মানুশ লাভস অ্যান্টি হিরোজ, হোয়াই?









সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, যেখানে তরুণ-তরুণীসহ অনেকেই ভিলেন, সাইকো, এন্টাগনিস্ট ক্যারেক্টার, বেয়াদব চরিত্র, এন্টি-হিরো (anti-hero) এবং অন্যান্য নেগেটিভ ব্যক্তিত্ব বা রোলকে আইডল হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। তারা প্রাউডলি নিজেদেরকে ভিলেন, বেয়াদব, সাইকো বা গুন্ডা বলে পরিচয় দেয়, এবং এতে তাদের কোনো অস্বস্তি বোধ হয় না। আধুনিক মানুষ মনে করছে এই ক্যারেক্টারগুলো স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক। আবার হয়ত মানুষ মনে করছে, এগুলো প্রচলিত নিয়ম ও বিধানকে অস্বীকার করার রোল মডেল। এই যে এন্টি-হিরো (anti-hero) বা ভিলেন ক্যারেক্টারের প্রতি আধুনিক মানুষের আগ্রহ, এই চিন্তাধারা তাদের মধ্যে কিভাবে ঢুকলো? এটা কোথা থেকে এলো?

আধুনিক সময়ে মানুষের এই ব্যাড আইডিয়ালাইজেশন (idealization) বা চরিত্রের বেয়াদবিয়াযেশন (bad-boyification) প্রায়শই উঠতি বয়স থেকে যুবক সহ সব শ্রেণীর মধ্যে দেখা যায়। মানুষ নিজেকে বেয়াদব, খারাপ, ভিলেন, গুন্ডা এবং এন্টি-সোশ্যাল সাইকো (anti-social-psycho)ভাবতে শুরু করেছে, এবং এটি সমাজে উত্তরোত্তর বাড়ছে। আমরা সমাজে যে ক্যাওয়াশ/নৈরাজ্যকর এবং অপরাধ প্রবণ পরিস্থিতি দেখছি, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষ নেগেটিভ রোলকে আইডিয়ালাইজ (idealize)করছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে থেকে দয়া, ভালোবাসা, সিমপ্যাথি এবং এম্প্যাথি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

আধুনিক সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, টিভি সিরিজ এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে পজেটিভ রোলকে এত বেশি সরল, বোকা এবং দুর্বল করে তোলা হয় যে মানুষ এই ধরনের পজেটিভ রোলকে(pistive-hero) ঘৃণা করতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, নেগেটিভ এবং এন্টি-হিরো (anti-hero) রোলগুলোকে এত বেশি রাঙিয়ে, আত্মবিশ্বাসী, শক্তিশালী এবং এক্সাজারেট করে দেখানো হয় যে মানুষ এই ধরনের নেগেটিভ রোলে আরো বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে, নিজেদেরকে ঐরকমই ভাবতে তারা ভালোবাসছে।

ব্যক্তির প্রাইভেসি ও একাকীত্ব এবং সমাজ বিচ্ছিন্নতা

 









(১)

আমরা এই সময় এসে প্রাইভেসি নামক নতুন শব্দ বা ধারণার  কথা শুনি। যদিও প্রায়ভেসি শব্দটা নতুন কোন ধারনা নয়, এটা ইংরেজি শব্দ privacy /প্রাইভেসি থেকে এসেছে। এর মানে হলো গোপনীয়তা বা এমন কিছু যা অন্যের নজর থেকে সুরক্ষা দেওয়া, এইটা হতে পারে ব্যক্তিগত তথ্য, চিন্তা ও জীবনযাপন । এবং এই বিষয়গুলোকে মনে করা হয় যে একজন ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার।  এই প্রাইভেসি কে আমাদের বুঝতে হলে কিছু প্রচলিত শব্দ বা প্রশ্ন আমরা উদাহরণ হিসেবে দিতে পারি যেমন আমরা প্রায় ইউজ করি যে, আমার প্রাইভেসি আমি খুবই গুরুত্ব সহকারে মেইনটেন করি বা আমাদের সুশীল সমাজের অংশীরা প্রাইভেসির লংঘন বলে যে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সেটা প্রাইই বলে।  এইসব প্রশ্ন আমরা বা উদাহরণ আমরা প্রায়ই টানতে পারি, প্রাইভেসী ধারণা দিতে গিয়া। এখন আমার কাছে কোশ্চেন হচ্ছে কি এই প্রাইভেসি? প্রাইভেসি বলতে কি বুঝায়? আমরা সামস্টিকভাবে প্রাইভেসিকে কিভাবে ডিফাইন করবো?  কোন যুক্তিতে একটা ঘটনা প্রাইভেসি লঙ্ঘন হইয়া উঠে? এবং এর গুরুত্ব কতটুকু?  এইটা আমাদের কে নির্ধারণ করতে হবে। আর একজন ব্যক্তির প্রাইভেসির সীমা টা কতটুকু? এইটা আমাদের কে সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম সমূহের মাধ্যমে ডিফাইন করতে হইতে পারে। তাহলেই আমরা প্রাইভেসির যে বিস্তারিত ধারণা ও সামাজিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ সেটা আমরা বুঝতে পারবো।

 


(২)

দেখেন প্রাইভেসির বিষয়টা এই মুহূর্তে খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। এইটা নিয়ে আমাদের আলোচনার দরকার আছে । কারণ প্রাইভেসিটা বর্তমানে গোপনীয়তা এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবনের সাথে সরাসরি জড়িত।  এই বিষয়টাকে বলা হয় মানুষের যতগুলা অধিকার রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে ভাইটাল মৌলিক মানবাধিকার। এবং আমাদেরকে বিষয়টাকে আরো খোলাখুলি ভাবে প্রত্যেককে সচেতন করার  ও জানানোর দরকার আছে । দেখেন আমরা এইখানে প্রায়ভেসির যে আলোচনা, এই আলোচনা প্রাইভেসির গুরুত্ব  ও তাৎপর্য নিয়ে না, এইখানে আমরা প্রায়ভেসির বিষয়টা আলোচনা করব সামাজিক দৃষ্টিকোণ থাইকা। 

কেন বর্তমানে প্রায়ভেসি মানুষকে আরো বেশি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে প্রতিনিয়ত।  এই প্রাইভেসি যে মানুষকে সমাজের প্রতি একটা বিরূপ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গি রাখার দরজা দেখিয়ে দিচ্ছে তা আলোচনা করব, অর্থাৎ মানুষ প্রাইভেসিকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যার ফলে মানুষ সমাজকে তার শত্রু জ্ঞান মনে করছে । 

এই যে সচেতন করা বা জানানোটা , এইটা হচ্ছে এইজন্যেই যে, কেন আমরা সামাজিক বিষয়কে নিম্নগামী করে ব্যক্তির বিষয়, ব্যক্তির চিন্তা ও চেতনাকে, ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতাকে প্রাইভেসির নাম দিয়া,  ব্যক্তিকে আরো বেশি একাকী বা  একাকিত্বের মধ্যে ছেড়ে দিচ্ছি। দেখেন আপনি যত বেশি প্রাইভেসির জন্য এডভোকেশি করবেন আপনাকে বুঝতে হবে মানুষের একাকিত্বের হার তত বেড়ে যাবে। কারণ প্রাইভেসিটা মূলত একাকিত্ব কে নির্দেশ করে। মানুষকে সামাজিক হতে বাধা প্রদান  করে। কিভাবে এই প্রাইভেসি মানুষকে একাকিত্বের দিকে ছেড়ে দেয় এইটা নিয়েও আমাদের আলোচনার বিষয় আছে। 


(৩)

দেখেন বর্তমানে মানুষ নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে খুবই সচেতন, সেটা গ্রাম থেকে শহর, যেখানেই হোক না কেন। মানুষ নিজেকে চেনুক আর না চেনুক। সে মনে করে সে নিজেকে ভালোভাবেই চেনে। সে যেটা না সেইটাকে প্রকাশ করার একটা তীব্র আখাংকা মানুশের মধ্যে দেখা যায় এবং এইটা তে সে অতিরঞ্জিত করে।  

মানুষের মধ্যে একটা স্বাভাবিক প্রশংসা পাওয়ার একটা আগ্রহ থাকে। সে যেইটা না ওইটা তো প্রশংসা পেতে চাই। সে চায় মানুষ তার প্রশংসা করুক, মানুষ তাকে বড় ভাবুক এবং তার বড়ত্বকে মানুষ অন্যের নিকট প্রকাশ করুক। এর ফলেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে খুবই স্ট্রং ও প্রশংসাযোগ্য মনে করে। এইটা মানুষের বেসিক সাইকোলজি।  দেখেন এইটা কে বলা যেতে পারে নিড ফর ভ্যালিডেশন বা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা। এইটা যখন অতিরিক্ত হইয়া যায় তখন এইটাকে বলে নারসিজম বা narcissism।  ব্যক্তির স্বীকৃতি  পাবার যে আকাঙ্ক্ষা এবং এই স্বীকৃতির পেছনে নিজেকে প্রশংসাযোগ্য করে তোলার সতীব্র ইচ্ছাকে সে যখন নিজের মধ্যেই ধারণ করে ফেলে তখন সেটাই হইয়া যায় নার্সিজম। 

দেখেন মানুষ তখনই সামাজিক হইয়া উঠে যখন সে নিজেকে ভুলে থাকে। নিজেকে ভুলে থাকা মানে অন্যকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের গুরুত্বের জায়গা কে সংকুচিত করে দেওয়া। আর এর বিপরীত যখনই ঘটবে তখনই আপনি নার্সিজমের ঘটনা দেখতে পাবেন। প্রশ্নটা যদি আমি লিটারেল মিনিং এ নিই, যে নরসিজম মানে কি?  

তাহলে নার্সিজম বলতে আমরা বুঝি এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, নিজের প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধতা পোষণ করেন এবং অতিরিক্ত প্রশংসার প্রয়োজন বোধ করেন।দেখেন এগুলো বা এইসব চিন্তা মানুশের  ভেতরে কখন আসে?   তখনই আসে যখন মানুষ নিজেকে সেন্টার ভাবে বা কেন্দ্রীয় চরিত্রভাবে এবং নিজেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ কেওটা  মনে করে। এই যে নিজেকে গুরুত্ব ভাবা নিজেকে সেন্টারে নিয়ে আসা এই চিন্তাটাই মূলত তো মানুশকে একাকী করে রাখে, একাকীত্ব করে। 

অন্যের চেয়ে আলাদা ভাবার যে মানসিকতা, নার্সিজম শিক্ষা দেয়। এইটাই মানুষকে আরও বেশি একাকিত্বের পথ ধরিয়ে দেয়। ফলে মানুষ আরো ব্যক্তিগত হইয়া ওঠে। তখনই মানুষের চিন্তায় আসে তার আলাদা সত্তা বা এক আলাদা ব্যক্তিত্বের, যেইখানে সে তার নিজের একটা সীমানা বিল্ড করে এবং এইটাকে  রক্ষার অনুভব হয়  বা নিজের গুরুত্বকে প্রটেক্ট করতে গিয়া নিজের ব্যক্তিত্বের চারপাশে একটা বাউন্ডারি তৈরি করার যে মানসিকতা, এইটাকে আমরা বলতে পারি প্রাইভেসির থট বা চিন্তার উদ্ভব। 


(৪)

আমরা যে বিষয়টা দেখলাম, মানুষ সোসাইটিতে যখন বাস করতে যায়, তখন মানুষ আত্ম-অনুসন্ধানের ফলে  নিজেকে খুঁজে এবং সে তার নিজের কর্মকাণ্ডের একটা সোশ্যাল ভালিডেশন(social validation) বা সমাজিক স্বীকৃতি চাই। এবং সামাজিক স্বীকৃতির অতিরিক্ত আশাটাকে অতিরিক্ত প্রশংসার যোগ্য মনে করিয়া তোলে এবং এই থেকে মানুষের ভেতরে একটা নার্সিজম বা নার্সিস্টিক চিন্তা ঢুকে যায়। এইটা থেকে আসে মানুষের আলাদা ব্যক্তি সত্তা বা ব্যক্তিত্ব, যেখানে মানুষ এইটাকে প্রটেক্ট করতেই নিজের প্রাইভেসির ধারণা সে তৈরি করে। 

দেখেন সমাজের যে সোশ্যাল ভ্যালিডেশন বা সামাজিক স্বীকৃতি এইটা মানুষকে আরো বেশি আত্মপরিচয় গঠনে, তাকে যোগ্যতার ও অধিকারের প্রতি মনোযোগী করে তোলে, তার চেতনার উন্নয়ন ঘটায় এবং সমাজের প্রতি তার যে জীবনবোধ এবং তার নিজের প্রতি যে তার জীবনবোধ ও আত্ম বাস্তবায়ন, এইটাতে সে একটা নিজস্ব পরিচয়  খুঁজে পাই তাকে আমরা বলতে পারি নিজস্বতা বা স্বতন্ত্রতা (individualism)।  এবং এই পরিচয় খুঁজে পাওয়া (স্বতন্ত্রতা বা নিজস্বতা )কে সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করে এবং এইটাকে প্রটেক্ট করতে চাই। এই যে প্রোটেক্ট করা আর তার প্রচেষ্টা, এর ফলে সে নিজের সমস্ত চেতনায় চারপাশে সে একটা সীমানা ও বাউন্ডারি তৈরি করে। এইটাকে আমরা বলতে পারি প্রাইভেসি। 

 এই যে প্রাইভেসি এখন এই প্রাইভেসিকে আমরা কিভাবে ডিফাইন করবো? এর সীমা কতটুকু , এইটা আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে এবং এইটা যদি আমরা সঠিক ভাবে নির্ধারণ করতে পারি তাহলে আমরা এর ব্যাড প্র্যাক্টিস ও গুড প্র্যাকটিস সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করতে  পারবো। 


(৫)

সো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হোয়াট ইজ প্রাইভেসি? 

এখন আমি যদি বলি প্রাইভেসি বলতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, ভাবনা ও কাজের উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকারকে বোঝায়।

এই যে সরলীকরন সংজ্ঞায়নে, আমরা প্রাইভেসির ব্যাখ্যা করলাম, যেখানে ব্যাক্তিগত বিষয়গুলোকে প্রটেক্ট করার একটা আকাঙ্ক্ষা কে উল্লেখ করলাম।  শুধু এটাই কি প্রাইভেসি। আধুনিক এই সমাজে ব্যক্তি ও ব্যক্তির বিষয়াবলি কে সম্পদ বলে মনে করা হয়, এই কারণে ব্যক্তি হইয়া ওঠে একটা স্বৈরাচারী একক উপাদান এবং এই উপাদানকে রক্ষা করার যে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা এই চিন্তাকে আপনি প্রাইভেসি রক্ষার নাম দিতে পারেন। কিন্তু এইটাকে আপনি ব্যাক্তিত্ব রক্ষার নাম দিয়া প্রাইভেসি বলে চালায়া দিতে পারেন না। 

প্রাইভেসি খুবই সরল ও সোজা একটা ধারণা মনে হলেও এর ব্যাপকতা খুবই জটিল । কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রাইভেসি একটা চেইন ও কন্ট্রোলড গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসে। যেখানে ব্যক্তিকে মিস্টিরিয়াস করে তোলা হয়, যেখানে ব্যক্তির মধ্যে একটা ব্যাপার থাকে এবং এই ব্যাপারটা অন্যের জন্য আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাইভেসি যেমন মানুষকে মিস্টিরিয়াস বানাই ঠিক তেমনি প্রাইভেসির জন্য একটা মানুষ অন্য মানুষের নিকট অ্যাডভেঞ্চারাস হইয়া ওঠে। আমরা যদি প্রাইভেসিয়ার উপাদান গুলো আলোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো যে: ব্যক্তির তথ্য গোপনীয়তা, যোগাযোগ গোপনীয়তা, শারীরিক গোপনীয়তা, আচরণিক গোপনীয়তা,   মনোভাব ও অনুভূতির গোপনীয়তা।

আবার প্রাইভেসির যদি একটি সরল সংজ্ঞায়ন আমরা করি তাহলে বলতে পারব, প্রাইভেসি হল এমন একটি অবস্থা বা অধিকার এখানে একজন ব্যক্তি নিজের তথ্য, ভবনা, অনুভূতি এবং ব্যক্তিগত কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে এবং অন্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বা নজরদারি থেকে মুক্ত থাকে।

