রাষ্ট্রের নাগরিক রাষ্ট্রদ্রোহী নয়!

একটা রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর যদি সেই রাষ্ট্রই তার নিজ নাগরিকদের দেশদ্রোহী বা দেশবিরোধী হিসেবে ঘোষণা দিতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রটির ভিতেই কোথাও গুরুতর সমস্যা আছে। যেন শুরু থেকেই সেই রাষ্ট্র একটি মৌলিক ফল্ট নিয়ে তার যাত্রা শুরু করেছে । 
কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এটা স্বাভাবিক হতে পারে না যে, তার নিজের নাগরিক ,যে তার স্বজাতি, স্বভাষা, স্বধর্ম ও স্বসংস্কৃতির মানুষ তাকেই শত্রু বানিয়ে ফেলবে।
তাই  একাত্তরের পক্ষের শক্তি ,  বিপক্ষের শক্তি,  জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি,  জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি এই বিভাজনের রাজনীতি শেষ করতে হবে। 

একটি রাষ্ট্রকে সাসটেন করতে হলে পুরো সমাজকে কোনো না কোনোভাবে ইন্টিগ্রেট করতে হয়। বিভিন্ন দর্শন, মত ও পার্থক্যের মানুষকে আপনাকে ইন্টিগ্রেট করতে হবে। 

আপনি একাত্তরের বিপক্ষের শক্তি কিংবা জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তিকে অপরাধী বলতে পারেন। বলতে পারেন তারা দেশের আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করেছে, এবং সেই অপরাধের জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে। কিন্তু তাদের  দেশবিরোধী বা  দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা সমস্যার সমাধান নয়। আর এই  শত্রু-শত্রু খেলা যাকে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশদ্রোহী ঘোষণা করা, এটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরেই গভীর বিভাজন তৈরি করে। আর একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজ বা  রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। 

কারণ  দেশদ্রোহী বা  দেশবিরোধী এই লেবেল এমন এক জিনিস, যা কখনো শেষ হয় না; বরং ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।  দেখেন আমরা ৫০ বছরেও একাত্তর বিরোধীদেরকে ইন্টিগ্রেট করতে পারেনি , যাকে তাকে ৭১বিরোধী বানায় দিয়েছে,  এই কারণেই  জুলাই হয়েছে।  আবার এই জুলাইয়ের বিরোধীদেরও যদি আপনি ইন্টিগ্রেট না করতে পারেন , আবার কোন বিপ্লব আন্দোলন হবে না তার নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারেন না।  সুতরাং ৭১ বিরোধীদেরকেও আপনাকে সোসাইটিতে  ইন্টিগ্রেট করতে হবে, তেমনি জুলাইয়ের বিরোধীদেরও আপনাকে সোসাইটিতে অ্যাডাপ্ট ইনটিগ্রেট করতে হবে। 

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ,সে তার রাষ্ট্রের বিরোধীদেরও জায়গা দেয়। এমনকি যারা রাষ্ট্রের প্রচলিত দর্শনের বিপরীত চিন্তা করে, তাদেরও সেই রাষ্ট্রের ভেতরে থাকার ও মত প্রকাশের সুযোগ দেয়।

রাষ্ট্রের কাজই হলো বহুমত ,পথ  ও দর্শনের মানুষকে একত্রে রাখা, ইন্টিগ্রেট করা। বাংলাদেশেও শেষ পর্যন্ত সেই কাজটাই করতে হবে, সব মানুষকে একই রাষ্ট্রের ভেতরে জায়গা দিয়ে, একসাথে নিয়ে।

নির্বাচনী সহিংসতা: একটি দেশের পশ্চাৎপদতার আয়না

নির্বাচনী সহিংসতা দরিদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেখুন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে এমনকি সৌদি আরবেও। যেসব দেশে রাজতন্ত্র বা মনার্কি প্রচলিত, সেখানেও সীমাবদ্ধ কিছু নির্বাচন হয়। সুতরাং নির্বাচনী ব্যবস্থা মোটামুটি একটি সাধারণ এবং সর্বজনীন বিষয়। নির্বাচন হয় না এমন কোন রাষ্ট্র আপনি খুবই কমই দেখবেন।  কিন্তু আপনি লক্ষ করবেন যে উন্নত দেশগুলোতে নির্বাচন নিয়ে এত মাতামাতি হয় না এবং জনগণ বিষয়টি নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করে না। অপরদিকে, যত পশ্চাৎপদ, দুর্বল বা অনুন্নত দেশ, সেসব দেশে নির্বাচন নিয়ে তত বেশি মাতামাতি হয় এবং এটা ভয়ংকর রকমের বিপজ্জনক সেই দেশের শান্তি, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির জন্য। এই ধরনের দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচুর সহিংস হয়ে থাকে। আপনি সহজেই বুঝে ফেলবেন যে, যে দেশে যত বেশি নির্বাচনী সহিংসতা, সেই দেশ তত বেশি পশ্চাৎপদ, বর্বর, অসভ্য এবং জনগণও ঠিক সেরকমই।

আমার উপরের কথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এই যে, আপনি আপনার দেশকে বিচার করতে পারবেন আপনার দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী। আপনি যদি দেখেন যে আপনার দেশের সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করছে, এবং তাদের আলোচনায় নির্বাচনী নেতা বা রাজনৈতিক দলের কোনো ইশতেহার, পরিকল্পনা বা নীতি নিয়ে কোনো কথাই নেই শুধুমাত্র কে কেমন নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, নেতা কেমন পোশাক পরেছেন, কেমন কথা বলছেন তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার দেশ সভ্য, শিক্ষিত বা উন্নত দেশ নয়। সুতরাং আপনি আপনার দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দেখেও আপনার দেশকে একটা মানদণ্ডে নিয়ে আসতে পারেন এবং আপনার দেশ উন্নত নাকি অনুন্নত, শিক্ষিত নাকি মূর্খ, সভ্য নাকি বর্বর সেটা বিচার করতে পারেন।

আবার দেখুন, যখন আপনার দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক দলের খুচরা-পাতিনেতাগুলোও একটা মারমুখী অবস্থানে থাকে, উভয় পক্ষই মারমুখী অবস্থানে থাকে, ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, ব্যাপক ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি করে মনে হয় যেন গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তখন আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি একটি পশ্চাৎপদ দেশের নাগরিক। আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। সুতরাং আপনার দেশের সাধারণ জনগণের এই আত্মোপলব্ধিতে আসা উচিত যে আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। আমি বলছি না যে আপনার দেশ কখনোই ভালো হবে না। তবে আপনার দেশ একটি উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে তাকে প্রচুর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমরা সহজেই এই উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে নির্বাচন, নির্বাচনী সহিংসতা কিংবা নির্বাচন ঘিরে অতিরিক্ত মাতামাতি যা সাধারণ মানুষের মন-মস্তিষ্কে আঠার মতো লেগে থাকে ,কখনোই ইতিবাচক কিছু নয়। বরং এটি একটি দেশের জনগণ, সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, শান্তি ও শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যখন শত্রু-শত্রু খেলায় রূপ দেওয়া হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই কোথাও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বুঝতে হবে সামথিং ইজ রঙ উইথ দ্যা প্রসেস অফ ইলেকশন ! আমরা যদি আফ্রিকা বা এশিয়ার অনেক অনুন্নত দেশে তাকাই, দেখি নির্বাচন মানেই সেখানে সহিংসতা, প্রাণহানি, এমনকি গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। এই বাস্তবতা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই নিজেদের নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্বাচনী সহিংসতা আজ একটি প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় , আমরা এখনো পুরোপুরি সভ্য, সহনশীল ও পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পৌঁছাতে পারিনি। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমাজ ও রাজনীতি



সমাজ ও রাজনীতি, সোসাইটি ও পলিটিক্স যে নামেই ডাকি না কেন, সমাজ আসলে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের চাইতেও গভীর কিছু। আমরা যদি মেনে নিই যে একজন মানুষের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হচ্ছে তার রুহ বা আত্মা যদিও তার অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায় না, তবু মানুষ অনুভব করে এবং দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বাস করে এসেছে যে তার সত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার মন, তার আত্মা বা রুহ। ঠিক তেমনভাবেই, সমাজ আমাদের সেই আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাবকে প্রকাশ করে। এক অর্থে, সমাজ হলো আমাদের সম্মিলিত আত্মা, আমাদের collective soul।

কিন্তু রাজনীতি যখন এই সমাজের উপর অতিরিক্ত ও ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখন এই আত্মাগুলোর স্বাভাবিক সম্মিলন ব্যাহত হয়। কারণ রাজনীতি মূলত একটি বাহ্য বিষয় রাজনীতি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বাইরে রাজনীতি খুব কমই দেখা যায়। রাজনীতির প্রায় প্রতিটি আলোচনা, বিতর্ক, সমর্থন কিংবা বিরোধিতা সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে ক্ষমতা। কিন্তু যখন এই ক্ষমতা ও ক্ষমতার রাজনীতি একটি সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তখন সেই সমাজের প্রতিটি আত্মা অবধারিতভাবে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। আর এই কারণেই অতিরিক্ত রাজনীতি একটি সমাজকে আত্মিকভাবে, রোহানিয়াতের দিক থেকে, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

