বিপরীত মতাদর্শের ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে গালি নয়, যুক্তির ভাষা শেখা জরুরি !

ধরা যাক, আপনার কাছে কোনো একটি মতবাদ বা আদর্শ খারাপ বলে মনে হচ্ছে, কিংবা সেটি সাধারণের দৃষ্টিতেও অনৈতিক বা ক্ষতিকর বলে বিবেচিত, অথবা সেই মতবাদটি আপনার ব্যক্তিগত বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী অবস্থান করছে। তবুও, যদি কেউ সেই মতবাদ বা আদর্শ সম্পর্কে একটি প্রকাশ্য সোশাল মিডিয়া পোস্ট করে বা বিপরীত মতবাদের সমর্থন জানায় তাই বলে আমাদের উচিত নয় কেবল বিরোধিতা করার কারণে তাকে তার পোস্টে গিয়ে তাকে অন্ধভাবে আক্রমণ করা বা কমেন্টের মাধ্যমে গালিগালাজে মেতে ওঠা। আবার এমন মন্তব্য করাও সমীচীন নয় যেখানে কেউ না জেনে না বুঝে কেবল শুনা কথার ভিত্তিতে বলে দিচ্ছে যে মতবাদটি সমাজের বিরুদ্ধে।
ধরা যাক, কোনো একজন নারীবাদী ফেসবুকে পোস্ট করলেন যে, নারী উন্নয়ন কমিশনের কোনো কার্যক্রম ইসলামবিদ্বেষী কিনা, তিনি তা জানতে চাচ্ছেন বা কোন নাস্তিক জানতে চাচ্ছেন যে কেন ধর্মের বিরুদ্ধে সে কথা বলতে পারবে না ? সাধারণ মানুষের এখানে বোঝা উচিত, এমন পোস্ট দেখে অযথা বিক্ষিপ্ত ও খারাপ বা হুমকি মুলক কোন মন্তব্য করার দরকার নেই। মন্তব্যে বলা উচিত নয় যে “এইসব তো ইহুদী-খ্রিস্টানরা বানিয়েছে” কিংবা পশ্চিমারা নারীর স্বাধীনতার নামে আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চায় , শালা নাস্তিক, শাহাবাগি, বা এমন কোন গালি যা আসলে কোন ভাল কিছু বয়ে আনেনা । আবার, সেই ব্যক্তিকে তার পরিবার তুলেও গালিগালাজ করাও উচিত নয়। এতে লাভ তো হয়ই না, বরং ক্ষতি হয়। আপনি যে তাদের গালি গালাজ করে দেশ , জাতি ও আপনার ধর্ম কে উদ্ধার করে ফেলছেন তাও কিন্তু না ।
যেমন, আপনি ইচ্ছেমতো তসলিমা নাসরিনকে, আসাদ নুর কে গালি দিতে পারেন না, বা কোনো নাস্তিককে কেবল তার মতবাদে দ্বিমত থাকার কারণে গালি দেওয়ার অধিকারও আপনার নেই। অযথা তাদের প্রোফাইলে গিয়ে এমন মন্তব্য করা একপ্রকার নিজের বিশ্বাসের ক্ষতিসাধন করে। আবার আপনার সমমনা যারা জানে ও তাদের কে কাউন্তার দিতে সক্ষম তাদের কে আপনার দুর্বল করেন। আমরা আরও দেখি, কোনো নায়ক বা নায়িকার ফেসবুক পোস্টে গিয়ে অনেকেই অহেতুক গালিগালাজ করে। এ ধরনের আচরণ থেকেও আমাদের বিরত থাকা উচিত। বরং বোঝা উচিত, এই আচরণগুলো দিনের শেষে কাউকে উপকার করে না, বরং সমাজের মানসিকতা ও পরিবেশকে আরও কলুষিত করে তোলে।
তাই আমাদের সমাজের নেতৃত্বদানকারী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের উচিত এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক নেতিবাচক কার্যকলাপ যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা। আমাদের সবাইকে বোঝাতে হবে যে, কোনো ব্যক্তির প্রোফাইলে গিয়ে মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে , আমি কি এই বিষয়ে মন্তব্য করার যোগ্যতা রাখি? যেটি নিয়ে পোস্ট করা হয়েছে, সেটি কি আমার বোধগম্য? যদি হয়ও, তাহলেও মন্তব্য এমনভাবে করতে হবে যাতে তা নেতিবাচক, অপমানজনক বা আক্রমণাত্মক না হয়। কেবল এই ভেবে যে আমি একটি মন্তব্য করে সমাজ, জাতি, ধর্ম বা দেশকে রক্ষা করে ফেলেছি, এই রকম আত্মতুষ্টিমূলক ধারণা থেকে মন্তব্য করা উচিত নয়।