এই সংজ্ঞায়ন থেকে প্রাইভেসির একটা সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপক পরিচয় পাচ্ছি, যেইখানে ব্যক্তিত্বকে  সমাজের অন্য মানুষের  আলোচনার বিষয় হতে রক্ষা করার জন্যই এই প্রাইভেসি। 


(৬)

এইযে একজন ব্যক্তির এই বিষয়গুলোর গোপনীয়তা এবং এই গোপনীয়তার চাদরের কারণে ব্যক্তি আরও দুর্বোধ্য হইয়া ওঠে। ব্যক্তির মধ্যে একটা স্বৈরাচারী ভাব ফুটে ওঠে, ব্যক্তি নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে। 

ব্যক্তি নিজেকে এই গোপনীয়তা ও প্রাইভেসির নামে নিজেকে করে তোলে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। সমাজে সে সামষ্টিকভাবে বাস করলেও সে হইয়া উঠে একটা আলাদা এন্টিটি। এইটার নাম দেয় সে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হইয়া ওঠা এবং এই এন্টিটি বা ব্যক্তিত্ব তার কাছে তখন একটা প্রপার্টি বা সম্পদ বলে মনে হয় এবং এইটা রক্ষার তার প্রয়োজন অনুভূত হয়। 

ফলে, সে এই প্রপার্টির চারপাশে একটা সীমানা নির্ধারণ করে, এইটার সে নাম দিয়েছে প্রাইভেসি । এর ফলে  সমাজের সাথে সে একটা আলাদা সীমানা প্রাচীর তৈরি করে । এর ফলে সমাজ যেমন তাকে ওন করে না, তেমনি সে নিজেও সমাজকে ওন করে না এবং সমাজ থেকে সে নিজেকে থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। 

দেখেন ব্যক্তির মধ্যে এ যে তথ্য, যোগাযোগ শারীরিক, মানসিক, অনুভূতিগত ও আচরনিক গোপনীয়তা মানসিকতা সেইটার ফলে সে আরো বেশি বিচ্ছিন্ন ও একাকীত্ব হইয়া পড়ে। এবং মানুষ নিজেকে সমাজের সবার থেকে নিজেকে রক্ষা করার মানসিকতা তৈরি হয়। 

আবার এই প্রাইভেসির নাম দিয়ে যে দুর্বোধ্য মানসিকতা, তার মধ্যে তৈরি হয়, এইখানে সে সমাজকে এনিমি বা শত্রু ভাবা শুরু করে। সমাজ হইয়া উঠে তার প্রতিপক্ষ। সমাজকে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবতে থাকে। মনে করে সমাজই তার শত্রু এবং  তার বিকাশে ও প্রকাশে সমাজ তাকে বাধা দেয়। 

এই যে প্রাইভেসির নামে সমাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব, সমাজকে শত্রু ভাবা, প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা এইটার ফলে সমাজের সাথে তার একটা সীমারেখা টানা হইয়া যায়। ফলে সমাজকে সে কখনো আর আপন ভাবতে পারেনা। এবং সমাজে প্রত্যেকটা ছোট ছোট ইউনিট অফ ইনস্টিটিউশন কে সে প্রতিদ্বন্ধী বা  শত্রুই ভাবে। এইখানে সমাজের ইউনিট অফ ইনস্টিটিউশন(unit of Institutions) গুলো পরিবার হতে পারে, ব্যক্তি সমষ্টি  হতে পারে, তার পিয়ার গ্রুপ হতে পারে অথবা সমাজের প্রত্যেকটা বিষয়-ব্যক্তি হতে পারে।

আর এই প্রত্যেকটি unit of Institution কে সে তার শত্রুর কাতারে ফেলে দেয়। প্রাইভেসীর নামে  ব্যক্তির সীমানা, তার  সাথে সমাজের যে একটা এক রৈখিক দ্বন্দ্ব, সেটা তৈরি করেছে ব্যক্তি নিজেই। 

এখানে সমাজের আসলে কিছু করার নাই। এই প্রাইভেসিটা ব্যক্তি নিজেই তৈরি করেছে, এটাকে প্রটেক্ট করে ব্যক্তি নিজেই। কারণ সমাজকেই সে শত্রুভাবে এবং সমাজের কাছ থেকেই সে বাঁচতে চায়, এর কারণেই তো এ প্রাইভেসি। 

প্রাইভেসির নামে যত ব্যাড প্র্যাকটিস বা  প্রত্যেকটা ব্যাড প্রাকটিসের দায় ব্যক্তির নিজের, সমাজের এখানে কিছু করার থাকে না।  

আমরা তাহলে প্রাইভেসির যে ব্যাড প্র্যাক্টিস  বা প্রাইভেসির যে চর্চা।  ব্যক্তি জীবনে, সেইটাকে কিভাবে আরো রিফর্ম করে ব্যক্তিকে আরও বেশি সামাজিক ও সামষ্টিক করে তোলা যায় সেইটা আমাদের ভাবতে হবে। তবে এই আধুনিক জীবনের চেতনায় সামষ্টিকতার যে নতুন ভাবনা এইখানে প্রাইভেসির নামে ব্যাক্তিকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করার মানসিকতা তৈরি হবে এবং উত্তরোত্তর এটা বাড়বে। এর বিপরীতে সামষ্টিক ও সামাজিক ভাবনার অনুভূতি কমতে থাকবে।

'ঘোড়ারডিম বিশ্ববিদ্যালয়'









[এক]

এই দেশে প্রকৃত অর্থে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই; কখনো ছিলও না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা এই প্রেক্ষাপটে আদৌ প্রতিষ্ঠা পায়নি এবং ভবিষ্যতেও হয়তো তা অসম্ভব। এখানে যা বিদ্যমান, সেগুলো মূলত স্কুল-কলেজের পরিধির সামান্য এক্সটেনশন ও  নামমাত্র প্রতিষ্ঠান। ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণের পেছনে শুধু উন্নাসিকতাই আছে, যে নামের শেষাংশে "ইয়ান" যুক্ত করার মধ্যেই যেন শিক্ষাব্যবস্থার সারবত্তা পূর্ণ হয়ে যায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত অর্থ, চেতনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ফলে, এ দেশে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নাম নিয়ে টানাহেঁচরা অব্যাহত থাকাই স্বাভাবিক, এবং এই মনোভাব থেকেই নামের চেয়ে অর্থবহ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা একেবারে অনুপস্থিত।


[দুই]

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে যেসব ফ্যাকাল্টি সমাজ বা শিল্পক্ষেত্রে কার্যত প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে না, সেসব ফ্যাকাল্টি অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা কমবে । যারা প্রকৃত মেধাবী, তারাই শুধু কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সীমিত আসনের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবার যোগ্যতা অর্জন করবে, এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। অপরদিকে, যাদের অর্থ আছে ও পড়াশোনার গরজ আছে, তাদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা। এতে মেধার সত্যিকারের চর্চা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার নামে এই অগভীর ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ সংস্কৃতি ও বিপথগামী ব্যবস্থার অবসান ঘটবে।

এই 'ঘোড়ারডিম বিশ্ববিদ্যালয়' বা 'ঘোবিয়ান'  ও অনর্থক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি অবিলম্বে ভাঙতে হবে।

সামাজিক থাইক্যা মানুশের ব্যক্তি হইয়া উঠা

 














[১]

মানুশ নিজেদেরকে নিয়ে খুব কমই ভাবে , মানুশ অন্যকে নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। অন্যের ভুলত্রুটি, ভালো-মন্দ সমস্ত কিছ সে জানতে চায় , অন্যের সমস্ত কিছুকে তার জাজ করা চায় ও জানার একটা অধিকার সে পেতে চায়। এইটা কে বলে নাক গলানো, এই নাক গলানোটা নেগেটিভ কিছু না। এইটাকে আমাদের পজিটিভলি দেখতে হবে। আপনি যখন সোসাইটিতে  বাস করা  শুরু করবেন, তখন আপনাকে কিছু বিষয় মেইনটেইন করতে হবে এবং সোশ্যাল বিইং হিসেবে সোসাইটিতে থাকতে হলে এইগুলা আগ্রাহ্য করে আপনি কখনোই সোশ্যাল মেম্বার হওয়ার পারবেন না।  সোসাইটি কখন  সোসাইটি হইয়া ওঠে? এর জন্য কিছু পূর্ব শর্ত রহিয়াছে এবং তার মধ্যে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, মিউচুয়াল কোঅপারেশন এবং মিউচুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন। দেখেন মিউচুয়াল কোঅপারেশন এবং মিউচুয়াল ইন্টারেকশন দুটাই কিন্তু একটা মাধ্যমই হয় সেটা হচ্ছে সোস্যাল এন্গেজমেন্ট বা নাক গলানো । সুতরাং আমি যে বিষয়টা বলতে চাচ্ছি নাক গলানো খারাপ কিছু না, নাক গলাটা অবশ্যই একটা পজিটিভ বিষয়। আপনার সোসাইটিতে নাক গলানো বিদ্যমান, মানে আপনার সোসাইটি একটিভ রহিয়াছে। সোসাইটি ফাংশন করে মিউচুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন এর জন্য। আর এই মিউচিয়াল ইন্টারঅ্যাকশন হয়তে হলে অবশ্যই  সমাজের সবার সমস্ত কিছু কে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে না হলে সেইটা আর মিউচুয়াল  ইন্টারেকশন থাকেনা। 


[২]

আধুনিক ক্যাপিটালিজমের  যুগে যেখানে ভোগই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং প্রোডাক্ট ও পণ্য গুরুত্ব হইয়া ওঠে মানুষের চেয়ে, মানুশের সম্পর্কের চেয়ে। এইখানে আপনি এই নাক গলানোকে  নেগেটিভলি দেখবেন, এটাই স্বাভাবিক। পুঁজিবাদ আপনাকে এটাই শেখায়। পুঁজিবাদ মানুষকে সমষ্টি থেকে  ব্যক্তি হতে শেখায় এবং ব্যক্তিকে তার নিজের জন্য বাঁচতে শেখায়। ব্যক্তি নিজের জন্য বাঁচতে গিয়ে অন্যকে ইগনোর করতে শেখে, অ্যাভয়েড করে এবং কেউ যদি তার লাইফে  ইন্টারফেয়ার করতে চাই সেইটা কে নিন্দনীয় হিসাবে দেখায়। দেখেন সমাজে ইন্টারফেয়ার অনেক ধরনের আছে, এর রকম ভেদ রহিয়াছে। কিন্তু আধুনিক এই ভোগবাদী সমাজ এই ইন্টারফেয়ারকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। দেখেন ওয়েস্টার্ন পুঁজিবাদী সমাজে আপনি সমাজের থাকাকে  উপলব্ধি করতে পারবেন কিন্তু সমাজের অস্তিত্বকে পুরোপুরি কাঠামোগত দাড় করাতে পারবেন না অর্থাৎ পশ্চিম পুঁজিবাদী সমাজ আসলে একটা মৃত সমাজে পরিণত হইয়াছে এই নাক গলানো না থাকার ফলে। এই কারণে আপনি দেখবেন পশ্চিমা কান্ট্রি গুলার সোসাইটির সোস্যাল বিইংরা  একে অপরের নাম পর্যন্ত  জানেনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে । দেখেন এশিয়ান কান্ট্রিগুলোর মধ্যে কোন দেশ যদি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ফার্স্ট বেঞ্চার হইয়া থাকে সেইটা হচ্ছে কোরিয়া এবং জাপান। এই দুইটা দেশের আপনি সমাজ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য রাখলে দেখবেন তারা তাদের সোসাইটির স্ট্রাকচার এবং তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সোশ্যাল স্ট্রাকচারের চেয়ে একেবারেই মিল নাই,  কারণ এই দুইটা দেশের নাগরিকরা যতটানা  সোশ্যাল তার চেয়ে বেশি পার্সোনাল। এই যে সোশ্যাল প্রাণীর পার্সোনাল হইয়া ওঠা, এইটা কিন্তু একটা মৃত সোসাইটির লক্ষণ। ইভেন যে পাঠ্যবই অথবা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আমাদের সাহিত্য ও আধুনিক  দিনকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এইগুলা কিন্তু আমাদেরকে পার্সোনাল হইতে শেখায়। প্রত্যেকের আলাদা স্টোরি, প্রত্যেকের আলাদা একটা ব্যাপার স্যাপার,  প্রত্যেকের নিজের একটা সারাউন্ডিং , যে সারাউন্ডিংয়ে সেই হচ্ছে সেন্টার, এইযে প্রত্যেকের আলাদা জগত এইটারে আপনারা নাম দিয়েছেন ইনডিভিজ্যুয়ালিজম / ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা। এইখানে ব্যক্তি মূখ্য,  সমষ্টির চেতনা ও স্বার্থ গৌণ। আর পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের সার্থকতা এখানেই। 


[৩]

এই যে আমি হিউম্যান কানেকশন যাকে মানব কানক্টিভিটিও বলা যায়,  এর জন্য মিউচুয়াল ইন্টারেকশন বা মিউচুয়াল কোওপারেশন এর কথা বল্লাম, সেইটাতে আমি মোটা দাগে নাক গলানোতে সরলিকরণ করেছি।  ফলে নাক গলানো কিন্তু সমাজের ব্যাকবোন হিসাবে সমাজকে টিকায়া রাখে।  এই সমাজে প্রত্যেকটা জায়গায় আমাদের নাক গলানো ও আমাদের চিন্তাকে নিয়ে যাইতে হবে। এটাকে আমরা বলবো সামষ্টিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি করা বা আমরা যে সমাজ নিয়ে ভাবি এবং সমাজের আমাদের একটা প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে এইটার প্রমাণস্বরূপ এই নাক গলানো ও চিন্তার প্রবেশ করানো। দেখেন আপনি যখন  প্র্যাকটিস করবেন এই নাক গলানো অন্যের ব্যাপারে, আপনি মনে করবেন আপনি এম্পাথি দেখাচ্ছেন ওই ব্যক্তিকে। এইটা আপনি নিজেই ভেবে নিয়েছেন। বাট অন্যরা যখন আপনার ক্ষেত্রে এইটার প্র্যাকটিস করবে সেইটা কিন্তু আপনাকে মনে হবে আপনার সীমানায় আপনার ব্যাপারে অন্যের সীমালংঘন। মজার বিষয়টা হচ্ছে এখানেই। অন্যের বেলায় আপনার নাক গলানো, এইটা কে হারমনি, এম্প্যাথি ও এনগেজমেন্ট বইলা চালাইয়া দেন, বাট অন্যরা যখন এইটা করে সেইটা তখন আপনার কাছে উৎকট নাক গলানো মনে হয়। সোসাইটির যে চিরায়িত ধারা এইখানে এইটা কমন ব্যাপার গোড়াগোড়িই থেকেই, বাট কখন থাইকা এই নাক গলানো টাকে আমরা নেগেটিভলি দেখছি সেইটা হচ্ছে মূল প্রশ্ন। এইটা মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকেই মানুষ এইটা নিয়ে ভাবা শুরু করে, মানুষ নিজেকে একটা আলাদা সত্বা হিসেবে ভাবতে থাকে।  মানুশের যে একটা আলাদা ক্ষেত্র দরকার, সেইটা নিয়ে মানুষ জানতে শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে মানুশ নিজেকে সামজিক জীব থাইক্যা মানবিক ভাবতে শুরূ করে। এই যে মানুষের সামাজিক থেকে মানবিক হইয়া ওঠা, এটার মাধ্যমেই মূলত মানুষ মিউচুয়াল ইন্টারেকশন কে পজিটিভ ও নেগেটিভ উভয় দৃষ্টিকোন থাইক্যা  দেখতে শুরু করে।  আর এই পুঁজিবাদী চিন্তাভাবনারও শুরু কিন্তু এই উনবিংশ  শতাব্দী থেকেই।  ফলে এই মানবিক চিন্তায় মানুষকে একটা নতুন রূপ দান করে, আর এর জন্য মানুশ তার সামষ্টিক ইন্টারআকসনকে কিছুটা পাশে রেখে, ব্যাক্তিতে সীমাবদ্ধ হয় নিজে থেকেই। ভোগবাদ, পুঁজিবাদ এবং তথ্যের বিশাল প্রবাহ ব্যক্তিকে আরো বেশি ব্যক্তি কেন্দ্রিক বানায়া দেয়। ফলে সমাজের অনেক কিছু কেই সে বাতিল করে দিতে থাকে। দেখেন এই সোসাইটিতে অর্থাৎ বর্তমানে এইটা কিন্তু দোষের কিছু না। একা থাকতে চান, আপনি এই সিস্টেমকে মাইনা নিয়েই চলতে চান, সুতরাং এইটা বেস্ট অপশন ফর ইউ। বাট বাংলাদেশের মতো সমাজ ব্যবস্থায় এই সিস্টেমটা একটা সাইকো-সামাজিক দ্বন্দ্বের রূপ নিয়েছে। 