একটা সমাজের মধ্যে সবকিছুই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার মানুষ ব্যক্তি মানুষ এবং সম্মিলিত ব্যক্তি, বা collective individuals। যখন অনেকগুলো individual একসাথে হয়, তখনই সমাজ তৈরি হয়। আবার এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে, সমাজে কোনো আংশিক ব্যক্তি নেই, বরং আছে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি whole individuals। কারণ পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের নিয়েই একটি সমাজ গঠিত হয়।

ব্যক্তি কখনোই একা বাস করতে পারে না, পারবেও না। ইতিহাসে আপনি এমন কোনো উদাহরণ পাবেন না। ইতিহাসের মূল শিক্ষাই হচ্ছে সমাজের অস্তিত্ব এবং সমাজের মধ্যেই মানুষের অস্তিত্ব। ইতিহাস কখনোই সমাজের বাইরে যায়নি; বরং সমাজকেই সে বারবার ভেঙেছে, গড়েছে এবং নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। প্রতিটি সময়, প্রতিটি কাল, প্রতিটি যুগের ব্যক্তি বা বংশের ইতিহাস আসলে তার সমাজের ইতিহাস। সমাজের বাইরে ব্যক্তির কোনো ইতিহাস কখনোই রচিত হয়নি, হবেও না এটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

কিন্তু রাজনীতি হচ্ছে এই সমাজের ইতিহাসের একটি অংশ মাত্র। সমাজ রাজনীতিক ইতিহাসের অংশ নয়; বরং রাজনীতিই সমাজের একটি অংশ। সেইভাবেই ইতিহাস রচিত হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও ইতিহাস ঠিক সেইভাবেই রচিত হতে থাকবে।

সুতরাং মানুষের যে ইতিহাস human history ,সেটা মূলত তার সমাজের ইতিহাস, তার সমাজ ভাঙা-গড়ার ইতিহাস। মানুষের যাত্রা, মানুষের পথচলা, সবকিছুই সমাজের ভেতর দিয়েই সংঘটিত হয়েছে। এই কারণেই একটি সমাজের প্রকৃত আত্মা হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের আত্মার সমিলিত রূপ। সমাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি এর গুরুত্ব কল্পনাতেও পুরোপুরি ধরতে পারবেন না।

কিন্তু আমাদের যারা ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, কিংবা যারা রাষ্ট্র, দেশ বা জাতির ধারণাকে সবার উপরে রাখতে চায়, তাদের কাছে সমাজ ক্রমশ অবহেলার বিষয় হয়ে উঠছে আর এই প্রবণতাটা ভয়ংকর। আপনি সমাজ ভেঙে রাজনীতি গঠন করতে পারেন না, সমাজ ভেঙে কোনো দেশ বা কোনো জাতি গঠন করতে পারেন না। সমাজ সেটা কখনোই মেনে নেবে না। কারণ একটি সমাজ হচ্ছে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সমাজে আপনি রাজনীতি ঢুকাইছেন মানে আপনি ক্ষমতার ক্ষমতা কেন্দ্রিক যে দ্বন্দ্ব এটা কি জারি রাখছেন এবং এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যক্তি খুবই গৌণ হয়ে পড়ে যা সমাজকে তার অস্তিত্বের হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। 

একটি জাতি, একটি দেশ বা একটি রাষ্ট্র কখনোই ব্যক্তিকে গড়ে তোলে না; একটি সমাজই একজন ব্যক্তিকে গড়ে তোলে। সুতরাং সমাজকে গুরুত্বহীন ভেবে রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে গেলে বিষয়টা অনিবার্যভাবেই বিপরীতমুখী ও ভয়াবহ হয়ে উঠবে এবং তা হবেই।

গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশ !

স্ট্রং ইকোনমিক দেশগুলোতে ডেমোক্রেসি সাধারণত ভালোভাবে কাজ করে এবং তুলনামূলকভাবে বেশি ইফেক্টিভ হয়। কিন্তু দুর্বল অর্থনীতি, কম শিক্ষা, এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে ডেমোক্রেসি প্রায়ই ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং ডেমোক্রেসির এই ব্যর্থতা পুরোটাই সেই দেশের জনগণের উপর বর্তায়। যদিও একটি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা তার জনগণের উপরই নির্ভর করে এবং জনগণই নির্ধারণ করে গণতন্ত্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তবুও বাস্তবতা হলো গণতন্ত্রের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশে একটি দেশের জনগণের চিন্তাভাবনা, চেতনা, শিক্ষা এবং সামগ্রিক মানসিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গণতন্ত্র মানুষকে একটি ক্ষণস্থায়ী চেতনা দেয় ,এই অনুভূতি যে সে নিজেই তার নেতা নির্বাচন করতে পারছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা শুরু হয় এই নির্বাচনের পর। নির্বাচিত নেতার চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই তার জনগণের চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈপরীত্য এতটাই গভীর হয় যে নেতা ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী গ্যাপ তৈরি হয় চিন্তার গ্যাপ, চেতনার গ্যাপ এবং উন্নয়নের গ্যাপ। এই গ্যাপ পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রায়ই নিজেদের বঞ্চিত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার বলে মনে করে। এই কারণেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই পুরোপুরি সফল বলা যায় না। এমনকি সবচেয়ে সফল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও জনগণকে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করতে দেখা যায়।  
অর্থাৎ, গণতন্ত্র যেমন কিছু সাফল্য তৈরি করে, তেমনি তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর ও কাঠামোগত ব্যর্থতা।


ঠিক ওপরের এই লেখাটাকেই বা যুক্তিকে আমরা যদি বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে তুলনা করতে যাই তবে আমাদের গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশের যে শিরোনাম এটাকে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারব কেননা বাংলাদেশ একটি অতিরিক্ত জনবহুল দেশ, আয়তনে ছোট, জনসংখ্যা বিশাল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক অশিক্ষা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, শক্তিশালী কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক এস্টাবলিশমেন্ট, স্ট্রং বুরোক্রেসি কিন্তু উইক ম্যানেজমেন্ট। তার ওপর রয়েছে অশিক্ষিত রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল, যাদের দুর্নীতি ও দালালির ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে ডেমোক্রেসি কার্যকর হয় না, হয়নি, এবং নিকট ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গত পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যায়, ডেমোক্রেসির মান ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। তবে একই সময়ে মানুষ আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করেছে: একটি শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কিংবা শক্ত হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা, সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে এবং জনগণের চিন্তাচেতনাকে উন্নয়নমুখী করতে পারে, শর্ত একটাই, সেই নেতৃত্ব যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়। সমস্যা হলো, গত পনেরো বছরে আমরা এমন কোনো শাসন পাইনি। ডেমোক্রেসিহীন শাসন হলেও তা দুর্নীতিতে ডুবে থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনার সেই সম্ভাবনাটিও নষ্ট হয়েছে।

আমি এখানে স্বৈরশাসন বা ডিক্টেটরশিপের পক্ষে কথা বলছি না। আমি বলছি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ডেমোক্রেসি , বুরোক্রেসি এবং মিলিটারি ক্যাপাসিটির মধ্যে একটি কার্যকর মেলবন্ধন। এমন একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার ভারসাম্য থাকবে। শুধুমাত্র নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া, এই বাস্তবতায় ক্রমশ একটি ভয়ংকর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।


ভয়ের রাজনীতি ও একটা ম্যাস পলিটিক্যাল পার্টির পতন

একটি রাজনৈতিক দলের আত্মিক বা রুহানিয়াতের মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন সমাজ বা দেশের সাধারণ জনগণ ওই দলের নেতা-কর্মীদের ভয় পেতে শুরু করে।

যখন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা দেশে ও সমাজে আতঙ্ক ছড়ায়, কিংবা এমন আচরণ ও কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় যা সাধারণ মানুষের কাছে ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক বলে প্রতীয়মান হয়, তখন সেটি স্পষ্টভাবে ওই রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে মৌলিক আদর্শ ও ঘোষিত ম্যানিফেস্টোর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানকে নির্দেশ করে। সুতরাং সেই রাজনৈতিক দলকে ভয় পাওয়ার পেছনে সাধারণ জনগণের যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়। এই ভয় থেকেই একসময় জনগণ ওই দলটিকে আর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই বোঝা উচিত, দলের সুপ্রিম নেতা কিংবা উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব যতই জ্ঞানী, দক্ষ বা আদর্শবান হোক না কেন যদি তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ নেতাকর্মী দ্বারা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তবে সেই রাজনৈতিক দল একটি দেশ পরিচালনার নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে। ভয়ের কারণ যাই হোক না কেন, এই ভয়ই হলো পতনের প্রথম ও সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণ। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা হারানোর আগেই পতনের শিকার হতে পারে যখন সাধারণ জনগণ তাকে ভয় পায়, তার দ্বারা আতঙ্ক তৈরি হয় এবং জনগণ আর দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারে না। এই অবস্থায় জনগণ ওই রাজনৈতিক দলকে এড়িয়ে চলে, এমনকি ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এর চেয়ে বড় পতন আর কী হতে পারে?