সমাজে জাজমেন্টাল মানসিকতার বাড়তে থাকা প্রবণতা এবং এর রূপান্তর

[1]
জাজমেন্টাল মানসিকতা , আগে যা সীমাবদ্ধ ছিল ব্যক্তি ও নিকট-সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া নামক অনির্দিষ্ট, অপরিচিত ও অজানা ক্ষেত্রের মধ্যে। একটি পরিবর্তন আমরা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করতে পারছি , যে পরিবর্তন আমাদেরকে চিন্তার এক নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমরা যে একটি বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করেছি, সেটি হলো, সমাজে ‘জাজমেন্টাল মেন্টালিটি’ দিন দিন কমার বদলে বরং বাড়ছে। অথচ, মানুষ যেখানে সমাজের প্রতি দিন দিন আরও বেশি বিমুখ হয়ে পড়ছে, সেখানে এই বিচারপ্রবণ মানসিকতার কোনো হ্রাস লক্ষ করা যাচ্ছে না। মানুষ আজ যতটা না সামাজিক বন্ধনের মধ্যে আছে, তার চেয়ে বেশি আছে বিচ্ছিন্নতায়; তবুও, আশ্চর্যজনকভাবে এই বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো দিন দিন আরও বেশি ‘জাজমেন্টাল’ হয়ে উঠছে, এমনকি অপরিচিতদের ক্ষেত্রেও।
[2]
সমাজে এই জাজমেন্টাল মানসিকতার যে প্রভাব আমরা আগে দেখতাম, এখন তা অনেক বিস্তৃত এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আগে মানুষ সাধারণত বিচার করত নিজেদের পরিচিতদের, নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী বা সামাজিকভাবে ঘনিষ্ঠদের। কিন্তু বর্তমানে যে সংকটটি তৈরি হয়েছে তা হলো: সমাজে সরাসরি এই বিচার প্রবণতা কিছুটা কমলেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষ এখন অপরিচিত কাউকেও তার ছবি বা একটি ছোট ভিডিও দেখে সহজেই বিচার করে ফেলে। তার চরিত্র বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না রেখেও মন্তব্য করে বসে। অধিকাংশ মন্তব্যই হয়ে থাকে একপাক্ষিক, অবিবেচক ও নেতিবাচক। কেউ হয়তো নিজের মত প্রকাশ করছে, কিন্তু মুহূর্তেই সেই পোস্টের নিচে উপহাস, হেয় করা মন্তব্য, ‘হা হা’ রিয়্যাকশন বা ব্যঙ্গাত্মক স্টিকার এসে জমা হচ্ছে। এটি নিছক মত প্রকাশ নয়, এটি এখন এক ধরনের মানসিক অসুস্থতায় রূপ নিয়েছে। আর সাথে আছে আবার মিম কালচার , যেকোনো কিছু হলেই মানুষেরা শুরু করছে মিম বানানো আর এসব মিম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এত নেতিবাচক যা কল্পনাও আনাও যায় না। সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো একটা কমেন্ট, হাহা রি আকশ্যান যতটা না ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে আমার মনে হয় মিম তার চেয়ে বেশি মানুষ কে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
[3]
আবার এই জাজমেন্টাল প্রবণতার সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সেলিব্রেটি, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, টিকটকার, ইউটিউবাররা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা জাছে কোন ভাবে ভাইরাল হইয়া জাওয়া কোন সাধারন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি করে ঘটছে আর সাধারন ব্যক্তি সমাজ এটা সেলিব্রেটি দের মত এগুলাকে হ্যান্ডলও করতে পারেনা ফলে তারা প্রতিনিয়ত এমন মন্তব্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা একটি সাধারণ মানুষের মানসিক স্থিতি ভেঙে দিতে পারে। এই সমালোচনা বা বিচার অনেক সময় এতটাই কটূ, এতটাই নির্মম যে তা সহ্য করা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সুতরাং, আমি মনে করি, মানুষের জাজমেন্টাল মানসিকতা কমেনি, বরং রূপান্তরিত হয়েছে এবং প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে তা আরও ব্যাপক ও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

দ্যা বুলশিট পলিটিক্স!

আপনি যদি দক্ষিণ এশিয়ার কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল বা একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাকে জিজ্ঞেস করেন, রাজনীতি কী? কিংবা তাদের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক দর্শনের মানে কী? তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, অন্তত ৯০ শতাংশ  রাজনীতিবিদই  উত্তর দেবেন: রাজনীতি মানে মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন আর অবরোধ। তাদের মধ্যে বড়জোর এক-দুজন বলবেন, রাজনীতি মানে সকল মানুষের জন্য কাজ করা।
এই একই চিত্র আপনি বাংলাদেশেও দেখবেন। বাস্তবে, এখানে ৯০ শতাংশ রাজনৈতিক কর্মীই অশিক্ষিত কিংবা রাজনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তারা জানে না রাজনীতি কী, কীভাবে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা যায়, কীভাবে ন্যায় ও উন্নয়নের পক্ষ নেওয়া যায়। তারা শুধু জানে কীভাবে রাস্তা বন্ধ করতে হয়, কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে বাধা দিতে হয়, কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত করে তাদের কষ্ট দিতে হয়।

তাদের কাছ থেকে আপনি কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আশা করতে পারেন না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রদের মাঝেও রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা মতবিরোধ প্রকাশের কোনো সুশৃঙ্খল ও যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতির চর্চা নেই। দুদিন পরপর আপনি দেখবেন, রাজধানী ঢাকার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর অচল হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক দলের তথাকথিত কর্মসূচির কারণে, যার একমাত্র ফল মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা। অথচ, আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা গর্বভরে বলবে, তারা দেশের সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে! তারা রাস্তা বন্ধ করে মনে করে দেশের মানুষের জন্য তারা কিনা করে ফেলেছে ! হোয়াট এ বুলশিট ! 
এটাই বাস্তবতা এবং এটি একেবারেই অর্থহীন। রাজনীতি নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনাই একটি ‘বুলশিট’, অর্থহীন, অপদার্থ ও আত্মসন্তুষ্টিতে ভরা।

যতদিন পর্যন্ত এই ধরণের মানসিকতা ( রাস্তাঘাট , কলকারখানা , সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষালয় বন্ধ করে মানুষ কে কষ্ট দেয়া) রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সমাজে বিদ্যমান থাকবে, ততদিন আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন ,এই দেশ একচুলও এগোবে না। দেশ পড়ে থাকবে তার পুরনো তৃতীয় বিশ্বের পরিচয় নিয়ে। দুঃস্থতা, বিশৃঙ্খলা ও অযোগ্য নেতৃত্বের এক বৃত্তে।

বাংলাদেশে কারা থাকবে?