[৪]

এই যে আমি বললাম ব্যাক্তি স্বাধীনতার যে প্রভাব ও গুরুত্ব, এইটা যেমন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সোসাইটিতে প্রবেশ করছে কিন্তু বাংলাদেশ প্রথাগতভাবে অনুন্নত ও ম্যাটেরিয়ালিস্টিক না বলে যেই ঘটনাটা ঘটে, বাংলাদেশ সেইভাবে পুঁজিবাদী বা ভোগবাদী  হইয়া উঠতে পারেনি অথবা ভোগবাদ-পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটলেও সেইটা মানুষের সামাজিক জীবনকে ওইভাবে প্রভাবিত করতে পারে নি। আমরা যদি ধরেও নি যে এরা সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করে কিন্তু সামাজিক চিন্তার যে পুরাতন চিরায়িত  ধারা সেটাকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছে বাংলাদেশের সমাজ। ফলে যে ঘটনাটা ঘটে, নতুন যে প্রজন্ম এই প্রজন্ম যেমন ভোগবাদী-পুঁজিবাদী চিন্তায় ও চেতনার ফলে তাদের সাথে একটা মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব দেখা যায় বুমারস ও ওল্ড প্রজন্মের মধ্যে। দেখেন প্রত্যেকটা দেশের যে নিউ জেনেরেশন অর্থাৎ জেনজি যাদেরকে বলা হয় এরা কিন্তু ব্যাপক ওয়েস্টার্ন কান্ট্রি কালচার ও তাদের চিন্তা ও চেতনা দ্বারা  পুরোপুরিই প্রভাবিত। এই যে পৃথিবীর তাবৎ দেশসমূহের যে নতুন প্রজন্ম বা পৃথিবীর যে আগামি প্রজন্ম এরা একটা বৈশ্বিক নিউ কালচারে বড় হচ্ছে এবং তাদের চেতনায় বিশ্বাসই হচ্ছে ভোগবাদ, পুজিবাদ সচেতন কিবা অসচেতনভবে। এদের সাথে পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশের স্থানীয় কালচার, চিন্তা-চেতনার সাথে এদের এই মনো-সামাজিক দন্দ্বটার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। সুতরাং এইযে নতুন প্রজন্ম এদেরকে আপনি দেখবেন প্রচন্ডরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, একাকীত্ব, স্বার্থপর, ভোগবাদি, সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক এবং অন্যের প্রতি উদাসীন। এইটাই এই নতুন পৃথিবীর চেতনায় লালিত প্রত্যেকটা ব্যক্তিবর্গের বৈশিষ্ট্য। এই কারণে এদের দেখবেন তাদপর একটা আইডেন্টিটি বা নিজস্ব  ব্যক্তি এন্টিটি রহিয়াছে। এই এন্টিটিকে সে এমন করে রক্ষা করতে চায় যেমন করে বুমারস ও পূর্ব প্রজন্মের লোকেরা তাদের দেশ, জাতি ও বংশ রক্ষা করতে চাইতো। এই যে পার্থক্য এই পার্থক্যটা আপনি একটা দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখতে পারেন। উপরে উল্লেখিত আমার নাক গলানো এইটাকে নাকচ করে দেয় এই ব্যাক্তি এন্টিটি থাকা নতুন প্রজন্ম।  নাক গলানো কে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে করে। এবং তাদের জীবনের সবচাইতে মূল্যবান হইয়া উঠে তার এই ব্যাক্তি এন্টিটি। ব্যক্তি এনটিটি ধ্বংস হওয়া কে সে জীবনের ধ্বংস হওয়া মনে করে।  সুতরাং তার মান ইজ্জতের সম্পূর্ণ অংশটাই হচ্ছে তার এই ব্যক্তি এন্টিটি। আর এভাবেই সামাজিক এন্টিটি ব্যাক্তি এন্টিটিতে রূপ নেয়। এইটাকে আবার এরা নাম দিছে ব্যাক্তি প্রাইভেসি।

ওয়াজ/ জালসার বিবর্তন

 







[1] 

মানুষ এখন বয়ান বা ওয়াজ শুনে তার ভালো লাগা না লাগা থেকে। মানুষ, এখন যারা খাঁটি, সহি কথা বা ওয়াজ করছেন বা বলছেন, তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং যার বয়ানে সে তৃপ্তি পায় , সেই বয়ানই সে শুনছে। অথচ বয়ান বা ওয়াজ মূলত শেখার জন্য, মানার জন্য। মানুষ এখন নিজের সন্তুষ্টির জন্যই ওয়াজ বা বয়ান শুনছে। ধর্মীয় যে বয়ান, তা হওয়া উচিত ছিল আত্ম-সংশোধনের জন্য এবং নিজের বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। কিন্তু এখন এই বয়ান ভিন্ন আঙ্গিকে, শুধু তৃপ্তি পূরণের জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে। অনেকটা যেমন গান মানুষকে মানসিক তৃপ্তি দেয়, ঠিক সেই রূপে মানুষ ওয়াজ বা বক্তব্য শুনে মানসিক তৃপ্তি পেতে চাচ্ছে। বয়ান বা ওয়াজ মূলত বিনোদনের অংশ হিসাবই মানুষ এইটাকে নিচ্ছে।


[2] 

এখন এত ওয়াজের বা বক্তা কেন সমাজে? এর অন্যতম কারণ হলো মানুষ বিনোদন চায়, মানুষ ভিন্নতার মধ্যে নিজের সন্তুষ্টি চায়, মানুষ নিজেকে ব্যতিক্রম দেখাতে চায়। ব্যক্তি ও সমাজ এখন যতটা না সংশোধিত হতে চায় বা নিজের সমস্যার সমাধান করতে চায়, তার চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক বা রিলেটেড থাকতে চায়। অর্থাৎ সব জায়গায়তে জালসা ও ওয়াজ হচ্ছে, সুতরাং আমাদেরও ওয়াজ ও জালসার আয়োজন করতে হবে। এবং এমন কোনো এক ওয়াজের বা বক্তাকে নিয়ে আসতে হবে, যিনি ভাইরাল বা আলোচিত। ফলে এই ক্যাটাগরিতে জেনুইন ওয়াজ ও বক্তারা বাদ পড়ে যাচ্ছেন। আপনি যদি বর্তমানে জেলা শহর বা গ্রামীণ যে ওয়াজ মাহফিলগুলো দেখেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিলের অতিথি এবং বক্তারা সাধারণত সমাজ বা রাষ্ট্রের আলোচিত ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে অনেকেই নতুন মুখ, যাদের সামাজিক মাধ্যম বা মিডিয়াতে খুবই পরিচিত বা ভাইরাল মুখ। এখন বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে শিল্পী শ্রেণি, যারা ইসলামিক গান গায় বা ইসলামিক কৌতুক করে, এদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে, এটা ঠিক। তবে আমাদের ভাবতে হবে যে মানুষের চিন্তা-ভাবনারও একটা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।


[3] 

আগের গ্রাম বাংলার যে ওয়াজ মাহফিলগুলো আমরা দেখেছি বা শুনেছি, সেগুলোতে খুবই অপরিচিত এবং বিজ্ঞ আলেম সমাজকে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হতো। মানুষ তরিকতের ও ইসলামিক মন মানসিকতার সঙ্গে এসব মাহফিলে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু দিন দিন এটা কমে যাচ্ছে। আপনি দেখবেন, যেসব জায়গায় জেনুইন ওয়াজ মাহফিল করার চেষ্টা করা হয় এবং কোনো এক অপরিচিত আলেমকে নিয়ে আসা হয়, যিনি মিডিয়া বা ভাইরাল নয়, সেখানে দর্শক-শ্রোতা শূন্যের কোটায় থাকে। মানুষ এসব জলসায় যেতে চায় না। ফলে আলেম সমাজ ও বক্তারাও এমন ধরনের ওয়াজ করেন যাতে মানুষকে ইমপ্রেস করা যায়, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এজন্য এমন সব কথা বলেন, যাতে তিনি আরও ভাইরাল ও পরিচিত হয়ে যান। এটা খুবই বাজে একটা প্র্যাকটিস।


[4] 

এখন জালসা অনেকটা মেলা কেন্দ্রীক হয়েছে। মূলত জালসার নামে বিশাল আকারের মেলা বসানো বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন। এবং এই মেলায় আমার মনে হয় বাজার ও অনৈসলামিক কাজই বেশি হয়। উঠতি বয়সী ছেলে- মেয়ে, তরুণ, কিশোর গ্যাংদের মারামারি-ঝগড়া খুবই কমন ব্যাপার যে কোনো জালসায়। আপনি এমন একটা জালসা পাবেন না, যেখানে কিশোর গ্যাং ঝগড়া করবে না এবং সেই জালসা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ হবে। জলসাগুলো তার আগের সেই ইসলামিক জৌলুস হারিয়ে গেছে।  জলসা বা ওয়াজের যে একটা ইসলামিক ভাইব থাকতো, এইটা আর দেখা যায় না।


[5] 

অনেকেই বলবেন, জালসা তো হচ্ছে, মানুষ তো কিছু ভালো কথা শুনছে; এটা ঠিক আছে। কিন্তু জালসা বা ওয়াজ মাহফিলের যে মূল স্পিরিট, তা হারিয়ে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে। আমার মতে, জলসা ওয়াজ-মাহফিল মসজিদকেন্দ্রিক করে দেওয়া উচিত। দশটা গ্রাম মিলে একটাই জালসা হবে – এই ধরনের একটা সীমাবদ্ধতা আনা উচিত। এবং ওয়াজ মাহফিলে পরিচিত ওয়াজকারী বা বক্তা ডাকার চেয়ে যারা জ্ঞানী, গুণী ও বিজ্ঞ আলেম তাদেরই ডাকা উচিত। অবশ্যই স্থানীয় আলেম ওলামাদের পরামর্শে আলেম বা ওয়াজকারী নির্ধারণ করা উচিত। এবং জালসাতে অবশ্যই ভাইরাল, পরিচিত মুখ, কৌতুক করে এমন ওয়াজের, আলতু ফালতু কথা বলে এমন ওয়াজের ও বক্তা, এদেরকে এভোয়েড করা উচিত।


ব্যক্তি না সমাজ?
















[এক]

আধুনিক সময়ে মানুষ ব্যক্তি স্বাধীনতায় খুবই গোঁড়া ভাবে বিশ্বাস করে। এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে ধর্ম দ্রোহিতার মতোই দেখে। পশ্চিমা লিবারাল দেশগুলোতে এটার চর্চা হয় প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ সম্মতিতে। এ কারণে আপনি দেখবেন পশ্চিমা দেশে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে আবার নেই বললেই চলে। সেই সব দেশগুলোতে সমাজ  ও পরিবারের অস্তিত্ব আছে কিন্তু কার্যকর ভূমিকা নেই। কারণ 'ব্যক্তি' ওই সব দেশের সমস্ত গুরুত্বের কেন্দ্রীয় অবস্থানে । এইটাকে উদারনৈতিক দার্শনিকতাই ইন্ডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতা  বলে। কেননা এই লেবারাল দেশগুলোতে ব্যক্তির স্বাধীন মত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ব্যক্তি এখানে স্বৈরাতান্ত্রিক মনোভাবে বড় হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে শেখে এবং এই মনোভাব সেই ছোট থেকেই নিয়ে বড় হয়। দেখেন আমাদের দেশগুলোতে এই ব্যক্তি স্বাধীনতা ঝামেলা তৈরি করলেও, পশ্চিমা দেশগুলোতে রুল অফ ল ও ব্যাক্তি স্বাধীনতার যে চর্চা, এইটা মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়। ফলে এইসব রাষ্ট্র ও সমাজ এবং পারিবারিক পরিবেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা নেগেটিভ বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনা। দেখেন আরো মজার বিষয় হচ্ছে এই ইন্ডিভিজুআলিজম বা ব্যক্তি স্বাধীনতা বা ব্যাক্তি স্বতন্ত্রীকতা এইটা মূলত আসলে কোন সর্বজনীন বা ইউনিভার্সেল মূল্যবোধ না। মূলত শহরকেন্দ্রিক একটা মূল্যবোধ এবং যা শহরের মানুষের মন মানসিকতাকেই রিফলেক্ট করে। গ্রামে এই মূল্যবোধের চর্চা সেইভাবে দেখা যায় না ও গ্রামে এই মূল্যবোধকে মেইন্টেন করতে গেলে আপনি দেখবেন এইটার জন্য গ্রামে একটা অস্থিরতা তৈরি হয় এবং  গ্রামে একটা একটা হ্যাজারডাস সিচুয়েশন তৈরি করে। কারণ এই যে ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতার যে দর্শন, এই দর্শন মূলত পশ্চিমাদের থেকে এসেছে এবং পশ্চিমারা শহরকেন্দ্রিক অথবা শহুরে মেন্টালিটি লালন করে। 

এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোতে আপনি দেখবেন ধর্মের বন্ধন বা সামাজিক প্রথা ও ঐতিহ্যের পুনর পুনর ভাঙ্গন।  সামাজিক প্রথা ও ঐতিহ্যের বন্ধনের অবস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এই সময়ে এবং এইটা বাড়বে বলে আমার মনে হয় না। পশ্চিমা সোসাইটি গুলোতে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এবং এইসব সোসাইটির যারা ধর্ম মেইনটেইন করে কিংবা প্রথা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয় তারাও মূলত এই বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে  মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং বাধ্য থাকে। 

[দুই]

আফ্রো-এশিয়ান ভ্যালুজে ব্যক্তির চেয়ে পরিবার ও সমাজের গুরুত্বটা অধিক। ফলে পরিবার ও সমাজের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আমরা লক্ষ্য করি এখানে ব্যক্তির বিপরীতে। এখানে ব্যক্তি ডমিনেট হয় পরিবার ও সমাজ দ্বারা। পশ্চিমা দেশের মতে এইখানে ব্যক্তি রিপ্রেস হয় পরিবার ও সমাজ দ্বারা।  সেটা করা হয় ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সংরক্ষণের নামে। বাট এই একবিংশ শতাব্দীতে আইসা তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য প্রবাহের যে একটা ব্যাপক আগ্রাসী মনোভাব, যেইটার মূল থিমটা আমরা গ্লোবালাইগেশন বা বিশ্বায়ন  নামে পরিচিত করাতে পারি, এর প্রভাবে এই সব দেশের সমাজ এখন পশ্চিমা সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচারের  সাথে একটা এসেমিলেট ঘটছে। ফলে কালচারাল একটা অসিলেসন দেখা যাচ্ছে এসব রক্ষণশীল সোসাইটিতে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে কিছু গ্রহণ করছে এবং নিজেদের যে ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি রয়েছে ঐখান থেকে তাদের কিছু সংস্কৃতি তারা লালন করছে না, ফলে ওই সংস্কৃতিগুলা হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু কনজারভেটিভ এশিয়ান ভ্যালুজ রক্ষাকারী যারা তারা এইটাকে পশ্চিমা পলিটিক্যাল ও সামাজিক ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ হিসাবেই দেখছে। কিন্তু মোটা দাগে আমরা বলতে পারি লিবারেলিজম উদারনৈতিক ও আরো যত পশ্চিমা ধারণা  ও দর্শন এইগুলার একটা পরোক্ষ প্রভাব ও অনুপ্রবেশ এই এশিয়ান রক্ষণশীল সমাজগুলোতে তরুণ যুবক শ্রেণির চিন্তা ও মনোজগতের সাথে মিশে একপ্রকার মিক্সড কালচার তৈরি করছে। এইযে মিক্সড কালচার, এই মিক্সড কালচারের সবচেয়ে প্রভাবশালী যে ধারণা সেইটা হচ্ছে ব্যাক্তি স্বাধীনতা।  এই ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে এই  আফ্রো-এশিয়ান  ভ্যালুজের সাথে এই মিক্সড কালচারের একটা ফাটাফাটি  দ্বন্দ্ব চলে। এই দ্বন্দ্ব টাই মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তি স্বাধীনতাই বিশ্বাসী অংশটার ডমিনেটেড বা জয়জয় কর এই সোসাইটি গুলোতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । কারণ আফ্রো-এশিয়ান কান্ট্রি গুলার শাসক শ্রেণী, শিক্ষিত ও ভার্সিটি যাওয়া যে শ্রেণীটা রয়েছে, এ শ্রেণীটা মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একটা শ্রেণি এবং এরাই ওই রক্ষণশীল আফ্রো-এশিয়ান সমাজ ও দেশ গুলোকে পরিচালনা করছে। ফলে এই শাসক ও শিক্ষিত প্রগতিশীল শ্রেণি এই মিক্সড কালচারের নামে মূলত পশ্চিমা ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতা ও স্বাধীনতার অনেক সংস্কৃতি ও ভ্যালুজকেই আফ্রো-এশিয়ান ভ্যালুজের সাথে  মুখোমুখি দ্বন্দ্বে দাঁড় করায় দিয়েছে। 