যখন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী বা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা এমন আচরণ বা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, যার ফলে সমাজের সাধারণ মানুষ তাদের ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝে নিতে হবে ওই রাজনৈতিক দলটি রুহানিয়াতি বা আত্মিকভাবে মৃত্যুর পথে অগ্রসর হচ্ছে। 

এই বাস্তবতা প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আবার দেখেন, কোনো দলের সুপ্রিম লিডার বা উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব যতই ভালো হোক না কেন, তাদের পরিকল্পনা ও নীতিমালা যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন যদি দলের কর্মীদের আচরণ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং সমাজে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই দল আর টেকসই থাকে না। তখন সেই দল আর জনগণের দল হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়ার অবস্থানেও থাকে না। যখন জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে ভয় পেতে শুরু করে, তখন স্পষ্টভাবে বুঝে নিতে হবে ওই রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সুতরাং প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই এই বিষয়টির প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক।

গণতন্ত্র এবং শত্রু বানানোর শিল্প !


মানবসমাজের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষের বেঁচে থাকার জীবনসংগ্রামে প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, মানুষ একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আমরা এই চিত্র দেখতে পাই, মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে, রক্তপাত ঘটিয়েছে, ধ্বংস ও ধ্বংসলীলায় লিপ্ত হয়েছে। এই সহিংসতা কখনো একই জাতির মানুষের মধ্যে, কখনো ভিন্ন জাতির মধ্যে, কখনো একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, আবার কখনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। প্রেক্ষাপট বদলালেও মানুষের এই বৈশিষ্ট্য ,সংঘাতপ্রবণতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত অপরিবর্তিত থেকেছে। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ বলেই প্রতীয়মান হয়।

আপনি যতই ইতিহাস পাঠ করুন বা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনধারা নিয়ে গবেষণা করুন না কেন, মানবইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আপনি মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধ্বংস এবং আধিপত্যের লড়াই লক্ষ্য করবেন। অনেক সময় এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ বা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে এই সংঘর্ষগুলো নিজ গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সীমানার বাইরের ‘অপর’ এর সঙ্গে বেশি সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এখন ভিন্ন গোষ্ঠী বা ধর্মের বা 'অপরের' সঙ্গে সংঘর্ষের চেয়ে একই জাতির ভেতরে, একই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। একে বলা যায় আন্তঃগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, স্বজাতি দ্বন্দ্ব কিংবা আন্তঃধর্মীয় সংঘর্ষ। 

এই প্রবণতাটি মূলত বিংশ শতাব্দীর পর থেকে স্পষ্টভাবে বিকশিত হতে শুরু করে। এ সময় ন্যাশনাল স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ফলে স্বজাতির মধ্যে সরাসরি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে কমে যায়। বিংশ শতাব্দীর পূর্বে যেখানে গোত্রে-গোত্রে বা স্বজাতির মধ্যেই ব্যাপক সহিংসতা দেখা যেত, সেখানে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই ধরনের সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে মানুষ নিজেদের পরিচয়কে বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করতে শেখে যার নাম দেওয়া হয় রাষ্ট্র বা জাতিরাষ্ট্র। এই জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোতে গণতন্ত্রকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিক বা গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরিত হয়। যে গোষ্ঠী জনসমর্থন, কৌশল বা সাংগঠনিক শক্তিতে অন্যদের ছাড়িয়ে যেতে পারে, সে-ই ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করে। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ লাভ করে। বলা যায়, মানুষের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবণতাকে গণতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এনে ‘সভ্য’ ও বৈধ রূপ দিয়েছে।

তবে এর সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন সমস্যারও জন্ম হয়। যদিও রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ এখনো বিদ্যমান, তবু একই দেশের মানুষ, একই জাতি কিংবা একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই একটি স্থায়ী শত্রুতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। এই মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতির মাধ্যমে সচেতনভাবে তৈরি ও উসকে দেওয়া হয়।
ডেমোক্রেসির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পারস্পরিক লড়াইয়ের ধারণাটিকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই ব্যবস্থাতেই। অন্যান্য শাসনব্যবস্থাতেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রে এই দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতাকে একটি বৈধ ও কাঠামোবদ্ধ রূপ দেওয়া হয়।

এখানেই গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত সংকটটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা মানুষকে কেবল ভিন্নমতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক মতভেদ সামাজিক ও মানসিক বৈরিতায় রূপ নেয়। একসময় মতের অমিল নয়, বরং মানুষ নিজেই মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই অর্থে বলা যায়, গণতন্ত্র মানুষের সহজাত দ্বন্দ্বপ্রবণ বা যুদ্ধপ্রবণ মানসিকতাকে নতুন করে সৃষ্টি করেনি; বরং সেই প্রবণতাকেই রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।

আদর্শিক রাষ্ট্র ও ও সমাজের অস্তিত্বহীনতা


মডার্ন দুনিয়ায় আদর্শিক রাষ্ট্র বলে আসলে কিছু নেই, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ আদর্শিক রাষ্ট্র সব সময় মাল্টি-কালচারাল ও মাল্টি-রিলিজিয়াস বিশ্বাসে আস্থাশীল। সুতরাং বর্তমানে রাজনীতিবিদরা কিংবা যারা নিজেদের আদর্শিক বলে মনে করেন, তারা যদি নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও আদর্শকে ভালোভাবে যাচাই করেন, তাহলে দেখবেন তারা সত্যিই মাল্টি-কালচারালিজম, মাল্টি-ন্যাশনালিজম কিংবা মাল্টি-রিলিজিয়নকে তাদের আদর্শিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্থান দিতে ইচ্ছুক কি না। সেই প্রশ্নের উত্তর পেলেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর এ মডার্ন দুনিয়ায় আদর্শিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাবে না এ কারণেই যে এর রাজনীতিবিদরা যেমন দুর্নীতিবাজ এবং ধান্দাবাজ বিপরীত পক্ষে তার জনগণও প্রচন্ডরকম অসৎ এবং দুর্নীতিপরায়ণ,  অসততা,  দায়িত্বহীনতা , কাণ্ডজ্ঞানহীনতার মত অনেক ব্যাড কোয়ালিটি তাদের মধ্যে বিরাজমান । এর ফলেই আধুনিক সময়ে আদর্শিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ক্রমহ্রাসমান খেয়াল করবেন। এবং অধিকাংশ জনগণ হচ্ছে মাল্টি কালচার মাল্টিন্যাশনালিজম মাল্টি রিলিজিয়নকে অস্বীকার করে। 

একটা আদর্শিক রাষ্ট্রের বিষয়টা আসলে খুবই মজাদার। মজাদার এই কারণে যে, কোনো রাষ্ট্র শুধু রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনেতার কারণে আদর্শিক, মডার্ন, আধুনিক কিংবা দুর্নীতিহীন ও শৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হয় না। মূল বিষয়টা যায় বটম-টু-আপ প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ অধিকাংশ জনগণ যদি সৎ হয়, অধিকাংশ জনগণের মধ্যে যদি সিভিক সেন্স থাকে, যদি শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা শক্তভাবে কাজ করে, তাহলেই সেই রাষ্ট্র আদর্শিক হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। জনগণের ভালো হওয়াটাই মূল চালিকাশক্তি; সেই কারণেই একটি রাষ্ট্র আদর্শিক রূপ নিতে তুলনামূলকভাবে অগ্রগামী হয়ে ওঠে। ফলে একটা আদর্শিক রাষ্ট্রে যতটা রাষ্ট্রনায়কের বেশি প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতন সদযোগ্য নাগরিকের অর্থাৎ আদর্শিক রাষ্ট্রের পূর্ব শর্ত হচ্ছে জনগণের আদর্শ জনগণ যেন সৎযোগ্য দক্ষ বিবেকবান হয়। 

আর এই আধুনিক সময়ে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যুগে, এমনকি ব্যক্তি-স্বৈরাচারিতার যুগে, মানুষকে সম্পূর্ণ সভ্য, দক্ষ ও শৃঙ্খল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখানে মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় পায়, কিন্তু রাষ্ট্রের আইনকে সম্মান করতে শেখে না। ফলে মানুষ ভয়ের কারণে আইন মানে, নৈতিকতা বা দায়িত্ববোধের কারণে নয়। রাষ্ট্র এখানে শ্রদ্ধার জায়গা হারিয়ে কেবল ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়, আর সেখানেই মূল সমস্যাটা।

