ইসলামী কর্মকাণ্ডে ছিল না।

 আর এই ইসলামিক রিভাইভালিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ লেখকদের উত্থান। গত ১০ বছরে ইসলামিক লেখকগোষ্ঠীর বইয়ের সংখ্যা বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বই কেবল ধর্মীয় দিকনির্দেশনা নয়, বরং দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, নারীবাদ, আধুনিকতা প্রযুক্তি নিয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরছে। তাদের লেখাগুলো  কতটুকু প্রাঞ্জল, তথ্যনির্ভর, গবেষণামূলক তা পরের বিষয় বাট  তাদের এই লিখার বিষয় আর কন্টেন্ট অনেক সময় সেক্যুলার চিন্তাবিদদের গ্রন্থের সঙ্গে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা তৈরি করে। এক্ষেত্রে বইমেলা, বইবাজার ডটকম বা রকমারি ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ইসলামি বইয়ের বিক্রির পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করে যে, পাঠকপছন্দ এখন ক্রমেই ধর্মীয় চিন্তার দিকেই ঝুঁকে পড়ছে।

পূর্বে ইসলামী চিন্তাবিদরা মূলত মাদ্রাসা বা ওয়াজ মাহফিলকেন্দ্রিক ছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ইসলামি স্কলাররা সেই গণ্ডি ভেঙে ইউটিউব, ফেসবুক, ব্লগ, -বুক, পডকাস্ট সব মাধ্যমে সক্রিয়। তারা এখন ক্যামেরা-সচেতন, ভাষা-সচেতন এবং দর্শক-সচেতন। তারা কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্ব, বিজ্ঞান, পুঁজিবাদ, নারীবাদ, গণতন্ত্র, সেক্যুলারিজম সব বিষয়েই তারা বক্তব্য রাখছেন। এই বহুমাত্রিক ইসলামি চিন্তাবিদরা দেশে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি গড়ে তুলছেন। ফলে বলাই যায় গত দশ বছরে বাংলাদেশে ইসলামী পাবলিক ইনটেলেকচুয়ালের উত্থান ঘটেছে ব্যাপক ভাবে আবার তাদের পরিচিতি আর স্বীকৃতি যে নাই সেটা বলা যায় ন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইসলামি চিন্তার প্রসারের একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন ধর্মীয় বক্তাদের খ্যাতি বেড়েছে, অন্যদিকে ইসলামিক meme culture, বই রিভিউ, শর্ট ভিডিও ইত্যাদির মাধ্যমে একধরনের নতুন ইসলামী সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। এটি এখন শুধুপ্রচারণানয়, বরং ইসলামিক  জীবনদর্শনকে পপুলার কালচার করার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে আবার প্রচেষ্টা বিফলে যাচ্ছে না একেবারে তাও বলে দেয়া যায় তবে  এক্ষেত্রে তরুণ সমাজের কিছুটা পিছুটান আছে তারা মানসিক ভাবে চাই যে ইসলামিক জীবনদর্শন আসুক বাট বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেটা তাদের নিজ জিবনে বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে সম্ভাব হচ্ছে না।

এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র বা সেক্যুলার সমাজ এই নবজাগরণকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে বলে মনে হয় না। একদিকে তারা এটিকে হয় তুচ্ছ করছে, নয়তো একে "ফান্ডামেন্টালিজম" বলে গাল দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নবজাগরণ কিছু ক্ষেত্রে  সংগঠিত আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসংগঠিত , আর কিছু ক্ষেত্রে যুক্তিনির্ভরতা আর কিছু ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিষয়ও আছে  তবে এই উত্থান যথেষ্ট প্রভাবশালী। যদি রাষ্ট্র বিষয়ে উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত নীতিগত প্রস্তুতি না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শক্তির সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে কেননা বাংলার রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সেকুলার আর সেকুলার মাইন্ডই ধারন করে সমস্ত সরকারি পলিসি পরিকল্পনায় তবে একে যদি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে না দেখে সহাবস্থানের ভিত্তিতে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবে এটি হতে পারে একটি নতুন সমঝোতার যুগ।

বাংলাদেশের সমাজে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের গতি লক্ষণীয় এটি ধর্মীয় আবেগে নয়, বরং চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি নেতৃত্বের পুনর্গঠনে আবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন নিছক ভীতিকর বা রোমান্টিক কিছু নয়; বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যা সমঝোতা, বিশ্লেষণ প্রস্তুতির দাবি রাখে। নবজাগরণ যদি সহাবস্থানের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। আর যদি তা অবজ্ঞা দ্বন্দ্বের পথে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তার ফলাফল অনিবার্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে।সুতরাং, সময় এসেছে এই ইসলামী নবজাগরণকে বোঝা, ব্যাখ্যা করা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নির্মাণে তা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে গভীর আলোচনা শুরু করার।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রবণতা ধরনের নবজাগরণের এক নিঃশব্দ সূচনা হতে পারে। তবে এই নবজাগরণ কি বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয় ? যা বাংলাদেশের আগামির পথ চলাকে কণ্টকময় করে দেবে।  করে দেবে বাংলাদেশের আগামির পথ চলা কে রুদ্ধও ?

 

 


প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...