[তিন]

ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জয়জয়কার ও প্রভাব সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে এখন প্রতিনিয়ত অস্তিত্বহীনতার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে এই ব্যক্তি স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে তারা মূলত সামাজিক মূল্যবোধকে দোষ দেওয়ার আগে ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রথম ও চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছে। ফলে এই এই যে দুই সংস্কৃতির একটা দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্বটা মূলত আফ্রো-এশিয়ান ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পশ্চিমা মানবতাবাদী হিউম্যানিজন দর্শনের  দ্বন্দ্ব। 

দ্বন্দ্বটা এতদূর গড়াইছে যে ধর্মকে অস্বীকার করার মত প্রবণতাও তৈরি হয়েছে এবং যারা ব্যক্তি স্বতন্ত্রী চিন্তাবিদ ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এরাও ধর্মের প্রতি একটা বিরূপ মনোভাব নিয়ে বড় হচ্ছে। তবে বুঝতে হবে, এই যে যতটা না ধর্মকে অস্বীকার  করার প্রচেষ্টা বা মিথ্যা প্রমাণ করার মানসিকতা তার চাইতে বেশি ব্যক্তির স্বৈরতান্ত্রিক ইচ্চা/আকাঙ্ক্ষা বহিঃপ্রকাশের প্রবনতাটাই বেশি। 

এটার ফলে যেটা ঘটছে,  তৃতীয় বিশ্ব বা বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল-রক্ষণশীল সামাজিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের মনো সামাজিক ও মনো কাঠামোগত ভিত্তিতে  অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে ওইসব সোসাইটি গুলোতে একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান বিরাজ করছে। এই সোশ্যাল কনফ্লিক্ট বা সামাজিক দ্বন্দ্বটা মূলত সামাজিক মূল্যবোধের পক্ষের লোক ও ব্যক্তি স্বতন্ত্রী বা ব্যক্তি স্বাধীনতার উপভোগ করতে চাওয়া মিক্সড কালচারকে প্রতিনিধিত্বকারী  পক্ষের মধ্যে বিরাজ করছে। আমরা এই দ্বন্দ্ব টাতে অস্তিত্বের প্রশ্ন  নিয়ে আসতে পারি। এই যে সমাজের সামষ্টিক মূল্যবোধের প্রাসঙ্গিকতা ও ব্যক্তির স্বাধীন সত্তাকে আরো স্বাধীন করার যে ব্যক্তি প্রচেষ্টা, এই দুই পক্ষের একটা অস্তিত্বের সংকট। আবার আমরা এই পক্ষগুলোকে বলতে পারি ব্যক্তির সাথে সমাজের সংগ্রাম। যেইখানে ব্যক্তি সমাজকে ডিঙিয়ে যেতে চাই। সমাজের ডিসিপ্লিন, কন্ট্রোল ও ডমিনেটে কে অস্বীকার করে নিজস্ব একটা গন্ডি তৈরি করতে চাই। আর এই একবিংশ শতাব্দীতে ব্যক্তির সমাজকে অস্বীকার করে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বা অস্তিত্বের চরম শিখরের পৌঁছে যাবার যে লড়াই, এই লড়াইয়ে ব্যক্তি অভাবনীয়ভাবে সমাজকে ডমিনেটে করবে বলে আমার মনে হয়।

ফ্যাসিবাদ, নিষিদ্ধকরণ ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার: সরল বিশ্লেষণ








 [এক]

এই উত্তর আধুনিক ও লিবারেল যুগে এসে কোনো রাজনৈতিক দলকে  নিষিদ্ধ করা ইতিবাচক কার্যকর হবে না। কারণ কিছু নিষিদ্ধ করা মানে মানুষের মধ্যে সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, এবং মানুষ তখন সেই বিষয় নিয়ে নিজস্ব তথ্য ও গল্প তৈরি করে। তথ্যের ফ্যাক্টরি এখন মানুষের হাতে সে নিজেই তথ্যের উৎপাদক , অর্থাৎ যে কেউ নিজেই তথ্য তৈরি ও বিতরণ করতে পারে, সেটা মিথ্যা, গুজব, নিকৃষ্ট বা অবৈধ হলেও। আওয়ামী লীগের মতো দল এসব ক্ষেত্রে আরও দক্ষ। এই যুগে এসে জনবান্ধব স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট নীতিতে বিশ্বাসী দলগুলোর বিরুদ্ধে এই পদ্ধতি কার্যকর হবে না, আমার মতে। কারণ এই দলগুলোর একটা হিউজ পরিমাণ জন-সাপোর্ট রয়েছে অর্থাৎ  জনগণ এদেরকে সাপোর্ট করে এবং এই জনগণ জেনে বুঝেই সাপোর্ট করে, এই জনগণ জানে তাদের ভালবাসার দল ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী ও জুলুমবাজ। 

কারণ মানুষ যেকোনো নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি পার্ভার্টেডলি আকর্ষণ অনুভব করে। আপনি চাইলেও মানুষের এই মনস্তত্ত্বকে বাইপাস করতে পারবেন না। মানুষ অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, এবং নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে—হয় আজ, না হলে কাল। এটি মানুষের স্বভাব, এবং ইতিহাসও তাই বলে। বাংলার ইতিহাসে স্বাধীনতার আগে ও পরে আওয়ামী লীগের ইতিহাস জানলে, তাদের নেতা-কর্মীদের মাঠে সবসময় শক্তি প্রদর্শনে এগিয়ে থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করবেন। সুতরাং, আওয়ামী লীগের মতো দল নিষিদ্ধ হলে তারা আরও সক্রিয় হবে না এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই আওয়ামী লীগের মতো দলকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে, তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত করতে হবে।


[দুই]

রাজনীতিতে নিষিদ্ধ বলে কিছু নেই। রাজনীতিই মূলত উত্তর আধুনিক যুগের আবিষ্কার, তাই এই উদারনৈতিক রাজনীতির যুগে আপনি কোনো দলকে নিষিদ্ধ করে মানুষের চোখের আড়ালে রাখতে পারবেন না। এর প্রমাণ শিবির ও জামাত। তারা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ফিরে এসেছে, এবং তাদের ফিরে আসা ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। মানুষ এটিকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে। কারণ এই যুগে মানুষ নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বাছবিচার করে না। বরং মানুষ তার মনের সন্তুষ্টির পেছনে ছুটে, এবং এই সাইকোলজিক্যাল সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। আওয়ামী ছাত্রলীগের মতো দলের আনুগত্যশীল সমর্থকরা এই সাইকোলজিক্যাল সন্তুষ্টি পায় আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, এবং এই বাস্তবতাকে আপনি ট্যাকল করবেন কীভাবে?

বর্তমানে ইউরোপে দেখা যাচ্ছে, নিউ নাজি ও ফার রাইট ভাবধারার অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা নতুন নতুন রাজনৈতিক দল খুলে সেই হিটলারিও আদর্শকে নতুনভাবে ইউরোপে প্রচলন ঘটাচ্ছে। তারা হিটলারের ভাবাদর্শের নতুন প্রজন্ম হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পলিটিক্যালি রিকনশাইল করছে এবং রাজনীতিতে সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। অথচ তারা ৪০-৫০ বছর ধরে নিষিদ্ধ ছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগ যে ফিরে আসবে না এইটা আপনি নিশ্চয়তা দিতে পারেন না? দেখেন আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক এইটা এত কনসার্ন বা ভয়ংকর বিষয় না, ভয়ংকর বিষয় হলো ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ আবারো ফিরে আসা।


[তিন]

নিষিদ্ধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আমাদের ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে আসতে হবে। যে দল বা গ্রুপ অন্যায় করেছে, যারা ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল, তাদের বিচার করতে হবে। যারা অন্যায়ের জন্য দায়ী, তাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তাই কোনো স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিস্টিক ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গের বিচার না কইরাই দলকে নিষিদ্ধ করা বোকামি হবে। ওই দলের যেসব সদস্য অন্যায়ের সাথে জড়িত, তাদেরকে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে হবে, কিন্তু পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, আপনি শেখ মুজিবকে আলাদা করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগ মুজিবের নামেই রাজনীতি করবে, এবং মানুষ তাদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবেই। শেখ মুজিবের অবদান ও গুরুত্ব আপনি কখনোই বাংলাদেশ থেকে মুছে দিতে পারবেন না। সুতরাং, একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা অসম্ভব। এবং রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার যে রাজনীতি সেইটা আসলে কোন নীতি না, এইটা হল জনগণকে সাময়িক একটা সুখ দেওয়া।

রাজনীতি, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক: ক্ষমতার লোভ ও বুদ্ধিজীবিতার সংজ্ঞা

 মানুষের জীবনকে সুন্দর করার জন্য রাজনীতি, রাজনীতিকে সুন্দর করার জন্য মানুষের জীবন না। 

নাগরিকের জন্যই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য নাগরিক না। 

রাষ্ট্রের ক্ষমতায় কিভাবে যাওয়া যায়, এই নিয়ে চিন্তা করা  বুদ্ধিজীবিতা না, এইটা মূলত রাজনৈতিক চিন্তা।  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্বৈরাতান্ত্রিক না হতে দেয়াই বুদ্ধিজীবিতা।

রাজনৈতিক দল মাত্রই ক্ষমতা লোভী, ক্ষমতার বাইরে রাজনৈতিক দলের কোন স্বার্থ থাকে না। 

একটা দেশের পুরো নাগরিক ও সুশীল সমাজ যখন ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে ব্যস্ত তখন ওই সমাজ সহি পথে নাই, এইটা দেশের জনগণ যত দ্রুত বুঝতে পারবে ততই ভাল।

এ্যাবসল্যুট ফেটিসিজম!

 

পৃথিবীতে সবচেয়ে অপকারী/ফিতনাকারক/ফ্যাসাদ তৈরিকার হচ্ছে বিনোদন কর্মী, অ্যাথলেট ও বিভিন্ন খেলার বিখ্যাত সব  খেলোয়াড়রা। 

একে তো এদের দিয়ে কোন দৃশ্যমান অবকাঠামোগত  বা কোন উপকারই হয় না, সমাজে ও সোসাইটিতে এবং  রাস্ট্রের। অপরপক্ষে পৃথিবীতে এদের মত বিতর্কও কেউ তৈরি করে না।

এরা রোমান এম্পায়ার এর গ্লাডিয়েটরদের মত,  এদের কাছ থেকে শুধু বিনোদন নিতে হবে, জ্ঞান/দর্শন নয়। 

এরা হচ্ছে এযুগের বাইজিঁ ও নর্তকী, একেতো এরা এলিট শ্রেণীর বিনোদন যোগানদাতা।কালের পরিক্রমায়  সব শ্রেণী পেশার মানুষকে এখন এরা বিনোদন দিতে চাই। 

এরা নিজেরা যেমন জনগণের দাস, জনগণকেও তেমন এরা নিজেদের দাস বানাতে চাই। 

এ্যাবসল্যুট ফেটিসিজম!!

অধিকার, ইতিহাস ও আধিপত্যবাদ: মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ এবং আমাদের সবার ইতিহাস

 


















[এক]

আপনি একটা বাদ/মতবাদ/চিন্তাধারা/চেতনাই  বিশ্বাস ও লালন করবেন এবং এই চেতনা সবাইকে বিশ্বাস করার জন্য তাগিদ দেবেন। যদি আপনার হাতে ক্ষমতা থাকে, তাহলে জোর করে চাপিয়ে দিবেন অথবা আপনার হাতে ক্ষমতা না থাকলে আপনি গোসসা করে বলবেন কেন তোরা এই চিন্তা লালন করবি না? এইটাকে বলে সাম্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা।

পলিটিক্যাল দৃষ্টিতে, এটি "সাম্রাজ্যবাদ" (imperialism) বা "আধিপত্যবাদ" (hegemonism) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটি তখন ঘটে যখন একটি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র নিজেদের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ধারণা বা বিশ্বাসকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি সাধারণত সামাজিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে এবং মানুষের ভিন্ন চিন্তাধারার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে, যতই তারা নির্দোষ ও নিষ্পাপ নির্যাতিত হয়ে আসুক না কেন।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি "এককত্ববাদ" (monism) বা "একক সত্যের তত্ত্ব" (theory of singular truth) হিসেবে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একমাত্র একটি সত্য বা ধারণাবা ইতিহাসই সঠিক এবং বৈধ, যা অন্য সব বিশ্বাস ও মতামতকে খারিজ করে। এই তত্ত্ব  মতে ইতিহাসের একটা সরলিকরণ করা হয়, ইতিহাসকে একক সত্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, ওই মাপকাঠির বাইরে যে কোন ইতিহাসকে বাতিল বলে গণ্য করা হয়। 

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের চিন্তাধারা "সামাজিক আধিপত্য" (social hegemony) বা "সংস্কৃতিক আধিপত্য" (cultural hegemony) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই ধারণা উক্ত সমাজের একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণী তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়, ফলে অন্য গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য সৃষ্টি হয়।


[দুই]

দেখেন, আমার ওপরের এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের মতো পত্রপত্রিকা কিংবা আমাদের যারা এতদিনের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান তৈরি করে আসছে, তাদের যে চেতনা, তাদের তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের যে ঐতিহাসিক বয়ান, সেটা তারা আমাদেরকে গিলতে বলেছে কোন রূপ যৌক্তিকতা ছাড়াই, কোনরূপ বাছ-বিচার ছাড়াই, ঐতিহাসিক কোন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াই। দেখেন, ইতিহাস সব সময় লেখা হয় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, এই ইতিহাসকে ক্ষমতাসীন যেকোনো সরকার, দলভুক্ত সংস্কৃতিমনা এবং সুশীল সমাজের গণ্যমান্য সদস্যরা তাদের বয়ানে লিখেছে। এবং তারা এই বয়ানকে গত ৫০ বছর ধরে শিক্ষার্থী ও বাংলার সব শ্রেণীর পেশার মানুষকে, যারা নতুন প্রজন্ম, তাদেরকে পড়তে হয়েছে এবং এই ইতিহাসকে বিশ্বাস করতে হয়েছে এবং ইতিহাসের বাইরে কোন চিন্তাকে স্থান দেওয়া হয়নি, কোন ভিন্ন মত গ্রহণ করা হয়নি। এবং কোন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা আঙ্গিক ইতিহাসকে বাতিল করে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, আপনি তাদের যে হেজেমনিক/আধিপত্যবাদী মানসিকতা আমরা এটা দেখে আসছি গত পঞ্চাশ বছরের যে কোন সরকারের আমলে। 

দেখেন, বাংলার ইতিহাস এই ৫০ বছরের ইতিহাস নয়, বাংলার ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস। এই বেঙ্গল বদ্বীপ যত দিনের, এই বাঙালির ইতিহাস তত দিনের। আমরাই তো বলি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। এই হাজার বছরের বাঙালি পরিচয়কে অগ্রাহ্য করা হয়েছে ও অবহেলা করা হয়েছে গত পঞ্চাশ বছরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে। এবং আমাকে আপনাকে এমনভাবে বলা হয়েছে যেন আমি ও আপনি এই ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে আমার পূর্বপুরুষ ও  বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও অভ্যুদয় ঘটেছে। হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে কি কোন নায়ক মহানায়ক ছিল না? সামাজিকতা ছিল না? আমাদের সংগ্রামমুখর জীবনের কোন ইতিহাস কি ছিল না? এইরূপ কি কোনো ইতিহাস ছিল না? তাহলে কেন আমাদের এই গত ৫০ বছরের ইতিহাসকে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে, সেই হাজার বছরের ইতিহাসকে ভুলে থাকতে বা ইতিহাসের প্রতি উদাসীন হতে শেখানো হচ্ছে?