এই আধুনিক সময়ে মানুষের যে গভীর বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, সেই বিচ্ছিন্নতার ফলেই দুর্নীতি, অসততা, অদক্ষতা ও অবহেলার মতো নেগেটিভ গুণগুলো বেড়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিকের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে মজার ও বিপজ্জনক বিষয় হলো, সোসাইটি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য, আর ব্যক্তি ও নাগরিকের মধ্যকার পার্থক্য, এই দুটোই এখন এক ধরনের গ্যাপে পড়ে গেছে।
আসলে ব্যক্তি থেকেই সোসাইটি তৈরি হয়, আর সোসাইটি থেকেই রাষ্ট্র। কিন্তু এখন রাষ্ট্রের কার্যক্রমে সোসাইটির মূল্য ও উপস্থিতি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, বা নাগরিককে শুধু প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে দেখছে—যার কারণে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

এই কারণেই আধুনিক সময়ে আদর্শিক রাষ্ট্রের নানা সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাস্তবে আদর্শিক রাষ্ট্র কখনোই গড়ে ওঠে না। যদি কোনো রাষ্ট্র তার সোসাইটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, যদি রাষ্ট্র সোসাইটির ভ্যালু ও ভূমিকার শতভাগ স্বীকৃতি দিতে পারে, তখনই কেবল একটি রাষ্ট্র আদর্শিক রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে। কারণ একটি সোসাইটিই পারে তার দেশের জনগণকে, নাগরিককে এবং সামাজিক মানুষকে সভ্য, যোগ্য, দক্ষ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। একটি রাষ্ট্র একা কখনোই সেটা পুরোপুরি পারে না। একটা রাষ্ট্রের যখন তার নাগরিকের লার্নিং প্রসেস সোশ্যালাইজেশন শিখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তখন সোসাইটির ভূমিকাটা কমে যায় ফলে ঝামেলাটা তৈরি হয় দেখেন সোশ্যালাইজেশন লার্নিং শিখুন সবকিছু ভূমিকাতে সোসাইটিকে অগ্রগামী রাখতে হবে কারণ রাষ্ট্র তার নাগরিককে শেখাবে হাউ টু বি এ কম্পিউটার সিটিজেন বাট একটা সোসাইটি তার ব্যক্তিবর্গ কে শেখায় হাউ টু বি এ গুড হিউম্যান বি ং দ্যাটস দ্যা ডিফারেন্স বিটুইন সোসাইটি অ্যান্ড স্টেট। 

আর এই মডার্ন দুনিয়ায় সোসাইটির ভূমিকা কমে যাওয়ার কারণেই কিংবা সোসাইটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হওয়ার কারণে আদর্শিক রাষ্ট্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত লাভ করবে না করতেও পারবেন না।

ডেইলি ব্লগ -০১ (২৩/১২/২৫)

ডেইলি ব্লগ -০১
২৩/১২/২৫


আজ সকালে দেরিতে ঘুম ভেঙেছে, কারণ গত রাতে অনেক দেরি পর্যন্ত জেগে ছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সময়টা কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যবহার হয়নি, বেশিরভাগই কেটেছে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইমে, যা এখন স্পষ্টভাবে আমার কাছে অনুশোচনার বিষয়। এর ফল হিসেবে সকালে দেরিতে ওঠায় দিনের প্রোডাক্টিভ সময় ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি, আর নিয়মিত হাঁটার যে অভ্যাসটা শুরু করেছিলাম সেটাতেও আজ বিরতি পড়ে গেছে। প্রায় দশটার দিকে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হই।  এরপর ইসমাইল ভাইয়ের দোকানে গিয়ে চা খাই। সেখানে পাঁচটা বাচ্চার সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটে, যা এক অর্থে ভালোই “কোয়ালিটি টাইম” ছিল।

এই সময়টায় একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করলাম। আধুনিক সময়ের যে নতুন আলফা জেনারেশন আসছে, তাদের ভবিষ্যৎ আমি এই চার–পাঁচজন বাচ্চাকে দেখেই পুরোপুরি বিচার করছি না, কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পেয়েছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, তারা অনেক বেশি ফ্রি, ভয়হীন, লাজুক নয়, লজ্জাবোধ বা বিব্রত হওয়ার প্রবণতা কম। আলফা জেনারেশনের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক মানসিকতা, সেটা তাদের মধ্যে স্পষ্ট ছিল।
আমাদের সমাজে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জেন জি বা বর্তমান প্রজন্মের একটা অংশ যেভাবে আলট্রা-ন্যাশনালিস্টিক, কড়া কালচারাল ফ্রেম তৈরি করতে চাচ্ছে, আমার মনে হয় এই আলফা জেনারেশন সেই মানসিকতাকে অনেকটাই ভেঙে দেবে। তবে এখানে একটা কনট্রাডিকশনও আছে।



ওই বাচ্চাগুলো না হিন্দি গান জানে, না বাংলা গান। তারা শুধু ভোজপুরি গানই জানে। ইদানীং আমাদের সমাজে এই প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। অর্থাৎ আমরা শুধু আধুনিক বা উচ্চমানের কালচারের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি না, বরং নিম্নমানের বা তথাকথিত “বেড কালচার”-এর মাধ্যমেও আমাদের কালচার গড়ে উঠছে। এটা একটা বাস্তব উদাহরণ। এরপর বাসায় ফিরে বেশিরভাগ সময় রুমেই ছিলাম। আজকে আমার দ্বারা একটা খারাপ কাজও হয়ে গেছে। আমার এক খালাতো ভাই ফিজিতে থাকে। সে হোল্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছিল, আর আমি সেই টাকা উত্তোলন করেছি। বিষয়টা করতে গিয়ে ভীষণ বিব্রত বোধ করেছি, কিন্তু না করতেও পারিনি। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এ ধরনের কাজ থেকে হেফাজত করেন।

সবশেষে,  এশার পর সজীব দেশের সঙ্গে কথা হলো। কিছু সময় ভালোভাবেই কাটালাম। দীর্ঘ একটা হাঁটা হয়েছে এশারের পর বাসির, আমি আর নাইম
এই ছিল আজকের দিন।

আজকের পুরো দিনের ব্যস্ততার ভেতরেও বাস্তবে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ হয়নি। নামাজের সময়গুলোও বেশিরভাগ রুমের মধ্যেই কেটে গেছে। সাহেদ আমাকে একটা জানাজায় যাওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি সেই জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি।

তবে আজকের দিন থেকে কিছু বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি, এগুলো থেকে আমাকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকতে হবে। যেমন, অপ্রয়োজনে বেশি হাসা, জোরে শব্দ করে হাসা, এই আচরণগুলো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে মনে হচ্ছে। পাশাপাশি আজকে কিছু গালিগালাজও হয়ে গেছে, যা একেবারেই অনুচিত। আরও খারাপ লাগার বিষয় হলো, মাঝে মাঝে গিবত করে ফেলেছি অজান্তিকভাবেই। শুধু তাই না, গিবত শুনেছিও। এই বিষয়গুলোকে আমাকে খুব টেকনিক্যাল ও সচেতনভাবে ট্যাকল করতে হবে। কথাবার্তায় স্ল্যাং ব্যবহার করা যাবে না, এই সিদ্ধান্তটা আরও শক্তভাবে নিতে হবে।

আজকে আরেকটা গুরুতর ভুল হয়েছে। আম্মার পার্শ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ফেলেছি, যেটা আসলে চুরি হিসেবেই গণ্য হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ ধরনের কাজ থেকে রক্ষা করুন।
খরচের দিক থেকেও আজকের দিনটা ভালো ছিল না। মোটামুটি চারশো থেকে সাড়ে চারশো টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে, আর এর বেশিরভাগ খরচই অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। তবে ইসমাইল ভাই  আমার কাছে একশো টাকা পাওনা আছে, এটা আলাদা করে মনে রাখতে হবে।

বিবাহ কেন?

