বাংলার মানুষ নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার, গণতান্ত্রিক সরকার অথবা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এত বেশি ঘৃণা করে কেন, যেটা আমলা বা আমলাতান্ত্রিক, কিংবা সেনাবাহিনীর সামরিক সরকার, এদের দ্বারা পরিচালিত যে কোনো সরকারকে বাংলার মানুষ ঠিক ততটা ঘৃণা করে না? এর কোনো রিজন বা কারণ রাজনীতিবিদরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আমার তো মনে হয়, না। না হলে এখনো রাজনীতিবিদরা নির্লজ্জের মতো ভোট! ভোট! করে যেতেন না।
দেখুন, এটা কিন্তু একটা চিন্তার বিষয়। কেননা গত ১৬ থেকে ১৭ বছর বাংলাদেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলার মানুষ দেখেনি। আবার স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যত গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে-গেছে, বাংলার মানুষ সেইভাবে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা যে কী, তা কখনোই উপলব্ধি করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারেররা কখনোই বাংলার জনগণকে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধি করাতে পারেনি ,এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা, রাজনীতিবিদদের আর কি হতে পারে?
এর অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতি, দুঃশাসন, অপশাসন ও জনগণকে দাস মনে করা। একের পর এক তাবর-তাবর রাজনীতিবিদ এসেছে, দেশ শাসন করেছে, তবুও দেশের মানুষের ভাগ্যের সেইরকম কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এবং ওই সব মহান রাজনীতিবিদদের কর্মীরা ও তাদের দলের রাজনৈতিক কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষকে যেভাবে নির্যাতন করেছে, দাসসুলভ আচরণে মানুষকে হেয় করেছে, তাতে বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক কর্মীবাহিনীর প্রতি এক ধরনের চাপা দুঃখ ও ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছে। যে ঘৃণা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং ভবিষ্যতে বাড়বে বলে আমার মনে হয়। এই কারণেই দেখা যাচ্ছে, গত ১৭ বছর নির্বাচন না হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। তারা চায় সংস্কার, দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন। তারা জানে, নির্বাচিত কোনো সরকার আসা মানেই তাদের কর্মীবাহিনী দেশের মানুষকে মানুষ মনে করবে না। এটাই বারবার ঘটেছে। আর সেই পুনরাবৃত্তির কারণেই নির্বাচনের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে।
আমাদের নবাগত প্রজন্মের মধ্যেও রাজনীতিবিদদের এই ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। তারা ইতিহাস ঘেটে দেখেছে ,এই রাজনীতিবিদরা দেশের কোন ধরনের পরিবর্তন করতে পারেনি ,এরা শুধু দুর্নীতির মধ্যেই ছিল, এরা অপসাশন , দুঃশাসন এবং জনগণকে যেভাবে পারা যায় শোষণ করে গেছে। তাদের ঘৃণাও রাজনীতিবিদদের ব্যাপকভাবে ভোগাবে বলে আমার মনে হয় । সুতরাং নতুন প্রজন্ম চাই দেশে পরিবর্তন আসুক, কাঠামোগত একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ, নতুন দেশ হিসেবে পরিগণিত হোক। তারা চায় , দেশে একটা ভালো ধরনের পরিবর্তন হোক এবং এ পরিবর্তন সেটা সামরিক সরকারই হোক না কেন কিবা অনির্বাচিত যে কোন সরকারই হোক না কেন ইতিবাচক পরিবর্তন হলেই হবে। এটার জন্য তারা সেটা গণতান্ত্রিক সরকার কি বা অবনতান্ত্রিক সরকার তাদের নিকট এটার কোন গুরুত্ব রাখে না।
সুতরাং, এই অনীহা কাটানোর জন্য , আমাদের রাজনীতিবিদদের এ ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এই অনীহা শুধু আজকের বিষয় নয় , গত ৫০ বছর এবং ৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান আমলেও নির্বাচিত সরকার ও রাজনৈতিক দল , কখনোই বাংলা বা পাকিস্তানের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাস্তবে কিছু করতে পারেনি। এদের নিকট ক্ষমতা ও ক্ষমতার রাজনীতি ছাড়া কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। তারা বাংলার জনগণ ও নাগরিক সমাজকে শুধু ক্ষমতার জন্যই ব্যবহার করে গেছে।
জনগণ দেখেছে, নির্বাচিত সরকারও দেশের কোনো ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কার করতে পারে না। তারা জানে, নির্বাচিত সরকার মানেই তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। সুতরাং, এই পরিস্থিতিতে শুধু নির্বাচন দিয়েই যদি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে আবার ‘মূলা ধরিয়ে দেওয়া’র মতো নাটক করা হয়, তাহলে বাংলার মানুষ আর সেই মুলা নিতে চায় না। তারা একটা স্থায়ী পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক আমুল পরিবর্তন দেখতে চায়। এই পরিবর্তনের জন্য গণতান্ত্রিক সরকার এই যে গুরুত্বপূর্ণ এটা তারা ভাবতেও চায়না। সুতরাং তাদের নিকট ভোট ও ভোটের রাজনীতি কোন গুরুত্বই রাখে না।
নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিকে তারা ঘৃণা করে। তারা চায় মানুষের জন্য , নাগরিক রাজনীতি, নাগরিক সুবিধা আদায়ের রাজনীতি, যাতে বাংলাদেশে আবার ফিরে আসে নতুন আশার রাজনীতি। সুতরাং, আমাদের বড় বড় রাজনৈতিক দলসমূহের উচিত , মানুষের চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণাকে আমলে নিয়ে নিজেদের সংস্কার করা এবং দেশের মানুষের নাগরিক রাজনীতির প্রতি যাতে আগ্রহ বাড়ে , সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া।

No comments:
Post a Comment