বাংলাদেশপন্থিরা থাকবে, ভারতপন্থিরাও থাকবে, পাকিস্তানপন্থিরাও থাকবে, ইসলামপন্থিরাও থাকবে, হিন্দুত্ববাদপন্থিরাও থাকবে... যে যার মতবাদ নিয়ে সবাই থাকবে এই দেশে। শাপলাও থাকবে, শাহবাগও থাকবে। এটা কারো বাপের দেশ না যে অন্য কাউকে বের করে দেবে।
একটা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মানে হলো, তার দেশবিরোধীদেরও সে আত্মীকরণ করবে এবং আপন করে নেবে।

রাষ্ট্র ধারণা মূলত কী?

রাষ্ট্র একটি ইনক্লুসিভ ধারণা; এখানে সব ধরনের, সব ঘরানার মানুষ একত্রিত হয়। তারা একটি চুক্তিতে আসে যে, "হ্যাঁ, আমরা মিশে থাকবো।" সুতরাং, এখানে যখনই বিভাজন ও পার্থক্যের রাজনীতি করবেন, একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে বেশি 'রাষ্ট্রবাদী' দাবি করবেন, তা ওই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়।  একটি রাষ্ট্রের মূল বিষয় হচ্ছে তার বিরোধীদেরকেও সেই স্থান দেওয়া। একজন ব্যক্তি যতই রাষ্ট্রের বিরোধী হোক না কেন, সে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিশ্বাস না-ও করতে পারে, তবুও সে সেই রাষ্ট্রে পূর্ণ সম্মান ও স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করবে। যখন কোনো রাষ্ট্র তার অস্তিত্বের বিরোধীদেরও সম্মানসহ বসবাসের অধিকার দিতে পারে, তখনই বোঝা যায় রাষ্ট্র একটি 'ওয়েলফেয়ার স্টেট' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। রাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে সবাইকে নিয়ে চলা, কাউকে ফেলে দেওয়া নয়, কাউকে অস্বীকার করা নয়।

এখন সমস্যা কোথায়? সমস্যা দেখা দেয় যখন রাষ্ট্রের ভেতরেই কেউ কাউকে রাষ্ট্রবিরোধী বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা দেয়। রাষ্ট্রের ভেতরে মতপার্থক্য তৈরি হয়, এবং এর মূল কারণ রাজনীতি। অর্থাৎ, ওই রাষ্ট্রের সরকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব নেওয়ার দ্বন্দ্ব, বিপরীতমুখী মতবাদ এবং ক্ষমতার লড়াই। এখানেই একজন আরেকজনকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। রাজনীতির এই কঠিন মারপ্যাচে ক্ষমতা বিশাল একটি ফ্যাক্টর। ক্ষমতার লোভে একদল আরেক দলকে অস্বীকার করে বসে। এটি রাষ্ট্রের জন্য প্রকৃতপক্ষে হুমকি স্বরূপ। একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত থাকলে যতটা না সেই রাষ্ট্রের জন্য হুমকি, তার চেয়ে বেশি হুমকি তৈরি হয় যখন দুই দল একে অপরকে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা দেয়। এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনে।

রাষ্ট্র হচ্ছে পুনর্মিলনের জায়গা।
রাষ্ট্র একটি পরিবারের মতো। যেমন একটি পরিবারে বাবা-মা কোনো সন্তানকে অস্বীকার করতে পারে না, যতই সেই সন্তান পরিবারের ক্ষতি করুক না কেন, তেমনই রাষ্ট্রও তার কোনো নাগরিককে ফেলে দেয় না বা অস্বীকার করে না। রাষ্ট্র তার সকল নাগরিককে নিয়ে একসঙ্গে চলার প্রতিশ্রুতি দেয়।

রাজনীতি আসলে করবে কারা?


দেখেন আগের যত দার্শনিক,  ফিলোসফার,  সমাজবিদ ছিল, তাদের যেকোনো লেখায় আপনি একটা বিষয় খেয়াল করবেন?  সেটা হচ্ছে রাজ্য চালনা বা রাষ্ট্রপরিচালনা কিবা জাতির নেতৃত্ব দেওয়াটা মূলত আভিজাত,  উচ্চমানের নৈতিক আদর্শসম্পন্ন ব্যক্তি এবং উঁচু দরের জ্ঞানী লোকদরেরই মানায়। ফকিন্নি, গরিব, নিচু মানসিকতাদেরন জন্য রাজনীতি নয় , রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব তো নই মোটেই। কারণ এই ফকিন্নি গরিব ও নিচু মানসিকতার লোকেরা যখনই জাতির নেতৃত্বের পর্যায়ে যাবে তখনই তারা হয় দুর্নীতি করবে অথবা বিভাজন বিভক্তি এবং  স্বৈরাতান্ত্রিকতা পরিচালিত করে দেশে অশান্তি বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। এবং ইতিহাসে এর উদাহরণ আপনি ভুরিভুরি দেখবেন। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে মূলত অভিজাতদেরকেই মানায়।  এই অভিজাত হবে  কারা এবং অভিজাতের সংগায়য়নটা কি হবে?  এই অভিজাত হবে উচু বংশীয়, সুশিক্ষিত,  উঁচ্চ নৈতিক আদর্শ, আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন   এবং  ধনীরা।  আর এদের বাদে সব জনসাধারণই হবে মধ্যবর্তী।  আর  এদের নিচু পর্যায়ের লোকগুলোই হচ্ছে ফকিন্নি গরিব এবং নিচু মানসিকতার।  মাঝে মাঝে জনসাধারণের মধ্য থেকেও জাতীয় নেতৃত্ব বের হয়ে আসতে পারে এবং সে সুযোগটা রাখা উচিত। তবে কখনোই নিচু মানসিকতার লোকদেরকে জাতীয় নেতৃত্ব যেন না যাইতে পারে সেটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। 