 একটা স্ট্রং সোসাইটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিবাহ। আমাদের সমাজ বর্তমানে একটি বড় শিফটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর এই শিফটটি হচ্ছে পার্সোনাল রাইটসের দিকে। অর্থাৎ ব্যক্তি, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা এবং ব্যক্তি-স্বেচ্ছাচারিতাই এখন কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফলে সবকিছুই ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ব্যক্তি তার জীবনে অন্য কাউকে, কিংবা অন্য কারো হস্তক্ষেপকে কামনা করছে না। এমনকি সে মনে করছে না যে তার জীবনে একজন পার্টনার দরকার, যে তার চিন্তা, চেতনা, ইন্টিমেসি, রিলেশনশিপ ও মনোভাবের জগতে তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। 

এর ফল হিসেবে বিবাহের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আন্তরিকতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এখনও আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, দরিদ্র সমাজগুলোতে বিবাহের গুরুত্ব ও প্রচলন অনেকাংশে টিকে আছে। এর কারণ এই সমাজগুলোতে এখনও মানুষের পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, ধনী দেশগুলোতে বা অর্থনৈতিকভাবে অ্যাডভান্সড আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে যেমন ইউরোপীয় বা আমেরিকান সমাজে, বিবাহের প্রচলন ও সামাজিক গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেখানে ডিভোর্স, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, পার্সোনাল রাইটস, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রবণতা দ্রুত বেড়ে চলেছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও সামাজিক সচলতা।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মাথায় রাখতে হবে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেই সমাজ টিকে থাকবে, এমন নয়। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালেই দেখতে পাই, সেখানে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, সমাজের কোর ভ্যালু ও নৈতিকতার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। এর বিপরীতে, দরিদ্র কিংবা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে সংযুক্ত সমাজগুলোতে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতার চেয়ে কালেক্টিভনেস বা সমষ্টিগত চেতনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কারণেই এসব সমাজে মানুষ বিবাহের প্রতি বেশি ঝুঁকে থাকে।
আমি এখানে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা সচ্ছলতার দোহাই দিয়ে বিবাহের তুলনা করছি না। আমার মূল বক্তব্য হলো, একটি স্ট্রং সোসাইটির পূর্বশর্তই হচ্ছে বিবাহ। মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা ও কাঠামোর কেন্দ্রে বিবাহের প্রচলন রয়েছে। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কিছু মৌলিক নিড নিয়ে জন্মায়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শারীরিক ও যৌন চাহিদা। এই চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের দরকার ইন্টিমেসি ও সম্পর্ক। বর্তমানে এই সম্পর্ক অপোজিট সেক্স বা সেম সেক্স, যাই হোক না কেন, মূল বিষয় অপরিবর্তিত থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিবাহ এই যৌন ও শারীরিক চাহিদাকে একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। সমাজ সবসময়ই প্রো-শৃঙ্খল, প্রো-স্ট্রাকচার্ড এবং প্রো-কালেক্টিভ। সমাজ কখনোই বিশৃঙ্খলা, চরম ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যতা, স্বেচ্ছাচারিতা বা একাকিত্বকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে না। কারণ সমাজ জানে, এই প্রবণতাগুলো তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তাই সমাজ এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে মানুষকে একটি মেলবন্ধনের মধ্যে আনা হয়। এই সিস্টেমটাই হলো বিবাহ।

বিবাহ সমাজের প্রজনন ব্যবস্থা, ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণের ভিত্তি। সমাজের এক্সপ্যান্ড করার জন্য বিবাহ অপরিহার্য। শুধু একটি সমাজে নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানব সমাজেই এটি দেখা যায়। এমনকি তথাকথিত আদিম বা বর্বর সমাজেও, যখন একজন মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তার যৌন চাহিদা তৈরি হয়, তখন সমাজ তাকে একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সেই চাহিদা পূরণের অনুমতি দেয়। এই ব্যবস্থার রূপ ও রিচুয়াল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূল ধারণাটি এক, যাকে আমরা বিবাহ বলি। বিবাহ ছাড়া কোনো টেকসই মানব সমাজ বা মানব সংগঠন ইতিহাসে পাওয়া যায় না। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষ যখন একাকিত্বে থাকে, বিশেষ করে তরুণ বয়সে, যখন তার ওপর কোনো দায়িত্ব থাকে না এবং তার জীবনে কোনো পার্টনার থাকে না, তখন তার মধ্যে একধরনের সীমাহীনতা তৈরি হয়। সে মনে করে, তার কিছু হারানোর নেই। এই মানসিকতা থেকেই ব্যক্তির ধ্বংসাত্মক প্রবণতা, বর্বরতা ও অসভ্য আচরণ জন্ম নেয়।

কিন্তু বিবাহের মাধ্যমে যখন একজন মানুষ একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত পার্টনারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, তখন তার ভেতরে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। তার মধ্যে sense of belonging ও sense of attachment আসে। সে আর শুধু নিজের জন্য ভাবে না, সে তার পার্টনার, পরিবার এবং সন্তানের জন্য ভাবতে শেখে। সন্তান তখন তার উত্তরাধিকার, তার অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই সমাজ বিবাহকে এমন একটি সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা সহিংসতা কমায়, ব্যক্তি-স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যক্তি-ব্যক্তি সংঘর্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হ্রাস করে এবং মানুষকে দয়া, মায়া, মমতা ও একসাথে থাকার শিক্ষা দেয়।

মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ ও আসাদউদ্দিন ওয়াইসিদের মনোপলির রাজনীতি এবং ভারতীয় মুসলমানদের দুরবস্থা


আমার মনে হয়, ইন্ডিয়ান মুসলিমদের বর্তমান দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই অনেকাংশে দায়ী। দেখুন, গতকাল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে TMC এর বহিষ্কৃত নেতা হুমায়ুন কবির সাহেব বাবর নামে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা দেওয়ার দিনটিও তিনি বেছে নিয়েছেন ঠিক সেই দিন, যেদিন ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। হয়তো সেই আবেগ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মসজিদটি তিনি নিজস্ব অর্থে বা জনগণের চাঁদায় তৈরি করবেন। কিন্তু তিনি জেনে বা না জেনে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ করে দিলেন। আমার মনে হয়, এর ফলে মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব স্পষ্টভাবেই কমে যাবে এবং আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। শুধু হুমায়ুন কবির সাহেব নন ,এর আগের নির্বাচনেও পীরজাদা সিদ্দিক সাহেব মুসলিম ভোট মনোপলি করার কারণে মমতা ব্যানার্জিকে ব্যাকফুটে যেতে হয়েছিল। আর এই নির্বাচনেও আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সাহেবের মতো মুসলিম মনোপলি রাজনৈতিক দলগুলো রাজ্যে আসার ঘোষণা দিয়েছেন, এবং পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিমরা তাদের ভোট দেবে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এর ফলে স্বার্থন্বেষী এসব পলিটিক্যাল লিডারদের ভোট পাওয়াই শেষমেশ বিজেপিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব কিছুটা পড়বে এটা নিশ্চিত।

আমি খেয়াল করলাম, হুমায়ুন কবির সাহেবের এই মূর্খতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণ ভারতীয় মুসলিমদের কাছে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছে। তারা ভাবছেন তারা মহৎ কোনো কাজ করছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না এটা তাদের নিজেদের ধ্বংসের পথকেই আরও ত্বরান্বিত করছে। বাবর নামের এই মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে, এবং সামনের নির্বাচনে বিজেপির প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পাবে। দুঃখজনক হলো ,সাধারণ ভারতীয় মুসলিমরা যেন পাগলামি ও উন্মাদের মতো নিজ হাতে বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা তুলে দিচ্ছেন, অথচ তারা বিষয়টি উপলব্ধিই করতে পারছেন না।

এই কারণেই শিক্ষার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, এবং ইন্ডিয়ান মুসলিমদের এখন আরও সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের বুঝতে হবে , তারা কোথায় দাঁড়িয়ে, কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন এবং কোন আবেগ কখন ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহারে পরিণত করা যায় ,এ নিয়েও ভাবতে হবে।

কিছুদিন আগে বিহার নির্বাচনে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির পার্টি ছয়টি সিট জিতেছে। অনেক ভারতীয় মুসলিম এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন, এবং আমি লক্ষ্য করেছি অনেকেই সেটা সেলিব্রেটও করেছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, আগের টার্মে যেখানে ২৪ বা ২৫ জন মুসলিম বিধায়ক ছিলেন, এইবার তা নেমে ১২ কিবা ১৪ তে এসেছে। অর্থাৎ ওয়াইসি সাহেবের মুসলিম ভোট মনোপলির কারণে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা কার্যত অর্ধেকে নেমে গেছে। তার পার্টির সিট বাড়লেও মোট মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমে গেছে। সাধারণ মুসলিমদের এটা বোঝানো কঠিন। ফলে তারা এখনও বুঝে উঠতে চাইছেন না যে ওয়াইসি সাহেবের মতো নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সন্দেহের চোখে দেখাটা জরুরি। মুসলিম ভোট যত বেশি মনোপলি হবে, বিজেপির জন্য তত ভালো এটাই বিজেপির মূল কৌশল। তাই আপনি দেখবেন ,ওয়াইসি সাহেবদের মতো নেতাদের বিজেপি অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সাপোর্ট করে। বিজেপির মূল লক্ষ্য মুসলিমদের ভোট মুসলিমরাই পাক এবং হিন্দুদের ভোট বিজেপিতে পড়ুক। 