[তিন]

এই যে গত ৫০ বছরের মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ, সেখানে কেন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও সংগ্রামময়  ইতিহাস কে  এক পাশে রেখে বাংলাদেশের অভ্যুদয় যে ১৯৭১-ই হয়েছে, এই বিষয়টা তারা বার বার মনে করিয়ে দেয়? এবং ইতিহাসকে কেন আমাদের সবাইকে  বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে?

১৯৭১-কে আমরা বলতে পারি প্রত্যক্ষ কোন বৈদেশিক  শোষক ও নির্যাতকের বিরুদ্ধে আমাদের শেষ মহাসাগ্রাম। এই মহা সংগ্রাম আমাদের বিদেশি হায়েনা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার সংগ্রাম। এই সংগ্রাম আমাদেরকে একটা ভূখণ্ড, আলাদা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সংগ্রামে কারো তার কৃতিত্ব নাই, আরো একার অধিকার নাই, এই দেশ যতদিন থাকবে, ১৯৭১ ততদিন থাকবে। ১৯৭১ আমার আপনার সবার। ১৯৭১ সালের বয়ানে কোন একক কৃতিত্ব দাবি করবে এবং ওই দাবির পেছনে একটা আলাদা বয়ান তৈয়ার করবে এবং করেছে এরা যেমন আধিপত্যবাদী ঠিক তেমনি ১৯৭১-কে যারা বাতিল বলে গণ্য করবে, এরাও ইতিহাসকে নিজেদের বয়ানে তৈরি করতে চাই এবং  এরাও ওই আধিপত্যবাদী মহাশক্তিধর স্বৈরশাসকদের মতোই সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী । ১৯৭১ আমাদের মুক্তির মহা সংগ্রাম। 


[চার]

এই দেশ আমার-আপনার-সবার। এই দেশের মাটি, মানুষ ও ইতিহাসে সবার সমান স্টেক রয়েছে। এই দেশের ইতিহাসের প্রত্যেকটি ঘটনা, সংগ্রাম ও দাসত্বের ইতিহাস এবং গৌরবের অর্জন আমাদের সবার ইতিহাস। এই ইতিহাসে কারো একার নয়। এই ইতিহাস কারো একার বয়ানে তৈরি হবে না। এই ইতিহাস লেখা হবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সবার বিশ্বাস ও সম্মিলিত ধারণায়। আপনি এক গোষ্ঠীকে মহানায়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীকে আপনি নির্লিপ্ত ও অগ্রাহ্য করবেন আমার  তৈয়ারকৃত ঐতিহাসিক ন্যারেটিভে, সেই ঐতিহাসিক ন্যারেটিভকে সাধারণ জনতা প্রত্যাখ্যান করবে।

"মৃত্যু চেতনার মৃত্যু-০২"


১.

আমি মানুষের মৃত্যুর ভয়  নাই বা এখন আর দেখা যায় না এই নিয়ে নিয়ে একটা লিখা লিখেছিলাম কিছু দিন আগে, বলেছিলাম আগেও মানুষ যেখানে মৃত্যুকে নিয়ে প্রচুর অস্বস্তিতে থাকত এবং আশঙ্কাজনক ও ভয়ের সাথে মৃত্যুকে স্মরণ করত। এখন মানুষের মধ্যে মৃত্যুর প্রতি একধরনের অস্পষ্ট শূন্যতা কাজ করে, তবে আগের মতো গভীর শঙ্কা বা আতঙ্ক তারা আর অনুভব করে না। যেন মৃত্যুকে এড়িয়ে যেতে চায়, অথবা এমনভাবে গ্রহণ করে, যেন এটি কেবল জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি—একটি অনিবার্য অথচ অবহেলিত সত্য। মৃত্যু মানুষের কাছে হচ্ছে,  হয়তো সবাই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছে কিবা দুইদিন পরেই আবার ফেরত আসবে। মৃত্যু যেন স্বজনের বিদেশ গমন এর মত। কোন না কোন সময় হয়তো ফেরত আসবে, মৃত্যুকে আমরা এমন ভাবেই দেখছি। তাইতো মৃত্যু স্বাভাবিক, মৃত্যুর পর আবারো ফিরে আসা যায়, মৃত্যু আমার হবে না অন্য কারো হবে, আমি মরবো না এই ধারনা আমাদের মনে চলে আসছে। এই যে মৃত্যু নিয়ে মানুষের উদাসীনতা, অবহেলা ও অবচেতন মনে মৃত্যুকে সচেতন ভাবেও চিন্তা না করা, এটা কেন হল?

আমার এই লেখার মূল প্রশ্ন হচ্ছে আমরা মৃত্যুকে কেন এভাবে ভাবতে শিখলাম? আমরা মৃত্যুর ভাবনায় কেন স্বাভাবিকতা নিয়ে আসলাম? মৃত্যুকে আমরা কেন ভয় পাই না?

মৃত্যু কি এতই সোজা? মৃত্যু কি এতই সস্তা? মৃত্যু কি দুই দিনেরই প্রস্থান?

প্রশ্ন স্পষ্ট হলেও, এর কোন চূড়ান্ত উত্তর আমরা খুঁজে পাই না।


২. 

মানুষের মৃত্যুর প্রতি উদাসীনতা এবং এ বিষয়ে ভীতি হারানোর পেছনে কয়েকটি কারণ বিদ্যমান, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত আধুনিক যুদ্ধ ও প্রযুক্তির উন্নতি এবং ব্যাপক তথ্য প্রবাহ।  অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে যুদ্ধের প্রভাব ছিল সীমাবদ্ধ, এবং মৃত্যুর অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের কাছে বিরল ছিল। সৈন্যদের সম্মুখ যুদ্ধ, যেখানে তীর-ধনুক বা বল্লম ব্যবহার হতো, সমাজের বাইরের অংশকে সরাসরি প্রভাবিত করত না। মৃত্যুর খবর ধীরে ছড়াত, ফলে মৃত্যু ছিল এক গভীর, দুর্লভ এবং বেদনাদায়ক ঘটনা। জীবনের প্রতি মানুষের মূল্যবোধ ছিল গভীর, কারণ মৃত্যু তখন এতটা পরিচিত বা সহজ হয়ে ওঠেনি।

অষ্টাদশ শতাব্দীর পর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ যেমন নিজের জীবনকে সহজ করতে বিভিন্ন যন্ত্র ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে, তেমন যুদ্ধে ব্যবহৃত মারাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর ফলে যুদ্ধগুলো আরও বিধ্বংসী এবং মানুষের মৃত্যু আরও ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। যেমন, ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আফগানিস্তানে, ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় লাখ লাখ  আফগান নাগরিক মারা গেছে, যা দেখায় যে যুদ্ধ কিভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।  

আধুনিক যুদ্ধে বন্দুক, রাইফেল, কামান, ট্যাংক, মিসাইল, এবং পারমাণবিক বোমার মতো ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে সক্ষম।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যু ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে পৌঁছেছিল, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৩%। এই মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের সামনে মৃত্যুর গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

যুদ্ধ এখন আর সীমিত নেই, বরং এর বিধ্বংসী প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, মৃত্যু যেন হয়ে উঠেছে এক নিষ্ঠুর স্বাভাবিকতা। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এই গণহত্যার খবরগুলি প্রতিদিন আমাদের কানে পৌঁছায়, এবং এভাবে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আস্তে আস্তে এই অমানবিকতার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছি, যেন মৃত্যুর এই ভয়াবহতা আমাদের জন্য আর নতুন কিছু নয়।

ফলে যুদ্ধের খবরে মৃত্যুর খবরও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শুনছে, এবং মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে এসব মৃত্যু আমাদের কাছে প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের মতো মৃত্যু আর অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না, কারণ প্রতিদিনই আমরা নতুন নতুন মৃত্যুর খবর পাচ্ছি।


৩. 

গত দেড় শতাব্দী ধরে পৃথিবী অনেকগুলো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়া যুদ্ধ এবং ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ এবং

 ফিলিস্তিন যুদ্ধ। এই যুদ্ধগুলোতে মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছে কোটি কোটি মানুষ। বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পরবর্তী শতাব্দীতে সংঘাতের ধারাবাহিকতায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী অস্ত্র, যেমন রাইফেল, ট্যাংক এবং পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধের সময় নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের খবর এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে, ফলে এই মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, মৃত্যু আমাদের মনে আর কোনো ভয় সৃষ্টি করে না।

যদিও আমরা যুদ্ধের খবর দেখার সময় শিহরণ অনুভব করি, কিন্তু এর ভয়াবহতা ও মানবিকতা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রিয়জনের মৃত্যুও আমাদের কাছে আর অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক মনে হয় না, বরং এটি একটি পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ, যেখানে মৃত্যুকে আমরা যেন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি।


৪.

আমরা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে মৃত্যুর খবর এমনভাবে পাচ্ছি যেখানে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিটি মৃত্যুর খবর আমাদের কানে এসে পৌঁছাচ্ছে, এবং এর ফলে আমাদের মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। যুদ্ধের এই অমানবিকতার তথ্যগুলো আমাদের কাছে যেন এক প্রকার অগ্রাহ্য করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই অমানবিক তথ্যগুলা সচেতনভাবে এসব ঘটনা ভুলে থাকতে চাই, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

মৃত্যুর খবরগুলো আমাদের মধ্যে এমন এক ধরনের বিকৃতি তৈরি করছে যে, আমি আর কোনো মৃত্যুকে শোকের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে চাই না। বরং, আমি এই অমানবিক তথ্য যে আমাকে বিতৃষ্ণ করে তুলছে এই  পরিস্থিতি থেকে মুক্তির চেষ্টা করছি, যেন মৃত্যু আর আমাকে দুঃখিত না করে। এর ফলে, মৃত্যুর খবরগুলো আমার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এবং আমি নিজের বিতৃষ্ণ অভিজ্ঞতা ও দুঃখকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী নই।

এই প্রেক্ষাপটে, ব্যক্তিগত জীবনে এবং সমাজে আমাদের প্রিয়জনদের, এমনকি কাছের মানুষদের মৃত্যুও স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। মৃত্যুর এই মিছিল আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, ঠিক যেমন যুদ্ধের মৃতদেহের অবস্থা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। ফলে, প্রতিটি মৃত্যিই যেন এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে, যার মধ্যে আর শোকের অনুভূতি নেই। আমরা শোক করতে ভুলে গেছি এবং মৃত্যুকে গুরুত্ব দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। মৃত্যুকে এখন সস্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। এই নিঃসংকচতা, উদাসীনতা এবং অবহেলা একসাথে আমাদের মনে মৃত্যুকে একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেন এটি আমাদের জীবনের অংশ। 

ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রিয়জনের মৃত্যুও আমাদের কাছে আর অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক মনে হয় না, বরং এটি একটি পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ, যেখানে মৃত্যুকে আমরা যেন একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি। 

এই ধারাবাহিক মৃত্যুর খবর ও তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের মনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, আমরা নিজের আশেপাশের মানুষের মৃত্যু বা এমনকি প্রিয়জনের মৃত্যুতেও আগের মতো শোকগ্রস্ত হই না। মৃত্যুকে আমরা যেন একধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি, যা আমাদের অনুভূতিকে ক্রমশই নিঃসঙ্গ ও অসাড় করে তুলছে। এই উদাসীনতা আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ। এর ফলেই আমাদের মনে মৃত্যুর ভয় আর কাজ করে না।

মৃত্যু চেতনার মৃত্যু-০১



মানুষ মৃত্যুকে এখন খুবই স্বাভাবিক মনে করে। মানুষ মরতে চায় না এবং কারো মৃত্যুতে আর মানুষের মধ্যে ভয়, ভীতি কিংবা আশঙ্কাও জাগে না। ছোটবেলায় দেখতাম, এলাকায় কেউ মারা গেলে গোটা গ্রামে যেন এক প্রতিবেশী বিদায়ের শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ত। শোকাহত হতো গোটা গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষের মধ্যে হারানোর বেদনা, দুঃখ ও শোক স্পষ্টভাবে বোঝা যেত। প্রত্যেকটি বাড়িতে এক কিংবা দুই দিন এই শোকের আবহ বিরাজ করত। দেখা যেত, মৃত পরিবারের জন্য প্রতিটি বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হতো। সেই দিনগুলো, সেই সহানুভূতি ও আন্তরিকতার অনুভূতি আমরা মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি।

গ্রামে এখন কেউ মারা গেলে  প্রত্যেকেই তার আপন আপন কাজে ব্যস্ত থাকতে শুরু করেছে, পাশের বাসার যে কেউ মারা গেছে বা গ্রামের  কেউ একজন মারা গেছে এইটা নিয়ে  কেউ আর ভাবে না। ইভেন পাশের বাড়িতে  হাসাহাসি ও বিভিন্ন দৈনন্দিন কর্মকান্ড স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে । মৃত পরিবারের শোককে কেউ আর নিজের শোক বলে মনে করে না। আগে যখন গ্রামের একটি বাড়িতে মৃত্যু ঘটতো, তখন শেষ প্রান্তের অন্য বাড়িও সেই মৃত্যুর শোক অনুধাবন করতো অথবা গোটা গ্রামে এক গুমোট অবস্থা বিরাজ করত। কিন্তু এখন, সেই দুঃখের অনুভূতি আর মানুষের মনে জাগে না।

আচ্ছা, এরকম কেন হয়? আমরা কি আমাদের ভেতরের পারস্পরিক সহানুভূতি, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা হারিয়ে ফেলেছি? আমাদের মধ্যে কি আগের মতো প্রতিবেশী সুলভ আন্তরিকতা নেই? নাকি মানুষের মধ্যে মৃত্যু ভয় কমে গেছে? যে কারণে আগে গ্রামের সবাইকে মৃত্যুর ভয়ে শোকগ্রস্ত করে তুলত?