এই যে দেখেন আফ্রিকান কিবা এশিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকার  প্রায় সব দেশই গরিব, দুর্নীতিগ্রস্ত  এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায়  কেন  জর্জরিত? তার অন্যতম কারণ হচ্ছে এসব দেশের নেতৃত্ব বা নেতারা সমস্তই হচ্ছে ফকিন্নি গরিব ও নিচু মানসিকতার। পৃথিবীর যতগুলো গরীব রাষ্ট্র আছে এবং থার্ড ওয়ার্লড  কান্ট্রি রয়েছে, প্রত্যেকটার নেতা বা জাতীয় নেতৃত্ব হচ্ছে ফকিন্নি গরিব আর নিচু মানসিকতার তবে ব্যতিক্রমও হতে পারে।  

উগ্র জাতীয়তাবাদী

উগ্র জাতীয়তাবাদীদের উত্থান আজ বিশ্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাত তারই প্রমাণ। এই যুদ্ধটি আসলে তাদের রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ বা সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পিত কোন সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদীদের অন্ধ উন্মাদনার প্রতিফলন। জনসমর্থন আদায় এবং উগ্র জাতীয়তাবাদীদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্যই মোদি সরকার পাকিস্তানের ওপর মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এটি মূলত এক ধরনের "পাবলিক ডিমান্ড" পূরণের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যদি মনে করেন পেহেলগ্রামের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা হয়েছে, তাহলে তা নিতান্তই অজুহাত। প্রতিশোধের মানসিকতা থাকলে ভারত বহু আগেই প্রতিক্রিয়া দেখাত। বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদীদের খুশি করার একটি রাজনৈতিক খেলা।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনো সংঘাত বা যুদ্ধ হলে আপনাকে বুঝতে হবে, এটি মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদীদের উস্কানির ফল। এই জাতীয়তাবাদীরা এতটাই সংকীর্ণমনা এবং ঘৃণায় পূর্ণ যে, এদের চিন্তা-চেতনা  খুবই ভেনমাস। এদের মনুষ্যত্ব নেই,  আছে শুধু অন্ধ ঘৃণা আর যুদ্ধের পিপাসা। আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য এরা এক মূর্তিমান বিপদ। পৃথিবীর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, এই উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং জিঙ্গোইস্টদের রুখে দিতে হবে, কোনোভাবেই এদের বিষাক্ত চিন্তা ছড়াতে দেওয়া যাবে না। 
এই উগ্র জাতীয়তাবাদীরা সবসময় দেশপ্রেমের ভণ্ডামি দেখিয়ে আপনাকে বুঝাতে চায় যে তাদের দেশপ্রেমের উন্মাদনা যেন আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অতি দেশপ্রেম আসলে একটি মানসিক বিকৃতি। একটি দেশের সুষ্ঠু পরিচালনা এবং উন্নতির জন্য কোনো উগ্র দেশপ্রেমের প্রয়োজন নেই। দেশপ্রেম আসলে একটি অযথা এবং অতিরিক্ত আবেগ, যা সমাজে বিভাজন, বিভক্তি, এবং বিদ্বেষ ছড়ায়।
দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সুনাগরিক গড়ে তোলা, অন্ধ দেশপ্রেমিক নয়। যারা নিজেদের দেশপ্রেমিক বলে দাবি করে, বাস্তবে তারাই সমাজে বিভেদ ও ঘৃণার বীজ বপন করে। এই ভণ্ড দেশপ্রেমিকদের আসলে দরকার নেই। আমাদের দরকার নাগরিক দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করা, একটি সচেতন, দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের নতুন প্রজন্ম এবং শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে একজন ভালো নাগরিক হওয়া যায়, কীভাবে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়। "দেশপ্রেম" নামের অপ্রয়োজনীয় নাটক শেখানোর চেয়ে তাদের শেখানো উচিত নাগরিক অধিকার, মানবতাবোধ, এবং সামাজিক দায়িত্ব এবং  নাগরিক দায়িত্ববোধ ।  এই ভ্রান্ত দেশপ্রেমের আবেগকে একদম ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, এটা শুধু সমাজে বিষ ছড়ায়, উন্নতি নয়।

আদর্শহীন পৃথিবীর আহ্বান !