আপনি লক্ষ্য করবেন, ভারতের অধিকাংশ মুসলিম রাজনৈতিকভাবে খুব সীমিত ও পশ্চাদমুখী চিন্তাধারার মধ্যে আবদ্ধ। ঠিক আছে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সাহেব সাহসী, বিদ্বান, তাত্ত্বিক এবং বিতর্কিত নেতা হিসেবে মুসলিমদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে দরকারীও। কিন্তু তিনি যেভাবে নতুন নতুন প্রদেশে গিয়ে মুসলিমদের কার্যকর অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছেন, তা সন্দেহ তৈরি করে। আবার কংগ্রেসের মুসলিম নেতারাও তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেন না। তারা মুসলিমদের দুরবস্থা বোঝেন না, তবুও মুসলিম জনতা তাদেরকেই সমর্থন দিয়ে যান। আর কংগ্রেসি মুসলিম নেতাদের অকার্যকারিতায় হতাশ হয়েও মুসলিমরা ওয়াইসি সাহেবদের মতো মনোপলাইজড নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন।

এক্ষেত্রে আলেম-ওলামাদেরও কিছু দায় আছে। তারা নিজেদের কণ্ঠ যথাযথভাবে তুলতে পারছেন না। আরও মজার ব্যাপার হলো, ভারতের টিভি টকশোগুলোতে যেসব আলেম-ওলামাদের আনা হয়, তাদের দেখে মনে হয় না তারা আলেম-ওলামা; বরং কোনো মাস্তানসুলভ চরিত্র। তাদের কথা অগোছালো, উদ্দেশ্যহীন, মনে হয় যেন বিতর্ক তৈরির জন্যই আনা হয়। প্রশ্ন আসে ভারতের ১৬ কোটি মুসলিমের মধ্যে কি এমন কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা নেতা নেই, যারা বিপদগ্রস্ত ভারতীয় মুসলিমদের সঠিক পথ দেখাতে পারেন?

বাংলাদেশে পথ হারিয়েছে বামেরা ?

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের বামপন্থীদের রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনীতি মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা, গরিব, দুঃখীদের নিয়ে কথা বলা, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, অল্পের কথা বলা, সংখ্যালঘুদের কথা বলা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় প্রতিবাদ করার মধ্যেই আবর্তিত।
কিন্তু বাঙ্গু বামেরা এখনো ৭১, স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযোদ্ধাবিরোধী, রাজাকার, আলবদর, টিপ, ওড়না, হুজুর, ফতোয়া, মৌলবাদ এই সীমানার বাইরে যেতে পারেনি।
তাহলে এরা সাধারণ মানুষের কাছে যাবে কখন?

এ কারণেই এই বাঙ্গু বামরা কোনদিনই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সমর্থন পাবে না । দেখেন, বামদের প্রকৃত শক্তি তো সাধারণ খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষরা। অথচ বাংলাদেশে আমরা যেটা দেখি ,মেহনতি মানুষেরাই বামদের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করে। কি আইরনি !

পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বামদের political leadership বা political party গুলোকে দেখেছি, তাদের ভেতর একটা স্বাভাবিক charisma থাকে। তাদের নেতাদের আলাদা এক ধরনের সম্মোহনী গুণ থাকে যা সাধারণ মানুষ সহজেই এই বাম এবং তাদের politics এর সাথে নিজেদের relate করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বামদের মধ্যে, সত্যি বলতে এ রকম কিছুই নেই; কিঞ্চিৎ পরিমাণও না।

আমাদের বুঝতে হবে, বামদের politics মানেই real politics। এবং এটা মানতেই হবে যে real politics কিংবা বাস্তববাদী politics যদি কেউ করে থাকে, সেটা হচ্ছে বাম এবং বাম রাজনীতিবিদরা।
বামদের রাজনীতি বা পলিটিক্সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানুষ ও তার অধিকার। তার রাজনীতির মূল কেন্দ্রই হল মানুষ। 

কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, এই বাঙ্গু বামদের কাছে সাধারণ মানুষ কোনো গুরুত্বই পায় না; যেন সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন। এরা উদ্ভট চিন্তাচেতনা ও মতবাদের ভেতর পড়ে থাকে। সাধারণ মানুষকে বুঝবে কখন? আর সাধারণ মানুষ কিভাবে তাদের বুঝবে, এই পথ আবিষ্কার করবে কখন?
যেখানে বামদের সাথে রিলেট করতে পারার কথা সাধারণ খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের কিন্তু বাংলাদেশের বামদেরকে সবচেয়ে বেশি relate করে এলিট শ্রেণী, ধনী শ্রেণী, ব্যবসায়ী শ্রেণী। যেখানে সাধারণ মেহনতি মানুষ, যারা প্রকৃত শক্তি, তারা বামদের সাথে মোটেই relate করতে পারে না। এটা কি বামরা বুঝতে পারছে? আদৌ কি তারা উপলব্ধি করছে? আমার মাথায় আসে না।

বাংলাদেশের বামেরা তাদের প্রকৃত politics সাধারণ মানুষ ও জনগণের রাজনীতিতে ফিরুক। সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলুক। এবং বামরা যে real politics করে, এটা যেন বাংলার সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এবং বামদের উত্থান ঘটুক , এই আশাবাদ রাখি।

সমালোচনাতেই শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হইয়া উঠবেন

শেখ মুজিবুর রহমানকে এতদিন আওয়ামী লীগ ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠতে দেয়নি। বর্তমান সময়ে থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠবেন এবং অলরেডি উঠতে শুরু করেছেন। দেখুন, একটা দেশের জাতীয় বীরকে বা জাতীয় নায়ককে মানুষ তখনই আইডেন্টিফাই বা রিকগনাইজ করতে পারবে, যখন দেশের আপামর জনতা তাকে সমালোচনা করতে পারবে, তার কর্মকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারবে। এতদিন আওয়ামী লীগ বাংলার জনগনকে যেটা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সমালোচনা ও তার কর্মকান্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে দেয়নি।

শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগ এবং তাদের এলিট শ্রেণিরা বাংলাদেশের জনগণের নিকট এতদিন প্রফেট ও সেক্রেড করে রেখেছিল। যেটা সাধারণ জনগণ মেনে নেয়নি। এই কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান তাদের আমলে রিয়েল বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে পারেননি । আপনি দেখবেন পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান আবার তার সমহিমায় বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠবেন এবং বাংলাদেশের অধিকাংশ জনতা তাকে বঙ্গবন্ধু হিসেবেই জানবেন এবং চিনবেন , এতে কোন সন্দেহ নেই। 

আপনি প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকান, মহাত্মা গান্ধী এ কারণেই “মহাত্মা” কারণ তার দেশের সাধারণ জনগণ সকাল-বিকেল তার সমালোচনা করতে পারে, তার প্রত্যেকটা কর্মের কাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং তার অতীত কর্মকাণ্ডকে মানুষ সঠিক ও বেঠিক মানদন্ডের ভিত্তিতে বিচার করতে পারে । ইভেন আপনি অবাক হবেন ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে ভারতীয়রা গালি দেয়, তাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে , তাতে কি তার সম্মান বা মাহাত্ম কমে গেছে? কমেনি, বরং বেড়েছে এবং বাড়ছেই। আবার আপনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের দিকে তাকান ওইখানে জিন্না সাহেবকে ঠিক আপনার শেখ মুজিবের মতই সেক্রেট এবং প্রফেট করে রাখার ফলে তার মাহাত্ম্য মহাত্মা গান্ধীর মত এত ব্যাপক হতে পারেনি , কারণ পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ জিন্নাহ সাহেবের কর্মকাণ্ডকে ঠিক বেঠিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করতে পারেনা । সুতরাং বাংলাদেশেরও উচিত আমাদের রাষ্ট্রীয় নায়ক ও রাষ্ট্রের মাহাত্মাদের কর্মকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা, তাদের সমালোচনা করা এবং জনগণকে তাদের সমালোচনা করার সুযোগ দেওয়া।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় নায়কেরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরে পাক , তারা দল মত নির্বিশেষে সকলের হইয়া উঠুক , এই কামনা করি। বাংলাদেশের জাতীয় নায়কদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা হোক, সাধারণ জনগণ যেন জাতীয় নায়ক ও বীরদের প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে পারে এবং নেগেটিভ কর্মকাণ্ডকে সমালোচনা যোগ্য হিসেবেই সমালোচনা করতে পারে, এই সুযোগ রাষ্ট্র জনগণকে করে দিক এই আহ্বান রাখি । আবার প্রত্যেকটা জাতীয় বীর ও নায়ক তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরে পাক এবং রাষ্ট্রীয় মহত্ব মর্যাদার সাথে তাদের স্মরণ করা হোক । কেউ বিস্মৃত না হয়ে থাকুক এই আহ্বান রাখি।

