এর নানা কারণ থাকলেও সংক্ষেপে বললে, মূল সমস্যা হলো আধুনিক নাটক ও সিনেমা বিদেশি ধাঁচকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছে। ফলে বাংলা সমাজের নিজস্ব মৌলিকতা ও স্বকীয়তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাটক শিল্প, যা এক সময় আমাদের গর্ব ছিল, তা আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি। আবার আধুনিক দর্শক শ্রোতার বিকৃত রুচিও এর কারণ। ১০-১২ বছর আগেও হুমায়ূন আহমেদ, হানিফ সংকেতের মতো নির্মাতারা অসাধারণ নাটক বানাতেন, যেগুলো আমাদেরকে আবেগিকভাবে নাড়া দিত এবং সেগুলোকে আমরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে, যে ধরনের নাটক ও সিনেমা তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে না আছে কোনো শৈল্পিক গুণ, না আছে কোনো আলাদা আকর্ষণ। গত ১০ বছরে তৈরি হওয়া নাটক ও সিনেমাগুলো দেখলে মনে হবে, প্রতিটির স্ক্রিপ্ট, কাহিনী এবং প্লট একই রকম। এগুলোর মধ্যে কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি নাটক ও সিনেমার সংলাপগুলোতেও শৈল্পিক মর্যাদার অভাব দেখা যায়। এই নাটকগুলো এখন আর শিল্প বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় যাত্রাপালার মতো। যাত্রাপালারও তো একটা শৈল্পিক মর্যাদা ছিল, কিন্তু বর্তমান নাটক ও সিনেমায় সেই মর্যাদাটুকুও অবশিষ্ট নেই।
নতুন পরিচালকরা বাংলা নাটক ও সিনেমার ঐতিহ্যবাহী ধারাকে ধরে রাখতে পারছেন না। বরং তারা ভারতীয়, পাকিস্তানি বা অন্যান্য বিদেশি সিনেমা ও সিরিজের ছাঁচ অনুসরণ করে সেগুলোর মতোই নির্মাণ করতে চাইছেন। এর ফলে বাংলা নাটক ও সিনেমার স্বকীয়তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে, এবং আমরা আর নতুন কোনো মৌলিক সৃষ্টি করতে পারছি না। এর অন্যতম কারণ হলো, অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা ঠিকভাবে নাটক ও সিনেমা বানাতেই পারছি না। আমাদের পরিচালকদেরও গলদ থাকার ফলে নতুন নাটক ও সিনেমাগুলো শৈল্পিক মর্যাদা পাচ্ছে না। পরিচালকরা সস্তা আয়ের জন্য অতি দ্রুত নাটক ও সিনেমা বানিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু সেই নাটক ও সিনেমাগুলো কুখাদ্য হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। হয়তো নাটকটি প্রচুর ভিউ পাচ্ছে, কিন্তু তার মধ্যে কোনো আলাদা বিশেষত্ব থাকছে না।
এর আরেকটি কারণ হতে পারে আমাদের নতুন দর্শক-শ্রোতা গোষ্ঠী। তারাও বিদেশি নাটক ও সিনেমার দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত। তারা বিদেশি নাটক ও সিনেমার বিশাল বাজেটের মুভি দেখে বাংলার কম বাজেটের মুভি ও নাটককে তাদের কাছে সাধারণ মনে হয়। ফলে তাদের রুচিরও বিকৃতি ঘটেছে। এই বিকৃত রুচির যোগান দিতে গিয়েই পরিচালকরা অখাদ্য ও কুখাদ্য তৈরি করে বাংলার শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলেছেন। একটি নতুন দর্শক শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা মূলত বিনোদনের জন্যই নাটক ও সিনেমা দেখে এবং বিদেশি ছাঁচে তৈরি এসব কন্টেন্ট গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলা নাটক ও সিনেমার গুণগত মান ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
নতুন যুগের নাটক ও সিনেমার জন্য তরুণ নির্মাতাদের প্রয়োজন। তবে শুধু বয়সে তরুণ হলেই চলবে না; তাদের মানসিকভাবে সেই পরিপক্কতা থাকতে হবে, যাতে তারা বাংলার সমাজকে বুঝতে পারে, বাংলার মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মননকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে পারে এবং বাংলার জনগণকে ভালোভাবে রিড করতে পারে। তাহলেই বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নাটক ও সিনেমা তৈরি হবে। এজন্য পেশাদার স্ক্রিপ্ট রাইটারদেরও প্রয়োজন।


.jpeg)
.jpeg)



.jpeg)



.jpeg)

.jpeg)


.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)