পৃথিবীতে যদি সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন এবং ধ্বংসাত্মক সংঘাত থেকে থাকে, তবে তা হলো মতাদর্শিক (ideological) সংঘাত। এটি অনেকটা বস্তির মারামারির মতো, যেখানে সবাই নিজেদের সঠিকই ভাবে, কিন্তু কেউই প্রকৃত অর্থে সঠিক নয়, আবার পুরোপুরি সৎও নই। এই মতাদর্শিক সংঘাত আর ঝগড়া মানবসভ্যতার জন্য লজ্জাজনক এবং এটি গোটা পৃথিবীকে বিশৃঙ্খলা আর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। এই মতাদর্শিক যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হয়েছে মূলত বিংশ শতাব্দীর পর থেকে, যখন মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র, জাতি চিন্তার উদ্ভব ঘটেছে আর মানুষ নতুন করে মানবাতার ধারণা পেতে শুরু করেছিল এবং উপনিবেশবাদ (colonialism)-এর পরিসমাপ্তির পর থেকেই এই ইডিওলজিকাল মতপার্থক্যের দিকে এগুতে থাকে। ঠিক তখন থেকেই মানুষ নতুন করে পারস্পারিক বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং মতভেদের এক ভয়াবহ মহামারি নিয়ে এসেছে, যার ভিত্তি মূলত এই ইডিওলজিকাল বা মতাদর্শ এবং দর্শন আর ফিলসোফিকাল দ্বন্দ্ব।

যদিও উত্তরাধুনিক সময়কালে এই ইডিওলজিকাল দ্বন্দ্ব কমে আসছে তার জায়গা নিচ্ছে ব্যাবসা, অর্থ আর টেকনলজি/প্রযুক্তি ও ভোগবাদ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে উন্নত দেশ এই ইডিওলজিকাল মতদ্বন্দ্ব থেকে বের হয়ে আসলেও অনুন্নত আর পিছিয়ে পড়া, পশ্চাৎপদ দেশগুলো এখনো এই আদর্শিক/ইডিওলজিকাল আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাদের রাজনৈতিক পরিসর, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজ ( সুশীল সমাজ ) এখনো এক ধরণের অচল ও পুরাতন ভাবনার মধ্যে বন্দী, যেখানে মনে করা হয় যে একটি নির্দিষ্ট মতবাদই জাতির মুক্তি এনে দিতে পারে। অথচ এই ধারণার সময়কাল ইতোমধ্যেই ইতিহাসের গহ্বরে ( গত শতাব্দীর শেষেই ) বিলীন হয়ে গেছে।

আর এই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব এতটাই বিপজ্জনক ও বিষাক্ত যে, দুজন মানুষ খুব কাছাকাছি অবস্থান করেও , শুধুমাত্র মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তারা একে অপরের থেকে বহুদূরে অবস্থান করে । আর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। আদর্শ , দর্শন ও মতাদর্শ ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে, যা সমাজে ও রাজনিতিতে এক গভীর সংকটের জন্ম দেয়।

মানুষের মনে রাখতে হবে আদর্শ বলতে আসলে কোন কিছু নাই। সব ভাউতা আর ভণ্ডামি মুলত ক্ষমতার লোভ আর লালসা।

দেশপ্রেমের অতিরঞ্জন আর মানবিকতার বিপদ !

পৃথিবীতে যদি কোনও সর্বজনীন গভীরতর ধ্বংসাত্মক  অনুভবহীন  ইমোশনাল ওয়েপেন থেকে থাকে, তবে তা হলো দেশপ্রেমের অতিরঞ্জন দেশ প্রেমের  অতিরঞ্জতা এই  ধারণা যে, দেশ ছাড়া সব কিছু গৌণ, দেশই প্রথম এবং দেশই শেষ, এই মনোভঙ্গি আজ আমাদের সামাজিক বন্ধন, মানবিক সম্পর্ক স্বাভাবিক মানব প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অথচ আমরা তা সচরাচর বুঝতে পারি না।

এই আধুনিক বিশ্বের যত জটিলতা, দ্বন্দ্ব সংঘাত চলছে, কেউ যদি প্রশ্ন করে, এসবের মূলে কী? তবে আমি বলব, এর একমাত্র উৎস হলো এই দেশভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। পৃথিবীর এই সংকটগ্রস্ত অবস্থার সমাধান তখনই সম্ভব, যদি আমরা এই জাতীয়তাবাদী চেতনার ধ্বংসে সক্ষম হই। তা না হলে, কোনো মুক্তির পথ নেই।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়তো আগের তুলনায় কমেছে, কিন্তু মানবজাতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক হিংস্র, অমানবিক, ঘৃণাপূর্ণ ধ্বংসাত্মক আচরণে লিপ্ত। আমরা আজ এত প্রযুক্তির মাঝে থেকেও কোথাও যেন আটকে আছি, এক ধরনের অস্পষ্ট সংকটে। বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত, কারন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা সহানুভূতির জায়গায় ঘৃণা আর বিদ্বেষ স্থান দখল করে নিচ্ছে। কোন মানুশের অন্তরে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা থাকবে আর সে মানসিক শান্তিতে থাকবে এইটা কখনওই হতে পারে  না তাই তো পৃথিবীর অধিকাংস মানুষ মানসিক অশান্তির মধ্যে রয়েছে ।

অনেকেই একে বলবে survival of the fittest এর বাস্তবতা, যেখানে মানুষ বা দেশ একে অপরকে হারিয়ে টিকে থাকতে চায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মধ্যযুগের পরবর্তী রেনেসাঁসের মূল লক্ষ্যই ছিল এই ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভাজন এবং মানবজাতির পার্থক্যকে অতিক্রম করে একটি মানবিক আধুনিক যুগের সূচনা করা। অর্থাৎ এই সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেশট এর নাম দিয়ে মানুশে মানুসে যুদ্ধ , হানাহানি, ঘৃনা, বিদ্বেষ এর শেষ করে দিয়া আর এর পরিবর্তে স্থান দখল করবে ভালবাসা, পারস্পারিক সহযোগিতা, প্রেম । কিন্তু হচ্ছে এর উল্টো!