চার্লি ক্রিকের মৃত্যু ও নয়া কর্তৃত্ত বাদী আমেরিকা


মনে হচ্ছে আমেরিকান রাজনৈতিক কমেন্টেটর চার্লি কির্ক মারা গেছেন। তিনি সম্ভবত গান ভায়োলেন্স নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন এবং উটাহ ভ্যালি ইউনিভার্সিটিতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে খুব কাছ থেকে নৃশংসভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি আমেরিকান ডানপন্থীদের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তাঁর এই মৃত্যুর ঘটনায় আমেরিকান রাজনীতি আরও বেশি করে ডানপন্থী দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। এমনিতেই গত কয়েক মাস ধরে আমেরিকান সরকার ইমিগ্রেশন নিয়ে খুবই কড়াকড়ি করছে এবং অবৈধ অভিবাসীদের ধরপাকড় করে বর্বরতার সাথে গ্রেফতার করে বিভিন্ন দেশে ডিপোর্ট করছে। উগ্র ডানপন্থী ট্রাম্প সরকার এই ঘটনাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে চাইবে এবং এই মৃত্যুকে ব্যবহার করে ট্রাম্প সরকার আরও অনেক বেশি উগ্র এবং চরমপন্থী আচরণ করতে শুরু করতে পারে, যা আমেরিকান রাজনীতিতে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এমনিতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক জায়গায় সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাইপাস করে সেন্ট্রাল পাওয়ারকে সেন্ট্রালাইজ করছে; তাতে এই ঘটনা থেকে তিনি তাঁর ক্ষমতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগাবেন, এটি অনুমান করলে ভুল হবে না। চরম ডানপন্থী হোয়াইট সুপ্রিম্যাসিস্টরা আরও বেশি উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠবে। আর পৃথিবীতে যেসব ঘটনা উপলব্ধি করা যাচ্ছে, তাতে ধরে নেওয়া যায় যে পৃথিবী আরও অশান্ত, বিশৃঙ্খল এবং মানুষ আরও বেশি অধৈর্য হয়ে উঠবে। দেশে দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও ভায়োলেন্স সৃষ্টি হবে এবং হয় পৃথিবীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পরিবর্তিত হয়ে যাবে, অথবা সামনে আমরা একটি বিশাল যুদ্ধের এসকেলেশন দেখতে  হতেও পারে।

ধর্ম, ইউনিটারি গ্লোবাল কালচার ও জাতীয়তাবাদ

আগামির বিশ্বে ‘ন্যাশনাল কালচার’ বলে আলাদা করে কিছু টিকে থাকবে না। যে বিশ্ব এখন রয়েছে কিংবা সামনে যা আসছে, সেখানে মূলত দুইটি প্রধান কালচারের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, একটি হলো ধর্মীয় কালচার, অন্যটি বৈশ্বিক ইউনিটারি কালচার। তবে, সকল ধর্মীয় কালচার যে এই ইউনিটারি কালচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, তা নয়। শুধুমাত্র সেই ধর্মীয় কালচারগুলোই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, যেগুলোর ভিতর শক্ত সাংস্কৃতিক ভিত্তি রয়েছে। এমন তিন থেকে চারটি ধর্ম এই কালচার হতে পারে; এর মধ্যে ইসলামিক কালচার, বৌদ্ধ এবং জিউইশ কালচার উল্লেখযোগ্য। 

তবে বৌদ্ধ ও জিউইশ কালচার অনেকটাই সিক্রেট এবং তাদের অভ্যন্তরে ইনক্লুসিভনেস ও সেক্রেসি বজায় থাকে , বলে তারা বৈশ্বিক কালচারে পরিণত হতে পারবে না। এর বিপরীতে, ইসলামিক কালচারের মধ্যে রয়েছে একটি বৈশ্বিক রূপ নেওয়ার সামর্থ্য। এন্ড ওয়েস্টার্ন কালচারের সাথে হোয়াইট দেওয়ার মত রসদ ইসলামিক কালচারের মধ্যে রয়েছে এবং যেটা অলরেডি দিচ্ছে। 

অন্যদিকে, ইউনিটারি বা বৈশ্বিক কালচারের প্রধান বাহক হয়ে উঠবে সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক, হিপ-হপ, পপ কালচার ইত্যাদি। এই ইউনিটারি কালচারে আমেরিকা, কোরিয়া এবং বলিউডের মতো কিছু টিভি ও সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির প্রভাব প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হবে। যদিও এই গ্লোবাল কালচারে ক্রিশ্চিয়ান ভাবধারার কিছু অংশ, বিশেষ করে টিভি, সিনেমা, বলিউড, হলিউড কিংবা K-pop ইন্ডাস্ট্রির নির্দিষ্ট কিছু উপাদান বজায় থাকবে, তবু এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে এক ধরনের সেকুলার ও কনজিউমারিস্ট মূল্যবোধ, যার প্রভাব হবে সুগভীর ও বিস্তৃত।

তবে এই কালচারাল দ্বন্দ্ব একপাক্ষিক হবে না; বরং একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। যেমন, ইউনিটারি কালচারের সঙ্গে ইসলামিক রিলিজিয়াস কালচারের এক ধরনের এসিমিলেশন ঘটতে পারে, যার ফলে এক নতুন ধাঁচের কালচারের জন্ম হতে পারে। আবার তা এক ধরনের কেয়োটিক ও ডিরেকশনলেস কালচারে (directionless culture) রূপ নিতে পারে। ধরে নেওয়া যায়, এই কালচারাল দ্বন্দ্ব দীর্ঘ সময় ধরে চলবে এবং শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল কালচারই ‘আপার হ্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, একটি প্রভাবশালী ও নিয়ামক সংস্কৃতি হিসেবে। তবে, এর মানে এই নয় যে অন্যান্য কালচার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে; বরং তারা তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মহিমা কোনো না কোনোভাবে টিকে রাখবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যতই আমরা প্রতিটি দেশ নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করি না কেন, বাস্তবে প্রত্যেক জাতি ও ধর্মের নতুন প্রজন্ম বা ইয়াং জেনারেশন তাদের নিজস্ব কালচারের প্রতি এক ধরনের হিমশীতল মনোভাব পোষণ করে, তারা অনেক সময় এক ধরনের হিউমিলিয়েশনে (humiliation) থাকে। ফলে, ‘ন্যাশনাল প্রাইড’ বা জাতীয় গৌরবের সংস্কৃতি তারা আর বাস্তব জীবনে প্র্যাকটিস করে না, বরং ধীরে ধীরে তা থেকে সরে আসে। এখানেই জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিজমের একটি গভীর ব্যাকফায়ার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দায়িত্বহীন রাষ্ট্র আর সাইবার মব জাতি !


একটা রাষ্ট্র কতটা অগোছালো, অনিয়ন্ত্রিত এবং দুর্নীতিপরায়ণ হলে মানুষের জীবনের মূল্যকে এতটা হেয় করতে পারে? দেখুন, সেখানে শুধু শত শত মানুষই মারা যায়নি, সেখানে প্রাণ হারিয়েছে শত শত শিশু। একটি প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যু এবং একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই এক নয়।

মাইলস্টোনের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের জাতিকে কতটা নাড়া দেবে, তা আমাদের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার দায়ভার কার? কোন কর্তৃপক্ষ এই দায় নেবে? বিমান বাহিনী? সশস্ত্র বাহিনী? বাংলাদেশ সরকার? শিক্ষা মন্ত্রণালয়? নাকি মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ?

আবার প্রশ্ন আসে, দায় স্বীকার করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? এই হারিয়ে যাওয়া অমূল্য প্রাণগুলোর ক্ষতিপূরণ কি আদৌ সম্ভব? আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী, যেখানে প্রতিটি ভুলের পরিণাম হয় বিপর্যয়কর?

তবে সবকিছু রাষ্ট্র, সমাজ বা সমাজপতিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না। আমাদের নিজেদেরও দায়িত্ব আছে। দেশে কোনো বড় ঘটনা ঘটলেই যেন গোটা জাতি ফেসবুকে ঝড় তোলে। এক ধরনের সাইবার মব তৈরি হয়, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মত, অনুমান, এমনকি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু এতে কি আদৌ কোনো ভালো ফল আসে?

জরুরি পরিস্থিতিতে এমন আচরণ বরং আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তাই আমাদের উচিত ধৈর্য ধরা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। সত্য উদঘাটন হোক, এটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব, যেন মিথ্যা খবর আর প্রোপাগান্ডার সয়লাব না হয়।

মাইলস্টোনের ঘটনার পরও আমরা দেখলাম, ফেসবুকে ছড়ানো অধিকাংশ প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ মূলত শিক্ষিত শ্রেণীর হাতেই তৈরি হচ্ছে। যারা নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করে, তারাই কোনো দুর্ঘটনাকে আরও ভয়াবহ আকারে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

জাতি হিসেবে আমাদের একটি আত্মসমালোচনার দরকার। বুঝতে হবে, কখন, কোথায়, কীভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। তথ্য পেলেই সেটি যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্ব নয়। আমাদের প্রত্যেকেরই একটি ন্যূনতম সামাজিক দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্ব পালন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষিত অসভ্য ?