সাধারণত, আমার গ্রামের কেউ মারা গেলে জানাজায় অংশগ্রহণের একটা মানসিকতা আমার মধ্যে আছে। জানাযায় গিয়ে কবরস্থানে আমি পারতপক্ষে একাকী থাকার চেষ্টা।  জানাজায় অংশগ্রহণের সময়, আমি বিভিন্ন মানুষের এক্সপ্রেশন ও তাদের কবরস্থানের কর্মকাণ্ড দেখার চেষ্টা করি। আমি লক্ষ্য করেছি, জানাজায় মানুষ এখন মৃত ব্যক্তির ভালো-মন্দ কাজের কথা বলে না, মৃত্যুর গল্প আলোচনা করে না, মৃত্যু আসবে এই বিষয় নিয়েও আলাপ হয় না। দশ বছর আগেও কবরস্থানে মৃত্যু নিয়ে আলোচনা হত; কবরের বিষয়, মৃত্যুর পর কি হবে—এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হতো। এবং এই আলোচনা করতে করতে আমি প্রত্যেকের মুখে মৃত্যুর ভয় স্পষ্ট রূপে দেখতে পাইতাম। কিন্তু এখন অধিকাংশ মানুষ কবরস্থানের দেয়াল, কবরস্থানে কতটুকু মাটি আছে, কত টাকা দান করল, কবরস্থানের উন্নয়ন এবং তদারকি নিয়ে আলোচনা করে। এমনকি, মানুষ এখন রাজনীতি ও রাজনৈতিক আলাপ নিয়েও কবরস্থানে কথা বলে। আহা! মৃত্যুর ভয়, তোমাকে মানুষ করেছে জয়। 

মানুষ মৃত্যুকে স্মরণ করতে চাই না, অথবা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে মৃত্যুকে দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মানুষ এই জগতে সারা জীবনই সুখে শান্তিতে স্বাচ্ছন্দে থাকতে চাচ্ছে। । আমার জানতে ইচ্ছা করে, মানুষ কেন মৃত্যুকে ভয় পায় না? আমাদের এই আধুনিক সময়ে, যেখানে ভৌত ও অর্থের উপরে সবকিছু নির্মিত, মৃত্যু এখন আসলেই অবহেলা ও উদাসীনতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আল্ট্রা সেক্যুলার ও আধিপত্যবাদী কালচার ইন্ডাস্ট্রি

  















[এক]

আমরা আমাদের চিন্তার সহজীকরণের বা সরলীকরণের মাধ্যমে সমাজকে বৈচিত্র্যহীনভাবে বিচার করি এবং দেখতে  চাই। কিন্তু সমাজ বৈচিত্র্য ভালোবাসে, ভিন্নতাকে স্থান দেয়, ভিন্নতার মধ্য দিয়েই সমাজ চলতে থাকে। সমাজে ভিন্নতা না থাকলে, এই ভিন্নতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া না থাকলে সমাজের অস্তিত্ব থাকত না। যে সমাজে বৈচিত্র্য নেই, সেই সমাজ আসলে নেই। বৈচিত্র্যহীন ও বৈষম্যহীন সমাজ ইউটোপিয়ান চিন্তা, যার কোনও বাস্তব ইতিহাস নেই। বৈচিত্র্যই সমাজের প্রাণ। এই বৈচিত্র্যই সমাজকে সমালোচনামূলক ও সংগ্রামময় করে তোলে। সমাজকে ক্রিটিকাল করে তোলে। এই ক্রিটিকাল সমাজের মধ্যেই এক শ্রেণি অন্য শ্রেণির সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজ এগিয়ে চলে। সমাজের চিরায়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে কখনোই বৈষম্যহীন সমাজের দেখা পাওয়া যায়নি। সুতরাং যারা বলে, কোনো তন্ত্র বা কোনো এক ব্যক্তির ফিলোসফি দিয়ে সমাজকে বৈষম্যহীন সাম্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, তারা হয় একজন বড় মাপের ধোঁকাবাজ অথবা ইউটোপিয়ান চিন্তায় বিভোর।


[দুই]

শহরে সেকুলার আধুনিক চিন্তাবিদদের ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলার চিন্তা ততটা খারাপ মনে হয় না যদি না তা আল্ট্রা সেকুলার হয়ে ওঠে। আল্ট্রা সেকুলার বলতে বুঝি চরম গোঁড়া বা মৌলবাদী সেকুলার। এরা যেকোনো সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর মতোই ভিন্ন মতকে অস্বীকার করার মত ভয়ংকর প্রতিক্রিয়াশীল । এই আল্ট্রা সেকুলাররা সমাজকে তাদের চোখে দেখতে চায়, তাদের মত দেখতে চায়, সমাজ যেন তাদের মতো হয় না হলে সে সমাজ  টিকবে না—এমনটাই তারা বিশ্বাস করে। তারা মনে করে, সমাজকে একমাত্র তারাই রক্ষা করতে পারে এবং তাদের চিন্তাই সবচেয়ে উদার। এর বাইরে কোনো উদার চিন্তা নেই, তাদের এই বাইনারি চিন্তা মারাত্মক। এই চিন্তার বাইরে তারা কোনো ভিন্ন মত বা পার্থক্যকে স্থান দিতে চায় না। সুতরাং, এই চিন্তা  বা এই বাইনারি চিন্তা জঙ্গি মৌলবাদী চিন্তা ছাড়া আর কি হতে পারে?


[তিন]

আরো মজার বিষয় হচ্ছে এই যে, এই বাইনারি চিন্তা কিংবা আল্ট্রা সেকুলার চিন্তা আপনি শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে প্রবলভাবে দেখতে পাবেন। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং এই আল্ট্রা সেকুলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ক্ষমতাবান এবং ক্ষমতা প্রয়োগেও এরা ব্যাপক আধিপত্যের অধিকারী । ফলে তারা তাদের আল্ট্রা সেকুলার এবং বাইনারি চিন্তাভাবনা সমাজের  সর্বশ্রেণীর ওপর  চাপিয়ে দেয়। তারা একটি কালচারাল হেজেমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করে এবং নিজেদেরকে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি বা সংস্কৃতির কারখানা হিসেবে দেখে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে গ্রামীণ মানুষের সরল এবং ধার্মিক প্রবৃত্তি সবসময়ই তাদের দ্বারা অস্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশে যে সরল এবং ধার্মিক শ্রেণী রয়েছে, তারা উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, অথবা মধ্যবিত্ত যেই শ্রেণীরই হোক না কেন, তারা এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদীদের দ্বারা নিরন্তর বুলির শিকার হয়ে আসছে। দেখেন এই আল্ট্র সেকুলার চিন্তাভাবনা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বা শ্রেণী গত সাংস্কৃতিক চিন্তা। কিন্তু আপনি অপরপক্ষে যে ধর্মীয় বা কনজারভেটিভ যে গোষ্ঠীটা আছে এই গোষ্ঠী মূলত সর্বশ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যমান, এবং এই ধর্মীয় কনজারভেটিভ সরল গোষ্ঠীরা মধ্যবিত্ত আলট্রা সেকুলার গোষ্ঠী দ্বারা চরমভাবে নিপীড়িত এবং বলির শিকার হয়ে আসছে আবহমান কাল থেকে। 


[চার]

মধ্যবিত্ত আল্ট্রা সেকুলার গোষ্ঠীর দ্বারা যে ধার্মিক ও সরল গোষ্ঠীটি সবসময় বুলির শিকার হয়েছে, এখন সেই পরিস্থিতি বুমেরাং হতে চলেছে। কারণ, বর্তমানে এই ধার্মিক ও সরল গোষ্ঠী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীতে আত্মীকরণ ঘটিয়েছে, এবং এর ফলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কিছু অংশও তারা নিজেদের হাতে এনে ফেলেছে। এই আত্মীকরণের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কালচারাল হেজেমনিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সাথে তাদের একটি বিরাট সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব চলছে। দিন দিন এই কালচারাল গ্যাঞ্জাম আরও বাড়বে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এই কালচারাল গ্যাঞ্জামের প্রবণতা আরও তীব্র হবে। মধ্যবিত্ত আল্ট্রা সেকুলার গোষ্ঠী ধার্মিক শ্রেণিকে প্রাচীনপন্থী বলতেও দ্বিধাবোধ করে না, কিন্তু এই ধার্মিক শ্রেণির উত্থান বাংলাদেশে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আল্ট্রা সেকুলারদের কালচারাল আধিপত্যের জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বৈরশাসন পরবর্তী বাংলাদেশে এই দুই শ্রেণির বিরোধ আরও তীব্র হবে বলে আমি মনে করি।

ব্যক্তির সামাজিক অস্তিত্ব ও সমাজে ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা: ০২

 














[এক]

(প্রাসঙ্গিকতার ধারণা ও প্রজন্মের ফাঁক)

সমাজের প্রাসঙ্গিকতা কীভাবে একজন ব্যক্তির অস্তিত্বের মূল চেতনা হয়ে উঠতে পারে এবং কীভাবে তা জাগ্রত হবে, তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। বর্তমান সমাজে প্রজন্মের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। এর এক প্রান্তে আছেন মুরব্বিরা, যারা গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে চান না। অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা, এবং চাহিদাকে তারা সঠিকভাবে স্বীকৃতি দিতে পারছেন না বা তাদের বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে, নতুন প্রজন্ম তাদের মধ্যে একটি প্যারালাল সিস্টেম গড়ে তুলেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব।

সোশ্যাল মিডিয়া—যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব—এবং টিভি নাটক ও সিরিয়াল নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নতুন ভাষা ও চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরি করেছে, যা পুরনো প্রজন্মের থেকে ভিন্ন। এই নতুন সাংস্কৃতিক প্রকাশকে আমরা মিম বা অন্য কোন নামে ডাকতে পারি।


[দুই] 

(সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)

একজন ব্যক্তির সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার ধারণাকে বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। এখানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হলো:

       (ক) ইমেল দুর্খেইমের সামাজিক সংহতি(social solidarity theory) তত্ত্ব:

ইমেল দুর্খেইম তার সোশ্যাল সলিডারিটি তত্ত্বে দুই প্রকারের সংহতির কথা উল্লেখ করেছেন—মেকানিক্যাল সলিডারিটি এবং অর্গানিক সলিডারিটি। মেকানিক্যাল সলিডারিটি সমাজের ঐতিহ্য, প্রথা এবং চিরাচরিত মূল্যবোধকে ধরে রাখতে গুরুত্ব দেয়, যেখানে একজন ব্যক্তি এসব মান্য করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, অর্গানিক সলিডারিটিতে ব্যক্তি তার বৈচিত্র্যময় ও বিশেষ দক্ষতার মাধ্যমে সমাজে ভূমিকা রাখে এবং সমাজ তাকে স্বীকৃতি দেয়। দুর্খেইম সমাজকে একটি জীবন্ত অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি একেকটি অংশ হিসেবে কাজ করে। সামাজিক ভূমিকা ও সংহতি বজায় রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজে নিজের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

      (খ) ম্যাক্স ওয়েবারের সামাজিক কর্ম (social action theory)তত্ত্ব:

ম্যাক্স ওয়েবারের সোশ্যাল অ্যাকশন তত্ত্বে ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করে তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর। একজন ব্যক্তি তখনই সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যখন তার কর্মকাণ্ড সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের দ্বারা গ্রহণযোগ্য হয়। এই কর্মকাণ্ড হতে পারে আবেগিক, নৈতিক বা পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে। সমাজের জন্য কাজ করলে এবং মানুষ তার কাজকে মেনে নিলে সেই ব্যক্তি সমাজে প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে।

      (গ) জর্জ সিমেলের দ্য স্ট্রেঞ্জার(stranger theory) তত্ত্ব:

জর্জ সিমেলের তত্ত্বে ব্যক্তি সমাজের অংশ হলেও তার ব্যক্তিত্বের কারণে আলাদা হয়ে ওঠে। সিমেল এটাকে "দ্য স্ট্রেঞ্জার" বলে অভিহিত করেন, যেখানে ব্যক্তি সমাজে থেকেও ভিন্নতার মাধ্যমে নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তিনি যখন সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ব্যক্তিত্বকে সংযুক্ত করতে পারেন, তখনই তার সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হয়।

        (ঘ) এরিক এরিকসনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস (identity crisis theory)তত্ত্ব:

এরিক এরিকসনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যায়। ব্যক্তি যখন এই সংকটগুলো মোকাবিলা করে এবং সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমিকা রাখে, তখন সে সমাজে নিজের আলাদা আইডেন্টিটি তৈরি করে। এর মাধ্যমে সে সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।


[তিন] 

( ভবিষ্যৎ আলোচনার প্রেক্ষাপট)

সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা কোনো একক ব্যক্তির নির্ধারিত বিষয় নয়; এটি সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবদান এবং তার প্রতি সমাজের স্বীকৃতির সমন্বয়। প্রজন্মের ফাঁক, প্রযুক্তির প্রভাব এবং নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব—সবকিছু মিলে সমাজের কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে, যা আমাদের নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও চেতনায় প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে, সামাজিক সংহতি এবং প্রাসঙ্গিকতার মূল ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ ব্যক্তি তখনই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, যখন সে তার কর্মের মাধ্যমে সমাজের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে।

অতএব, আমাদের উচিত প্রজন্মের এই ফাঁককে বোঝা এবং দুই প্রান্তের মধ্যে সেতু তৈরি করা, যাতে সমাজের সকল সদস্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সে সমাজের কল্যাণে তার ভূমিকা স্বীকৃত ও সম্মানিত হয়। দুই প্রজন্মের এই পার্থক্য কে কিভাবে রিকনশীল করা যায় তা নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে এবং এই এই ভাবনা অবশ্যই দুই প্রজন্মের সম্মতির ভিত্তিতেই হতে হবে না হলে এই পার্থক্য আরো বেড়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আলোচনা ও একে অপরকে বোঝার মানসিকতা।

ব্যক্তির সামাজিক অস্তিত্ব ও সমাজে ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা: ০১














[ এক ]

আপনি সমাজে নিজের অস্তিত্বকে কিভাবে জানান দেবেন? সমাজে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বা রেলেভেন্সি প্রকাশ করবেন কিভাবে? এর জন্য আমাদের  সমাজের প্রয়োজন, বা ব্যক্তির প্রয়োজনে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। যদি আপনি শুধু নিজের কাজই করে যান, শুধু বই পড়েন এবং জ্ঞান অর্জন করেন, তাহলে এসব আপনাকে সমাজে প্রাসঙ্গিক করে তুলবে না। আপনি নিজেকে সমাজের একজন ভাবতে পারবেন না, এবং সমাজকে আপনার ভাবতে পারবেন না। সুতরাং, সমাজের একজন ভাবার জন্য, আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি সমাজের অংশ। এজন্য প্রয়োজন হলো, সমাজের যেকোনো প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই আপনি সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে পারবেন।

সমাজে অস্তিত্বকে বোঝার জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: সমাজের প্রত্যেকে আপনাকে তাদের মনে করবে, এবং আপনিও সমাজকে নিজের মতোই মনে করবেন। সমাজের কোনো প্রয়োজনে আমি এগিয়ে যাব, অর্থাৎ সমাজের অংশ হিসাবে আপনার উপস্থিতি জানান দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এখন এই প্রয়োজনটা কিভাবে বুঝব? এটি খুবই সাধারণ: যেকোনো ব্যক্তির বিপদে আপনাকে সাহায্য করতে হবে, সমাজের প্রয়োজনের প্রতি আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। বিপদে আপনাকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, এবং সমাজের কেউ আপনাকে বিপদে ডাকলে, সেই অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগাতে হবে। যে হ্যাঁ, তাদের বিপদে আপনাকে ডাকলে আপনি তাদের হয়ে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন; এটাই পাশে থাকা বা কোন বিপর্যয়কে আপনার বিপর্যয় হিসেবে ধরে নেওয়া।


[ দুই ]

আমি ওপরের কথাগুলো এজন্যই বললাম, গতকাল থেকে আমি  এমন তিনটা কাজ করেছি যে তিনটে কাজ করার ফলে আমার মনে হয়েছে আমি এই সমাজেরই অংশ। আমি যে এই সমাজের অংশ, এই অনুভূতি আমার মধ্যে এসেছে ওই তিনটা কাজ করার মাধ্যমে । 

আমি যেটা বলছিলাম, আমি গত দিন থেকে মোটামুটি তিনটি সহায়তা সমাজকে দিতে পেরেছি, তখন থেকেই আমার মনে হয়েছে আমি সমাজের অংশ হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করছি। এবং এই তিনটা সহায়তা আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই সিগনিক্যান্টলি আমার মধ্যে সামাজিক চেতনা জাগাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

গতকাল, হাইওয়েতে হোন্ডা চালানোর সময় আমার সামনেই একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ওই হুন্ডাইতে তিনজন ছিলেন, একজন বৃদ্ধও। বৃদ্ধ গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হয়। রাস্তায় আমার হোন্ডা থামিয়ে ওই ব্যক্তিকে পাশের ডাক্তারখানায় আমি সহ আরো আমার  ২-৩ জন সাথী মিলে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে গেলাম এবং ডাক্তারের চিকিৎসার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার দুইজন সাথী সেখানে উপস্থিত থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম।

দেখেন, তখন আমার মনে হচ্ছিল যে হ্যাঁ, আমি সমাজের অংশ হিসেবে নিজের এই সময় বা উপস্থিতি সমাজকে দিচ্ছি, সমাজ আমার এই উপস্থিতি ডিজার্ভ করে। ওই মুহূর্তে সেটা ভালো লাগার চেয়ে আমার ভেতরে যে অনুভূতি বেশি জাগ্রত হচ্ছিল তা হচ্ছে আমার সামাজিক অস্তিত্ব। আমার সামাজিক অস্তিত্বের অনুভূতি আমি অন্তরে ফিল করতে পারছিলাম । মনে হচ্ছিল, আমি সমাজের জন্যই। যেমন আজ রক্ত দেওয়ার সময়ও আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে, আমার রক্ত প্রদান সমাজের জন্যই আমার পক্ষ থেকে সমাজকে নিজের মনে করা ও আমার সামাজিক অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন ।

এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আমাকে সমাজের অন্যতম অংশীদার হিসেবে নিজের চিন্তায় নিয়ে আসতে পেরেছে। নিজেকে সমাজেরই অনুভব করেছি, এই চিন্তাটা আমার আগে কখনোই আসেনি। এই চিন্তা গুলো এসেছে আমার এই কাজগুলা করার পর থেকেই। 