আমাদের দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক চিন্তাবিদেরা বারবার আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গেছেন। তাহলে কি আমরা এখনও আধুনিক হতে পারিনি? আমরা কি এখনও সেই মধ্যযুগীয়, বর্বর মানসিকতার ধারাবাহিকতায় আটকে আছি?

অনেকে বলবে, এই অন্ধ জাতীয়তাবাদের পেছনে ধর্ম দায়ী। কিন্তু আসলেই কি ধর্ম দায়ী? যদি তাই হয়, তবে কি ধর্মই মানুষকে আরও ঘৃণাপূর্ণ, বিদ্বেষপ্রবণ হিংস্র করে তুলেছে? না, ধর্ম কখনও এমন ছিল না। আসলে, ধর্মের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের কাছে পুরোপুরি সত্যভাবে পৌঁছায়নি। আপনি দেখবেন, মধ্যযুগের ইউরোপীয় বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস বলতে গেলে আমাদের শেখানো হয়, ধর্ম, পুরোহিত আর যাজক শ্রেণি মধ্যযুগের সব সমস্যার মূল ছিল। মনে হয় যেন ধর্মই অন্ধকার যুগের প্রধান কারণ, যেন পৃথিবীর কাল আর কলংক জনক যত  ইতিহাস তার সব  ধর্মের  ছাড়া আর  কারও না!

কিন্তু এই ইতিহাস কি সত্যিই নিরপেক্ষ? এই ইতিহাস কি কাটছাঁট করা হয়নি ? ধর্মের এই কলংক জনক ইতিহাস কি  যাচাই করা হয়েছে? মোটেও না। তাহলে কীভাবে ধর্মকে মানবতা মানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হলো? কে বা কারা করল এই কাজ? ধর্মের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা আমাদের সমাজে কীভাবে প্রবেশ করল?

আজকের আধুনিক যুগে ধর্ম আর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না, ধর্মের সেই ক্ষমতা আর নেই। তবুও, সব সমস্যার জন্য ধর্মকে দায়ী করা হয়, এটা কি খুব অদ্ভুত নয়? দেখা যাচ্ছে, বহু অপরাধ সহিংসতা এমন কিছু মানুষ করছে, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে কিন্তু আসলে নিজেরা সব দায়মুক্ত থাকে। পৃথিবীর অশান্তি, বিদ্বেষ বিভাজনের প্রকৃত কারণ না হয়েও ধর্মই যেন সেই সকলের একমাত্র দায়ী হয়ে উঠে!

এই ছায়াময় ইতিহাসের পেছনে রয়েছে এক ধরনের shadow people ,যারা ক্ষমতার স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মকে অপরাধের মুখে দাঁড় করিয়ে নিজেরা ক্ষমতার চূড়ায় উঠে যায়। এরা সমস্যার সৃষ্টিকর্তা নয়, বরং সমস্যা সৃষ্টি করে ধর্মকে ফাঁদে ফেলে নিজেদের দায় এড়িয়ে যায়। আর এই শ্যাডো পিপল গুলাই হচ্ছে রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা, সামরিক বাহিনীর লোকেরা আর এরা যেকোনো যুগের ইতিহাসে আপনি পেয়ে যাবেন , শুধুযে এই যুগের তা কিন্তু না ! এই শ্যাডো পিপলদের কে আপনি পেয়ে যাবেন ইতিহাসের যেকোনো বাকে। আর এরাই হচ্ছে এনিমি অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড, ভালবাসা, পারস্পারিক সহযোগিতা আর প্রেমের , মানুষের   আর মানবিকতার ।

 

জাতীয় পুনর্জাগরণ না জাতীয় সচেতনতা ?

আমরা যখন দেখি কোনো জাতি বা দেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রায়ই লক্ষ্য করি, সে জাতির কিছু মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে যে তাদের জাতির লোকেরা জেগে উঠুক, হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনুক, পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাক। তারা প্রায়ই একটি শব্দ ব্যবহার করে ,জাতীয় পুনর্জাগরণ বা  nation reawakening, যা মূলত দেশের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জাতির জাগরণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতি ও  দেশ  ,এই দুইটি ভিন্ন বিষয়। আধুনিক পৃথিবীর কাঠামোতে কোনো দেশই কেবলমাত্র একটি জাতির একক প্রতিনিধিত্ব করে না। বাস্তবে, খুব কম দেশই এখন একক জাতিগোষ্ঠীর; বরং একটি দেশের ভেতর বহু জাতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষ বসবাস করে। এই বহুজাতিক, বহু ধর্মীয় পরিচিতি কোনো দেশের তথাকথিত  জাতীয় পুনর্জাগরণ ধারণাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। কারণ, বর্তমান বিশ্বে মানুষ নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের প্রতি এতটাই অনুরক্ত যে, তা দেশের সামগ্রিক পরিচয় ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। দেশগুলোর ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন অবশেষে দেশের শান্তি বিনষ্ট করে দিতে পারে।

ফলে দেখা যায়, যখন কোনো দেশে জাতি গঠনের বা উন্নয়নের কথা ওঠে, তখন সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী নিজেদের পরিচিতিকে গোটা দেশের জাতীয় চেতনায় পরিণত করার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বড় করে দেখাতে চায়। এর ফলে দেশটির অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, তাদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও ধর্ম বিপন্ন হয়ে পড়ে।

ঠিক এই চিত্র আমরা বর্তমানে ভারতের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ করছি। ভারতের হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং তার ক্রমবর্ধমান বিস্তারের কারণে সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে এক ধরনের অহংকারী গর্ব কাজ করছে, যার ফলে তারা সংখ্যালঘুদের অস্বীকার করছে। এর ফলস্বরূপ ভারতের সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ছে, এবং দেশটি ক্রমাগত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন ভারতে যেকোনো উদ্যোগের আগে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিটির ধর্ম কী? এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও সংকটজনক হবে বলেই মনে হয়।

সুতরাং, যখন আমরা  জাতীয় পুনর্জাগরণ  বা  জাতীয় পুনর্গঠন  নিয়ে কথা বলি, আমাদের বুঝতে হবে, এই ভাষ্য বহুজাতি, বহুধর্ম ও বহুসাংস্কৃতিক দেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কারণ তখন মিথ্যা জাতীয় গর্ব, অহংবোধ এবং অতীত ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ প্রয়াসের মাধ্যমে জাতিগত সংঘাত শুরু হয়।

এই কারণেই, আমাদের দেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মানুষের চেতনাবৃদ্ধি, যেখানে শান্তি, সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির চেতনা সর্বাগ্রে থাকবে। কারণ, এই বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বিশ্বের জন্য সহাবস্থানের বিকল্প আর কিছুই নেই। আর এই সহাবস্থান নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সচেতনতার প্রসার ঘটানো।

মানুষ আসলে কী চায়?

মানুষ যে জীবনে কী চায়, সে তা জানে না। সে জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে আছে হতচকিত, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে আসলে জীবনের শেষ প্রান্তে কী চায় বা তার জীবনের চলতি সময়েও যে সে কি চায় ? কিন্তু বাস্তবে, সে জানেই না সে কী চায় এবং শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করবে। কেউ কেউ বলবে, তারা জীবনে সফল হতে চায়, বড় কিছু করে দেখাতে চায়, মানুষের সেবা করতে চায়, নেতা হতে চায়, কিংবা এমন কিছু করতে চায় যাতে মানুষ তাকে চিনতে পারে, পৃথিবী ব্যাপি সেলিব্রেটেড কেউ একটা কিছু হতে আবার অনেকেই বলবে, এমন কিছু করে দেখাতে চায় যেন সেটা self-made কোনো অর্জন হয়, আর সেটাই যেন তার জীবনের সাফল্য। কিন্তু এখানেই থেকে যায় একটা বড় ফাঁক, এই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে এবং মানুষের সফলতার সংজ্ঞার মধ্যখানে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এইসব জিনিসকে কি সত্যিই সফলতা বা জীবনের পূর্ণতা বলা যায়?

তাহলে, মানুষ কী করলে এই পৃথিবীতে সফল এবং পরিপূর্ণ হতে পারবে? কী করলে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবে "আমি যা চেয়েছিলাম, তা- অর্জন করেছি"? আদৌ কি মানুষ এমন বলতে পারবে? যদিও মানুষ কিছুটা সফলতা, কিছুটা অর্জন, কিছুটা পূর্ণতার অনুভূতি পেতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ তার মূল চাওয়া-পাওয়া মানুষ হিসেবে তার শেষ পরিণতিকে কখনোই পূর্ণ বলে দেখতে পারে না। মানুষ আসলে একটি অসম্পূর্ণ প্রাণী আর এই প্রানির চলমানতাই বা জীবনব্যাপী পদচারনাই হচ্ছে অসম্পূর্ণ, সে জানে না জীবনের মানে কী, জানে না জীবন তার কাছে কী চায়, জীবনের উদ্দেশ্য কী, বা কেনই বা সে এই পৃথিবীতে এসেছে। সুতরাং, কী এমন সে বলবে, আর এমন কিছু করবে এই পৃথিবীতে, যাতে সে সত্যিই নিজের কাছে বলতে পারে, আমি সফল, বা আমি জীবনের পূর্ণতা দেখে যেতে পেরেছি? বা আমি যা চেয়েছি তাই পেয়েছি ? তো কখনোই হবার নয়।

জীবনের সাথে সম্পর্কিত যা কিছু আছে, তা আমাদের বাস্তবতাকে তৈরি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাস্তবতা কী? আবার, এই বাস্তবতাকে তৈরি করেছে কে? যদি আমরা তা সংজ্ঞায়িতই না করতে পারি, তাহলে তো বড় সমস্যা! অনেক দার্শনিক, চিন্তাবিদ বা বিজ্ঞানীরা, যারা এই পৃথিবীকে আজকের রূপে আনতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন ,তাদের কারো জীবনেই কি পূর্ণতা এসেছে? কেউ কি বলতে পেরেছে জোর গলায়, আমি আমার জীবনে পূর্ণতা পেয়েছি? তারা সবাই ছিলেন জীবন নিয়ে দ্বিধা-ধন্দে... এক অমীমাংসিত ধাঁধার মধ্যে। তাঁরা সারাজীবন খুঁজে গেছেন সেই চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর, কীভাবে জীবনের পূর্ণতা পাওয়া যায়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও দেখা যায়, হাজার হাজার কবিতা, শত শত বই, অসংখ্য শিল্পকর্ম সৃষ্টির পরেও, জীবনের শেষ সময়ে কোথাও যেন একটি অপূর্ণতার হাতছানি তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