সুতরাং, সমাজের বিপদে এগিয়ে যাওয়া এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া অবশ্যই আপনার সামাজিক অস্তিত্বের জন্য আপনাকে করতে হবে। দেখেন, সমাজ আপনার জন্যই এবং এই সমাজ আপনি তৈরি করেছেন; আপনি যখন আপনারা হয়ে উঠেছেন, তখনই সমাজ। সুতরাং আপনার প্রতিক্রিয়া সমাজের চলমানতা নির্দেশ করে। আপনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাবে আপনার উপকার যখন সমাজ গ্রহণ করবে। যখন আপনি নিজেকে সমাজের জন্য যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত থাকবেন। 


[ তিন ]

আমি একটা বিষয় খেয়াল করেছি, আমাদের উঠতি জেনারেশন ফিজিক্যাল এনগেজের চেয়েও সোশ্যাল মিডিয়ার এঙ্গেজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। হয়তো এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাইবার এঙ্গেজে গুরুত্ব রাখলেও, আমার কাছে মনে হয় সোশ্যাল এঙ্গেজের গুরুত্বটা অনেক বেশি।

এই জেনারেশন ব্যাপকভাবে সামাজিক হয়ে উঠতে পারেনি। তাদের মূল অভাব হচ্ছে পার্টিসিপেশন বা সামাজিক অংশগ্রহণ । এই পার্টিসিপেশনের অভাবটা সমাজ ব্যবস্থায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখেন, সমাজ এই অভাব অনুভব করছে এবং আমরা সামষ্টিগতভাবে অনুভব করছি যে আমাদের নিউ জেনারেশনকে আমরা নিজেদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। নিউ জেনারেশন এখনো সমাজের হয়ে উঠতে পারেনি। 

এই জেনারেশন এখনো আমিতেই আবদ্ধ রয়েছে। তাদের এই আমিত্ব ততদিন থাকবে যতদিন না তারা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারবে। আমাদের মুরুব্বীদেরও কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তারা নিউ জেনারেশনের কর্মকাণ্ডকে, তাদের আধুনিক চিন্তাভাবনা ও চেতনাকে  তেমনভাবে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছেন না; ফলে নতুন জেনারেশন মুরুব্বীদের স্বীকৃতি ছাড়াই যেকোনো কাজ করে ফেলছে এবং মুরুব্বীদের তারা ধার ধারছেন না।

এই মুরুব্বীরাই সমাজকে চালাচ্ছেন। মূলত সমাজের মূল্যবোধ, প্রথা, অনুভূতি, চাহিদা—সমস্ত কিছুই এ মুরুব্বিরা নির্ধারণ করছেন। কিন্তু নিউ জেনারেশন মূলত এইসব থেকে অনেক দূরে। নতুন জেনারেশন দেখছে তাদের চিন্তা অনুভূতি চাহিদা মুরুব্বীরা সেইভাবে ফিলাপ করতে পারছে না। ফলে তারা নিজেদেরকে সমাজের অংশ মনে করছে না। 

আশঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের নিউ জেনারেশন একটি প্যারালাল ব্যবস্থা নিজেদের তরুণদের মধ্যেই  গঠন করে ফেলেছে। এটি আমাদের মুরুব্বীদের গতানুগতিক সমাজের মতো নয়। এই প্যারালাল সোশ্যাল সিস্টেমে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, প্রথা, চিন্তা, অনুভূতি, চেতনা এবং মনুষ্যত্বের ধারণা আমাদের মুরুব্বিদের থেকে ভিন্ন। এবং এই প্যারারাল সোশ্যাল সিস্টেমটা গঠন হয় মূলত সাইবার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। 

এই প্যারালাল ব্যবস্থা মূলত সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি, সিনেমা, নাটক এবং সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে; এবং হাল আমলে টিক টক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া এতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

দেখেন, এই প্যারালাল এবং আমাদের গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যে সংঘর্ষ, সেটা এখনো তেমন ব্যাপক হয়ে ওঠেনি; তবে আমার কাছে মনে হয়, সময়ের সাথে সাথে এটি আরও বৃদ্ধি পাবে। 


[ চার ]

দেখেন, এখন সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে আপনি দেখবেন, ফেইসবুক বা ইউটিউবে বিভিন্ন আলেম-ওলামা ও হুজুরদের নিয়ে আমাদের নিউ জেনারেশন মিম বানাতে দ্বিধাবোধ করে না। এই মিম এখন একটা ইউনিভার্সাল ভাষা প্রকাশ মাধ্যম । যদিও বিষয়টা খুবই মজার, কিন্তু এর ভাষা প্রকাশ খুবই তীব্র। ফোনে একটি ছোট্ট বিষয়কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যাপক অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। আসলে, মিম, ব্যঙ্গাত্মক বা কৌতুক করা হুজুরদের নিয়ে—এটা কিন্তু ১০-১৫ বছর আগেও চিন্তা করা যেত না, এমনকি পাঁচ থেকে সাত বছর আগে ও না। দেখেন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে শুধু যে হুজুরদের নিয়ে মিম বানানো হয় তা কিন্তু না। যেই কোন ঐতিহাসিক সম্মানিত ব্যক্তি, বিখ্যাত ব্যক্তি, সমাজের প্রভাবশালী যে কোন ব্যক্তি এবং বর্তমানে জীবিত খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী  ব্যক্তিদের নিয়েও এই মিম বানানো হয়। মিম হওয়ার হাত থেকে আসলে কেউ রক্ষা পায় না। 

সুতরাং, এই সমাজের প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে  নিয়ে মিম কৌতুক ও ব্যঙ্গ করে হাসি-ঠাট্টা করা—এটা এখন কেন হচ্ছে, আমার কাছে মনে হয় এর অন্যতম কারণ হলো, মূলত এই দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা ব্যাপক গ্যাপ তৈরি হওয়ার কারণে এবং এই দুই জেনারেশন আমাদের মুরুব্বী জেনারেশন এবং নিউ জেনারেশন যাদেরকে জেনজিও বলা হয়। আমাদের নিউ জেনারেশনের প্যারালাল সোশ্যাল সিস্টেম, যেইখানে তাদের নিজস্ব ভাষা প্রকাশ এবং নিজেদের চিন্তা ভাবনার সম্মিলন ঘটেছে, ওইখানে আমরা গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার  ইতিবাচক দিকগুলোর অনুপস্থিতি দেখতে পাই।  

আমাদের মুরুব্বী জেনারেশন যেমন গতানুগতিক সমাজের ইনফ্লুয়েন্সে একটা প্রভাব রাখে, ঠিক তেমনই আমাদের নিউ জেনারেশন মুরুব্বীদের সমাজ ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করে নেট দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব একটা উপস্থিতি বা আধিপত্য তৈরি করেছে। এবং প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার যেকোনো অনিয়ম, যেকোনো অব্যবস্থাপনা বা অসঙ্গতিকে তারা তাদের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।

এই বিষয়ে আরো ব্যাপকভাবে বলা যাবে এবং আমাদের এ নিয়ে এখনো ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ, আমাদের নিউ জেনারেশন এবং মুরুব্বী জেনারেশনের মধ্যে যে পার্থক্য, এই পার্থক্যটা যদি এখনই কমিয়ে আনতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে অথবা ১০ থেকে ১৫ বছর পরেই এই দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো।  এই গ্যাপ কমাতে উভয় প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ ও বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সামাজিক সমন্বয় এবং মূল্যবোধের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

রাজনৈতিক দলগুলার ছাত্র উইং এর স্কুল বিভাগ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের বিপর্যয় নিয়ে আমার কিছু কথা ও মতামত।

 

















রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র উইং-এর মাধ্যমে ১৬-১৭ বছরের কম বয়সী কিশোরদের দলে রিক্রুট করার যে কৌশল, তা আমার কাছে অত্যন্ত নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে মনে হয়। দেখুন, ১৬-১৭ বছরের কিশোরদের একটি স্বতন্ত্র চিন্তা ও বোধ তৈরি হয়। তারা নিজেদের এবং তাদের চারপাশ নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করতে শেখে। এই বয়সটা হচ্ছে আত্মপরিচয়ের বিকাশের সময়, যখন তারা সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবতে শেখে। যদিও এই বয়সে তারা অনেক কিছু বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং চিন্তার পরিপক্বতা এখনো গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা নীতিমালার সঠিক বিশ্লেষণ এ বয়সে সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে, এই বয়সটি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়।

সুতরাং, স্কুলে পড়া কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে রিক্রুট করা একটি চরম অনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য কাজ। যদি এই রিক্রুটমেন্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমারেখার মধ্যে গিয়ে করা হয়, তবে তা নৈতিকতার এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। এটি রাজনৈতিক নীতি ও শুদ্ধাচারের স্পষ্ট বিরোধী। আপনি যদি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তরুণদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও মতাদর্শের দীক্ষা দিতে চান, তা একেবারে যৌক্তিক। যদি তারা স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে যুক্ত হতে চায়, তবে রাজনৈতিক সমাবেশ, আলোচনা বা মত বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করতে পারেন। এতে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু স্কুলের নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ভুল। বিশেষ করে, এই বয়সে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা মানে তাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ধ্বংস করা। রাজনৈতিক প্রভাবিত হলে, তারা আর কোনোদিনই নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক তত্ত্ব ও মতাদর্শের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে না।

আপনি হয়তো বলবেন যে, এই বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া, যেমন নামাজ-রোজার দাওয়াত বা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রচার করা জরুরি। এটি অবশ্যই ঠিক হতে পারে, যদি আপনি নিজেকে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তবে, আপনাকে বুঝতে হবে যে, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতা বিকাশের জন্য অনেক অরাজনৈতিক ইসলামিক ও সামাজিক সংগঠন ইতিমধ্যে কাজ করছে।

সুতরাং, ধর্মীয় আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্য হলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে স্কুলে আপনার সংগঠনের আওতায় এই ধরনের দাওয়াতি কার্যক্রম চালানো মোটেই সমীচীন নয়। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রতীয়মান হবে। যদি আপনার মতো ধর্মীয় রাজনৈতিক দল একবার স্কুলে প্রবেশের সুযোগ পায়, তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও সেখানে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে। এর ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে স্কুলের মতো নিরপেক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।

সুতরাং, রাজনৈতিক নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে, রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের উচিত হবে স্কুল কার্যক্রম বন্ধ করা। যতই সেটি দাওয়াতি বা নৈতিক শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে হোক না কেন, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর প্র্যাকটিস হিসেবে গণ্য হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আমি অনুরোধ করব, প্লিজ, স্কুলের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কিশোরদের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিন। তারা নিজেরাই যথাসময়ে বিচার করবে, কোন রাজনৈতিক দল তাদের জন্য উপযুক্ত। তারপর, তারা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।

সাধারণ মানুষের অসাধারণতা: জীবনকে সরলভাবে বাঁচার শিল্প


 














একজন সাধারণ মানুষ আসলে কী? সাধারণ ব্যাপারটাই বা কী? আর মানুষ কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, "সাধারণ মানুষ" নামক বিশেষায়নটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারণ, সাধারণ মানুষ আসলে অসাধারণ।

একজন সাধারণ মানুষ জানে কীভাবে জীবনকে সরলভাবে নিতে হয়, এ কারণেই সে অসাধারণ। যাদের আমরা প্রতিভাবান বা মেধাবী বলি, তারা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খায়। তাদের প্রতিভা যতটা না তাদের জীবনের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সহায়ক, ততটাই জীবন তাদের জন্য জটিল হয়ে ওঠে। তাই দেখা যায়, অনেক বিখ্যাত মানুষ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী ছিলেন, সাধারণ জীবন পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন।

সাধারণ মানুষ জীবনকে জীবনের মতো করে চালায়। তাদের কাছে জীবনই সবকিছু—চাওয়া, পাওয়া, আশা, আকাঙ্ক্ষা সবকিছুই তারা গুরুত্বসহকারে দেখে। তারা জীবনকে এতটাই মূল্য দেয় যে জীবনের বাইরের বিষয়গুলো তাদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। এজন্যই দেখা যায়, একজন সাধারণ মানুষ কম আয়েও সুখে থাকে, তার পরিবারও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, সে জানে কীভাবে জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ ও মুহূর্তকে জীবনের মতো করে গ্রহণ করতে হয়। এ কারণেই সে সাধারণ হয়েও আসলে অসাধারণ।

এই পৃথিবী সাধারণ মানুষের। পৃথিবীর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় তাদের কেন্দ্র করেই সাজানো। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত অসাধারণ মানুষও সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করতে কাজ করেন। পৃথিবী মূলত অসাধারণদের জন্য নয়, সাধারণদের জন্য। আকাশ, বাতাস, ঝড়, বৃষ্টি, মেঘ, চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র—সবই সাধারণ মানুষের জন্য। বিখ্যাত ব্যক্তিরাও মূলত সাধারণ মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করতেই পৃথিবীকে গড়ে তোলেন।

প্রকৃতির অনুষঙ্গ ও সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন



আকাশে প্রচণ্ড মেঘ। সন্ধ্যার আলো আঁধারে মেঘগুলো যেন আরও কুৎসিত  রূপ ধারণ করেছে। কালো ও ঘন হোক না কেন, আমার তা দেখতে ভালো লাগে। মেঘের একটা বার্তা থাকে—সে হয়তো বৃষ্টি নিয়ে আসবে, বা কোনো ঝড়। দুটোই আমার পছন্দ। মেঘকে আমি আগমনী বার্তা মনে করি। সে আগমন হয়তো বৃষ্টির রূপে, অথবা শুষ্ক শীতল বাতাস হয়ে মনকে ছুঁয়ে যায়। বৃষ্টি আমার খুবই প্রিয়। বৃষ্টির আগমনে আমি অন্তরে এক অতি আনন্দচ্ছল ঝড় অনুভব করি। এ ঝড়কে কেউ থামাতে পারে না, আমিও না।

একটা বাচ্চা যেমন মাকে অনেকক্ষণ পর দেখলে আনন্দে পা ছুঁড়ে নাচে, বৃষ্টির সময় আমার অবস্থাও তেমন হয়। এর কারণ আমি কখনও খুঁজিনি, খুঁজতেও যাইনি। হয়তো বৃষ্টির সাথে আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় আমি কারো কথা মনে করি না—কারো না। আজকের এই  মেঘ আমাকে অনেক  কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি এগুলো আমার খুব প্রিয়, খুব ব্যক্তিগত বিষয়। 

তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছি—বৃষ্টির সময় আমার মন প্রচণ্ড উদ্দীপ্ত হয়। এই উদ্দীপনা মনের অবাধ্যতা এনে দেয়। হয়তো নিজেকে বিশাল কিছু মনে হয়, অথবা পুরো পৃথিবীর সাথে পৃথিবীর খুঁটিনাটি বিষয়কে মনের অভ্যন্তরীণ চিন্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ  করে দেখার একটা আগ্রহ জাগে। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি—সবই প্রকৃতির অনুষঙ্গ । প্রকৃতির এই বিষয়গুলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক অনেক গভীর। মানুষ প্রকৃতির কাছে অবসর তুল্য উপহার পেতে চায়। বৃষ্টির কারণে সেই আগ্রহটা বেড়ে যায়। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি এগুলো মনের এক উদ্দীপনা তৈরি করে।

আজকের সন্ধ্যার এই নিস্তব্ধ বিদ্যুৎ চমকানো, যেটাকে গ্রামের ভাষায় বিজলি পড়া বলে, যেন ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের মতো সেকেন্ডে দুই-তিনবার আলো দিয়ে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে চারপাশ । আকাশ সাদা-কালো মেঘে আচ্ছাদিত। এই আকাশের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা থাকে। আকাশ তো কোন কাঠামো নয়, এরও একটা রঙ, রূপ, আকৃতি আছে। যদিও এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব দেখার মত সুযোগ নেই, আকাশ আসলে একটা রহস্য। যদিও বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের সমাধান করেছেন, তবু আকাশ আমাদের কাছে এক অমীমাংসিত ভাবনায় বেঁচে থাকে।

আকাশ নিয়ে ভাবতে গিয়েই মনে আসে—আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে আকাশ নিয়ে কী ভাবি? সাধারণ মানুষরা ছোট ছোট বিষয়গুলোকে অনেক বড় করে দেখতে চায়। আকাশ, সূর্য, গ্রহ-তারা—এই সবই সাধারণ মানুষের কাছে খুব কাছের বিষয়। কেননা এগুলোই তাদের জীবনের অংশ। যেমন মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি আমার কাছে খুব প্রিয় মনে হয়, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের কাছেও এগুলো খুব কাছের মতই।

আচ্ছা, বৃষ্টি, ঝড়, মেঘ, আকাশ, সূর্য, গ্রহ—এগুলোর বিশেষত্ব কী? সাধারণ মানুষ এগুলোকে জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। জীবনে অন্তর্ভুক্ত  ভালোবাসা, ঘৃণা, আগ্রহ-অনাগ্রহ, চাঁদ-সূর্য যেন মানুষের মনের ভাষাহয়ে এই বিষয়গুলোকে  আরও গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারে। তাইতো এই প্রকৃতির প্রতিটি বিষয় আমাদের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আমার চিন্তার মাঝখানে সাব্বির সাহেব কল দিয়েছেন। সাব্বির একজন আত্মবিশ্বাসী ছেলে, যার নিজের প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস। সে মনে করে, বড় কিছু করবে এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু দেবে। কিন্তু বড় হওয়া আসলে কী, সেটা সে হয়তো জানে না। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই, আমরা হয়তো তাকে বোঝাইনি, বড় পদ মানে শুধুই সম্মান কিবা বিখ্যাত হওয়া  নয়; বড় পদের আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে এ বিষয়গুলো তাকে বোঝাতে হবে আমাদের সমাজের সবাইকে । সাব্বিরদের মতো ছেলেদের আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা, প্রত্যাশা আমরা কি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি?