মানুষ অস্তিত্বগতভাবে স্যাডিস্ট, সে নিজেকে কষ্ট দেয়া ভালোবাসে। সে নিজেই নিজেকে দুঃখী করে তোলে এবং সেই দুঃখ ছড়িয়ে দেয় অন্যের মাঝে। মানুষের সবচেয়ে ভয়ানক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে নিজের ভিতরের দুঃখটা অন্যদের জানাতে চায়, সে চায় সবাই জানুক, সে সুখী নয়, দুর্দশা তার জীবনকে গ্রাস করেছে। এই কারণেই সে অন্যের কাছ থেকে একটা স্বীকৃতি চায়, আর সেটা হল তার দুঃখের স্বীকৃতি। কিন্তু এই দুঃখ মানুষের ভেতর কেন জমে? কি কারনে মানুষ দুঃখ পেতে চাই ? কারন মানুষ তার জীবনের অপূর্ণতা নিয়ে থাকে দোলাচালে। তাই তো দুঃখ তার নিত্ত সঙ্গী, সে নিজের দুখের প্রকাশ কে তার অপূর্ণতার মধ্যে ফিল করতে চাই তাছাড়া , এর উত্তর হচ্ছে, মানুষ তার আত্মার গভীরতা থেকে অনুভব করতে পারে, সে যাই করুক না কেন, সে সবসময়ই অসম্পূর্ণ থাকবে। তার জীবনের পূর্ণতা, চূড়ান্ত অর্জন, সেটা কী, সে জানে না। তাই এই দুঃখবিলাস, কান্নাকাটি, এই বিষণ্নতার প্রকাশই সে করে বেড়ায়। এই মানবিক দুঃখকে সবচেয়ে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে আমাদের কবিসমাজ। তারপর আমাদের দার্শনিকেরা। আপনি যদি এদের রচনাবলি দেখেন, দেখবেন প্রতিনিয়তই সেখানে জীবনের অসম্পূর্ণতার কথাই বলা হয়েছে।

তাহলে মানুষ কীভাবে জীবনে সফলতা পাবে? কী করলে সে জীবনের চূড়ান্ত অর্জন করতে পারবে? কী করলে সে বলতে পারবে, সে জীবনে পূর্ণতা পেয়েছে? কোথায় গেলে সে নিজের কাছে সত্যের সাথে বলতে পারবে , আমি জীবনে যা চেয়েছিলাম, তাই পেয়েছি ? এরকম উত্তরের খোঁজ যেমন খুব কঠিন, তেমনি খুব সহজও। আমরা যারা খুব শিক্ষিত, পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিচ্ছি, অথবা পার্থিব জীবনে যাদের কিছু অর্জন আছে, অর্থ-সম্পদ হোক কিংবা পারিবারিক পরিপূর্ণতা, তাদের মধ্যেও কিন্তু কোথাও না কোথাও অপূর্ণতার ঘাটতি থেকে যায়। আপনি এদের দেখবেন সারাজীবনই একটা অস্থিরতা, একটা না থামার প্রয়াসে ছুটে চলেছে, আর তাদের নিত্ত সাথি হচ্ছে তাদের অসীম ব্যস্ততা এর কারণ কী?

এর কারণ হচ্ছে, সে জানে না কোথায় থামতে হবে। আর সে জানে না বলেই, তার এই অনির্ণয় যাত্রা, ছুটে চলা আর ব্যস্ততা। সে মনে করে, হয়তো সে সফলতার পথে আছে, পূর্ণতার পথে এগোচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তার অবচেতন মন জানে, সে আসলে অসম্পূর্ণ। এই কারণেই তার জীবনে এত টানাপোড়েন। মজার বিষয় হচ্ছে, যখনি সে জানবে, উপলব্ধি করবে যে জীবন আসলেই অসম্পূর্ণ, তখনই তার জীবন আসলেই পূর্ণ হয়ে যাবে। কেটে যাবে তার জীবনের ব্যস্ততা আর চলমানতা এই কারণেই আপনি দেখবেন, যারা খুব কম অর্জন করে জীবনে, প্রতিনিয়ত অভাব, ঘাটতি, দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে জীবন কাটায়, তারা অনেক সময়েই দেখবেন সুখী থাকে। কারণ তারা সচেতনভাবে জানে, তাদের জীবন আসলেই অসম্পূর্ণ। একারনেই এদের জীবনের ব্যস্ততা, অস্থিরতা, চলমানতা নেই এখানেই জীবন কিছুটা আনফেয়ার গেম খেলে আমাদের সাথে যদিও মনে হতে পারে পৃথিবীতে যারা সম্পদ শালি তারাই আগায়ে আছে কিন্তু ইন রিয়ালিটি জীবনের অর্থ সম্পদে অভাবিরাই মুলত সুখ আর শান্তি তে অগ্রগামী।

মানুষ যখন জানতে পারবে যে সে আসলে অসম্পূর্ণ, জীবন যাই করুক না কেন, এবং এই সত্যটা সে মেনে নিতে পারবে, তখনই সে পূর্ণতার একটা অনুভূতি পাবে। তবুও থেকে যাবে একটি প্রশ্ন, সে আসলে কী চায়? এর উত্তর তবুও জানা থাকবে না। আসলে মানুষ কখনোই জানতে পারে না এবং কখনই জানতে পারবে না , সে জীবনে কী চায়। সে তার জীবনে কী চায়, তার উত্তর না জেনেই একদিন পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে যায়।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...