বাইরে একটা বাচ্চা খেলা করছে, হয়তো তার দাদি বা নানির সাথে। তার নিখুঁত হাসি একদিন হয়তো এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। পৃথিবী তাকে কুটিলতা, জটিলতা , দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা দিয়ে বেঁধে ফেলবে, আর ধীরে ধীরে তার হাসি ম্লান হয়ে যাবে। পৃথিবী কি আমাদের জন্য বাধা? নাকি পৃথিবী নিজেই আমাদের জন্য বাধা  করে?নাকি আমরাও পৃথিবীর জন্য বাধা?  পৃথিবীতে মানুষের গুরুত্ব আসলে কী? মানুষের কাছে পৃথিবীর গুরুত্বটাই বা কী?

একজন সাধারণ মানুষ আসলে কী? সাধারণ ব্যাপারটাই কী? আর মানুষ বা কী? আমি যদি এর উত্তর খুঁজতে যাই, হয়তো এই সাধারণ মানুষের সংজ্ঞা আমার কাছে যেমন একরকম মনে হবে। তেমনি প্রত্যেকটা মানুষের কাছে আলাদা আলাদা ভাবে এই বিশেষায়নটা আলাদা রকম হবে। কারণ, সাধারণ মানুষ আসলে অসাধারণ। একজন সাধারণ মানুষ জানে কীভাবে জীবনটাকে সরলভাবে নিতে হয়; এ কারণেই তো সে অসাধারণ। অসাধারণ মানুষরা, যাদেরকে আমরা মেধাবী বা প্রতিভাবান হিসেবে দেখি, তারা কিন্তু জীবনে সাধারণ চাহিদাগুলো মেটাতেও হিমশিম সাধারণ মানুষদের চেয়েও সাধারণ । তাদের প্রতিভা যতটা না তাদের জীবনের আশা প্রত্যাশা কিবা জীবনের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে তাদের জন্য সহায়ক, ততটাই জীবন তাদের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী ছিলেন। এই সাধারণ জীবনকেও তারা পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ ও ব্যর্থতায় পর্যবশত হয়েছেন। 

সাধারণ মানুষ জীবনকে জীবনের মতো চালায়। তাদের কাছে জীবনই সবকিছু—জীবনের চাওয়া, পাওয়া, আশা, আকাঙ্ক্ষা এসব তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে। তারা জীবনকে এতটাই গুরুত্ব দেয় যে জীবনের বাইরে অন্যান্য বিষয়কে সেকেন্ডারি  ভাবে। এজন্যই আমরা দেখি, একজন সাধারণ মানুষ কম আয়েও সুখে জীবনযাপন করে, এবং তার পরিবারও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, সে জানে কীভাবে জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ ও জীবনের প্রত্যেকটা সময় মুহূর্তকে  জীবনের মতো করে পরিচালনা করতে হয়। এ কারণে সে সাধারণ হয়েও, আসলে অসাধারণ।

এই পৃথিবী সাধারণ মানুষের। পৃথিবীর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণ মানুষদের কেন্দ্র করে সাজানো। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত অসাধারণ মানুষও সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করতে কাজ করেন। পৃথিবী মূলত অসাধারণদের জন্য নয়, সাধারণদের জন্য। পৃথিবীর আকাশ, বাতাস, ঝড়, বৃষ্টি, মেঘ, চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, তারা এবং অন্যান্য সবকিছুই সাধারণ মানুষদের জন্যই সজ্জিত।  বিখ্যাত মানুষেরাও সাধারণ মানুষদের জন্যই পৃথিবীকে গড়ে তোলেন।

ক্ষমতা ও রাজনীতি: গ্রামীণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব










[এক]

আমাদের সমাজে ব্যক্তি বিশেষ থেকে শুরু করে সমষ্টিগত পর্যায়ে সবাই রাজনীতি এবং রাজনীতির আলাপ নিয়ে সচেতন কিবা রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী , কিন্তু তারা নিজেরা সরাসরি রাজনীতি করে না বা রাজনীতিতে যুক্ত হতে পছন্দ করে না। যারা রাজনীতি করে, তাদেরকে অনেকে মন থেকে  থেকে ঘৃণা করে এবং মনে করে যে রাজনীতির সাথে জড়িতরা দুর্নীতিগ্রস্ত, অথবা তারা দুর্নীতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না। এর ফলে, সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে খুব একটা রাজনৈতিক বলে মনে করে না। তবে, তারা রাজনীতির গল্প শুনতে এবং এর খবরাখবর রাখতে ভালোবাসে। রাজনীতির প্রতি তাদের প্রচণ্ড আগ্রহের মূল জায়গা হলো ক্ষমতার কাঠামো এবং ক্ষমতার আশেপাশে যারা আছে তাদের নিয়ে আলোচনা ও গালগল্প করা।

[দুই]

পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমতার প্রতি মানুষের এক ধরনের মোহ সবসময় ছিল। এই মোহ থেকেই কিছু মানুষ নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আরোহন করতে চাইত, এবং এ থেকে তারা ক্ষমতাশালী হয়ে একধরনের মানসিক শান্তি পেত। অন্যদিকে, আরেক দল মানুষ ক্ষমতার প্রতি লোভী ছিল না, কিন্তু ক্ষমতাকে নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্থিরতা বা অবসেশন কাজ করত। এই সরলীকরণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্রতি তাদের মনোভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারি।

বর্তমানে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বিভিন্ন মাধ্যমে রাজনীতির খবর পেয়ে যায়। তারা টেলিভিশনে দেখে, বা আজকাল প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন থাকায় ইউটিউবে প্রচুর রাজনীতির খবর জানতে পারে। এমনকি আমাদের মা-খালারা পর্যন্ত ইউটিউবের কল্যাণে নানা রাজনৈতিক খবর ও বিশ্লেষণ জানেন। মজার ব্যাপার হলো, জনপ্রিয় ইউটিউবারদের মধ্যে যেমন পিনাকী, ইলিয়াস, জাহেদ, নিঝুম সাহেব, কিংবা কিছু চিহ্নিত আওয়ামী লীগ সমর্থক ইউটিউবাররাও সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়। যদিও মানুষ সবসময় এদের কথাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, তবুও তাদের কথাগুলো সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে।

কিন্তু কেন এমন হয়? এ প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ।

[তিন]

আমার মতে, কারণটি হলো, প্রচলিত টেলিভিশন চ্যানেল, মিডিয়া বা সরকারি প্রচারণা মেশিন সবসময় একই ধরনের কথা বারবার বলে, যা সাধারণ মানুষের কাছে একঘেয়ে এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন মনে হয়। ফলে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবরা যখন বিরোধী বা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয় যে কেউ তাদেরই মতো মানুষদের কথা তুলে ধরছে। এর ফলে, তাদের কথাগুলো মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলে, কারণ তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে। ফলে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবরা যখন বিরোধী বা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির কথা বলেন, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে, হ্যাঁ, কেউ যেন তাদের চায়ের আড্ডায় বসে রাজনীতির খুঁটিনাটি তুলে ধরছে। 

এখানে লক্ষণীয় যে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবদের চেয়ে  দক্ষ সমাজ ও রাজনৈতিক  বিশ্লেষক রয়েছেন, যারা রাজনীতির জটিল দিকগুলোও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, কিন্তু তবুও তাদের ভিউ বা জনপ্রিয়তার মাত্রা পিনাকী সাহেবদের তুলনায় অনেক কম। এর অন্যতম কারণ হলো, পিনাকী সাহেবরা সাধারণ মানুষের চায়ের টং বা গ্রামের আড্ডায় পৌঁছে গেছেন। তারা এমন ভাষায় কথা বলেন, যা একজন কৃষিজীবী, চাষি বা শ্রমিকও সহজেই বুঝতে পারেন।

পিনাকী সাহেবরা রাজনীতির "ক-খ" খুবই সাধারণ ও সহজভাবে উপস্থাপন করেন, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিল রেখে সাজানো হয়। এই সাধারণ ভাষায় কথা বলার ক্ষমতাই তাদের বক্তব্যকে মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। গ্রামের মানুষজন, যদিও রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন নন, তবুও রাজনীতির খবর জানার প্রবল আগ্রহ তাদের রয়েছে। তারা রাজনীতির সরাসরি অংশ হতে বা ক্ষমতায় আগ্রহী না হলেও, রাজনীতি নিয়ে তাদের ব্যাপক কৌতূহল কাজ করে। এটা দেখা যায় যে, রাজনীতির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি, তবে তারা নিজেরা সেই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চান না, বরং রাজনীতির খবর ও বিশ্লেষণ শুনতেই বেশি আগ্রহী।

[চার]

গ্রামের সাধারণ মানুষ মুজিব আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের আমল পর্যন্ত রাজনীতির ইতিহাস এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী সম্পর্কে সবসময়ই সচেতন থেকেছে। আগের দিনে রেডিও ছিল তাদের জন্য প্রধান তথ্যের উৎস। যারা পত্রিকা পড়তে পারত, তারা সেখান থেকে রাজনীতির খবরাখবর নিত।

সত্তরের দশকে রেডিও ছিল গণমানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তথ্যের প্ল্যাটফর্ম, আর বর্তমানে সেই ভূমিকা পালন করছে ইউটিউব এবং ফেসবুক। রেডিও, ইউটিউব, ফেসবুক, এবং টেলিভিশন মাধ্যমে আপনি লক্ষ্য করবেন, রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ অত্যন্ত গভীর। তবে তাদের এই আগ্রহ ক্ষমতার পালাবদল বা ক্ষমতার আসা-যাওয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ক্ষমতায় কারা এলো, কারা গেল, এবং ক্ষমতায় কারা আছে—এই ধরনের খবরে তাদের অধিকাংশেরই আগ্রহ জন্মে, যা মূলত রাজনীতির প্রতি তাদের গভীর আকর্ষণের ফল।

আমার মনে হয়, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সাধারণ মানুষের রাজনীতি সম্পর্কে যে প্রবল আগ্রহ, তা যথাযথভাবে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়া মূলত শিক্ষিত, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভাষায় কথা বলে। ফলে, এসব প্রচারমাধ্যম গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আগ্রহ এবং চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, ইউটিউব এবং ফেসবুকের পিনাকী কিংবা ইলিয়াস সাহেবদের মতো ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির গল্প তুলে ধরে এই চাহিদা সফলভাবে পূরণ করতে পেরেছেন। তারা যেভাবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করে, তা সেই মানুষের চায়ের টং পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।  

পিনাকী এবং ইলিয়াস সাহেবরা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন, যা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও বোধগম্য মনে হয়। ষাট-সত্তরের দশকে রেডিও যেমন সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক খবর পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, এখন ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সাররা একই ভূমিকা পালন করছে, গণমানুষের জন্য রাজনৈতিক তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে।

[পাঁচ]

প্রত্যেকটি গ্রামে আপনি দেখতে পাবেন যে, মাত্র এক বা দুই, তিনটা পরিবার রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে, এবং সেই পরিবারগুলোর মধ্য থেকেই মেম্বার বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় বা গ্রামের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোকে এরাই নিয়ন্ত্রিত করে । ফলে এই পরিবার গুলা গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক অনাগ্রহকে ব্যাপকভাবে ইউজ করে এবং অ্যাবিইউজও করে। 

মজার বিষয় হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষ কিন্তু ওই পরিবার সমূহের রাজনৈতিক অপতৎপরতা এবং দুর্নীতির কথা তারা জানে কিন্তু তারা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করে না এর অন্যতম কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনীতি করার প্রতি অনাগ্রহ এবং অসচেতনতা।   রাজনৈতিক খবরে তাদের আগ্রহ প্রচণ্ড।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষ, যেমন—চাচা, চাচি, কৃষক, চাষি, এবং গ্রামের মোড়ল, সবাই ইউটিউবে এসব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখতে পান। 

গ্রামের মানুষের রাজনৈতিক মনোভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হলেও তা কার্যকরীভাবে অংশগ্রহণের দিকে ঝোঁকেন না। তাদের মনে ক্ষমতা সম্পর্কিত যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা মূলত নেতিবাচক। তারা ক্ষমতাকে সবসময় দুর্নীতির সাথে যুক্ত করে দেখেন, এবং রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাদের ধারণা হলো—এরা দুর্নীতিবাজ, এবং নিজেদের স্বার্থের জন্য প্রতারণা করতে সক্ষম। ফলে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি তাদের আগ্রহ একরকম খর্বিত হয়ে যায়। তারা কখনোই ভাবেনি যে, ক্ষমতা তাদেরও হতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ক্ষমতাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে।

[ছয়]

গ্রামীণ জীবনে সামাজিক নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহের অভাব লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনের সমস্যাগুলো—যেমন জমি-জমা, পারিবারিক সম্পর্ক—এবং ছোটখাটো সামাজিক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেয়। তাদের পারিবারিক বিষয়কে তারা আপন ভাবে, রাজনীতিকে তার অনেকটা প্রতিবেশীর পারিবারিক ঝামেলার মতো মনে করে এইটা নিয়ে কথা বলতে তারা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, মজা উপায় । চায়ের দোকানে বা ছোট টঙের দোকানে আলোচনাগুলো সাধারণত সমাজের বড় ব্যক্তিদের নিয়ে হলেও, এসব আলোচনা তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে না। 

গ্রামীণ মানুষের ওই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব আসলে খুবই ইন্টারেস্টিং এবং গবেষণার বিষয়। আমরা কিছু কিছু ব্যক্তি মনে করি যে গ্রামীণ মানুষ খুবই সহজ এবং সরল আবার একটা গোষ্ঠী বলে  গ্রামীণ মানুষ খুবই জটিল এবং কঠিন। এই কারণেই দেখবেন বিষয়টি এটা বলেই ভিলেজ পলিটিক্স। কিন্তু গ্রামীণ মানুষ ভিলেজ পলিটিক্স যে খুবই সরল এবং টানাটাকে বলা যায় গ্রামের সচ্ছল অংশেরই পলিটিক্স এইটা বলা যায়। 

তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য শহরের মানুষকে গ্রামীন মানুষের  দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে। শহরের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গ্রামীণ মানুষকে বিচার করলে তা ভুল ধারণা । এজন্য, গ্রামীণ বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের মূল্যবোধকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

[সাত]

গ্রামীণ সমাজকে সরলভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক মনোভাব একটি জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনাগ্রহী। ক্ষমতার প্রতি তাদের ধারণা সাধারণত নেতিবাচক, যা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে, গ্রামীণ সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা অনেকাংশে সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ সমাজের এই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করা ও তাদের মূল্যবোধ বোঝার জন্য গবেষণা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যা সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোকে উন্নত করার পথ প্রশস্ত করবে।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...