পৃথিবীতে আপনি দুই ধরনের অসভ্য মানুষ দেখতে পাবেন, যারা বর্বর চিন্তায়, চেতনায় ও আচরণে। 
প্রথম প্রকার হলো অশিক্ষিত অসভ্য। এরা গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, অথবা শহরের প্রান্তিক মানুষ। তাদের অসভ্যতা মূলত অজ্ঞানতা থেকে আসে। এই মানুষদেরকে বোঝানো যায়। আপনি যদি তাদের শিক্ষা দেন, তারা শিখতে চায়; তাদের মূর্খতা ও বর্বরতাকে সভ্যতার দিকে আনা সম্ভব। এই অশিক্ষিত অসভ্যদের অসভ্যতার বর্বরতাকে আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন।
দ্বিতীয় প্রকার হলো-
শিক্ষিত অসভ্য, এরা সমাজের সেই শ্রেণী, যারা নিজেদের অসীম জ্ঞানী মনে করে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, পত্রপত্রিকা, এমনকি রাষ্ট্রের policymaking-এ এদের সরব উপস্থিতি। এরা সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের ভারসাম্যকে নিজেদের চোখে সঠিক বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে they are the only sophisticated animals in the world। তারা মনে করে, তারাই একমাত্র সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের যেকোনো policy, প্রথা ও values তৈরি করার অধিকার রাখে।
এই শ্রেণীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, তাদের ভুল তারা কখনোই স্বীকার করতে চাইনা । তারা ভাবতেই পারে না যে তাদের চিন্তার ভ্রান্তি  থাকতে পারে এবং তাদের এই ভ্রান্ত চিন্তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। হাজারবার বোঝালেও কোনো লাভ নেই। তারা কোনো সমালোচনা শুনবে না, কারও কাছ থেকে শিখবে না, কারণ তারা মনে করে তারা এই সুপেরিয়র সবার থেকে।
এই শিক্ষিত অসভ্যতার বর্বরতা এতটাই গভীর ও বিধ্বংসী যে তা কল্পনারও অতীত। আল্লাহ আমাদের উভয় ধরনের অসভ্যতার হাত থেকে রক্ষা করুন।

চাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি!

মরা যে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখে এসেছি, সেখানে রাজনীতি মানেই একে অপরকে খোঁচা দেওয়া, বক্রভাষায় কথা বলা, উস্কানি দেওয়া, আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলা এবং গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধানো, এগুলোই যেন রাজনীতি। এক দল আরেক দলকে গুঁতা না দিলে যেন তাদের রাজনীতি হয় না।

এই পুরনো ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিসরকে নষ্ট করে ফেলেছে, এ কথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি। এইসব রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে কোনো সৌজন্যবোধ, শালীনতা, ন্যূনতম শিষ্টাচার নেই। কোনো সততা বা উদারতা নেই। তাদের ভাষায় আপনি শালীনতার লেশমাত্রও দেখবেন না। মনে হবে যেন বস্তির অশিক্ষিত, অসভ্য মানুষ রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, দলের শীর্ষ নেতাদের ভাষাও জঘন্য এবং অযোগ্যতার পরিচায়ক।

আপনি তাদের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতি বা জনগণের মঙ্গল নিয়ে কোনো আলোচনা শুনবেন না। এমনকি যদি সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের আলোচনা শোনেন, আপনার বমি পাবে, এ যেন অশিক্ষিত, মূর্খ, অসভ্যদের মতো গায়ে পড়ে ঝগড়াঝাঁটি করা। এটাই আমাদের রাজনৈতিক দলের মুখের ভাষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া।

আর একটি বড় সমস্যা হলো, যেসব বুদ্ধিজীবী এই রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করেন, তাদের দর্শন দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, নীতি-নির্ধারণে সহযোগিতা করেন, তারাও সেই একই জঘন্য ভাষায়, অশ্লীলতায় লিপ্ত হন। তারা পুরনো রাজনৈতিক হিরোদের গুণগান করেন, কী কী অর্জন করেছেন, কত মহান ছিলেন, এই সব বস্তাপচা কথাবার্তা দিয়ে তারা সুবিধাবাদী হয়ে ওঠেন, ক্ষমতার ভাগীদার হতে চান। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকেও শিখতে দেন না, তারা বন্য জন্তু জানোয়ারদের মতো ক্ষমতা দখল করতে ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এর বাইরে আপনি তাদের কাছ থেকে আর কিছুই দেখতে পাবেন না।

তাই আমার NCP-সহ সব নতুন দলের প্রতি অনুরোধনতুন দল হিসেবে আপনারা গায়ে পড়ে ঝগড়া করবেন না, উস্কানিমূলক কথা বলে রাজনৈতিক পরিসরকে উত্তপ্ত করবেন না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ করুন এবং নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখুন। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে NCP একটি নতুন দল। নতুন দল হিসেবে আমরা আশা করি তারা আমাদের জন্য নতুন কিছু উপহার বয়ে আনবে।

কুসংস্কার ও তার রকমভেদ!










1.
আমরা কুসংস্কারের সাথে অতি পরিচিত। এই কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, মিথ, মিথলজি ,সবকিছুই আমাদের সোসাইটি ও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই কুসংস্কারের ভেদাভেদ বা বৈচিত্র্য আমরা অনেকেই জানি না। আমাদের অবশ্যই জানতে হবে, এই কুসংস্কারগুলো ঠিক কী ধরনের এবং কোন শ্রেণীর মানুষ এইসব বিশ্বাসে আবদ্ধ। একমাত্র তখনই আমরা বুঝতে পারবো, কোন শ্রেণীর মানুষ কতটা গভীরভাবে কুসংস্কারে নিমজ্জিত এবং কার বিপক্ষে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে লড়াই করতে হবে।
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে তিনটি প্রধান শ্রেণীর মানুষ রয়েছে, যারা ভয়াবহভাবে কুসংস্কারচ্ছন্ন। এই তিন শ্রেণীর প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা বিষয়, মিথ, ফলস এবং ইউটোপিয়ান চিন্তায় অটল বিশ্বাস রয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণীরই কুসংস্কারে নিমজ্জিত হওয়ার নিজস্ব গ্রাউন্ড আছে, রয়েছে আলাদা রিজন ও বিশ্বাস, যা তাদের কুসংস্কারে আটকে রেখেছে। এদের প্রত্যেকের কুসংস্কার সোসাইটি ও রাষ্ট্রকে ভিন্নভাবে ডিমেরিট করে, এবং তাদের প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।

2.
প্রথম শ্রেণীর মানুষরা হলো সেইসব ব্যক্তি, যাদের আমরা রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রান্তিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করি, সাবঅল্টার্ন প্রান্তিক মানুষ। এরা অনেক সময় ধর্মীয় কারণে মিথ, মিথলজি এবং নানা ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী হয়, অথবা ধর্মের এক ধরনের মিথ্যা মোড়ক ও বিকৃত ব্যাখ্যার ফাঁদে আটকা পড়ে নিজেদের আচ্ছন্ন করে তোলে। ফলে তাদের চারপাশে গড়ে ওঠে এক ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক ভ্রান্তির বলয়, যেখানে ভুল কনসেপ্ট, অপব্যাখ্যা এবং অন্ধবিশ্বাস একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায়। এই শ্রেণীর মানুষরা কখনও ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধের সঠিক এবং সফিস্টিকেটেড ব্যাখ্যা পায় না, অথবা সেই ব্যাখ্যা বোঝার মতো সুযোগ-সুবিধাও তাদের জীবনে থাকে না। অধিকাংশই অশিক্ষিত; শিক্ষার আলো তাদের দিগন্তে পৌঁছায় না, আর সেই অন্ধকারেই তারা কুসংস্কারের শেকড়ে আবদ্ধ হয়ে থাকে। এই কুসংস্কারের পেছনে রয়েছে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা, সামাজিক প্রথার অপপ্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্থায়ী ঘাটতি।
মজার বিষয় হলো, আমাদের সোসাইটি ও রাষ্ট্রে একটি সহজাত ধারণা প্রায়ই প্রচলিত, যে এইসব সাবঅল্টার্ন প্রান্তিক মানুষরাই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, অশিক্ষিত ও অসভ্য। আর তাদের এই কুসংস্কারের উৎস নাকি ধর্ম। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। আসলে ধর্ম নয়; বরং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, সামাজিক প্রথার বিকৃত রূপ এবং শিক্ষার বঞ্চনাই তাদেরকে কুসংস্কারের গহ্বরে ঠেলে দেয়। ফলে তারা এক ধরনের অন্ধ বিগট্রি-তে আক্রান্ত হয়, যা প্রায়শই অজ্ঞানতা ও বঞ্চনার ফসল।
তবু বাস্তবতা হলো , এই শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত শান্তিপ্রিয়তা বিরাজ করে। যদি তাদের কুসংস্কারকে সঠিক ওয়েতে ডিফাইন করা যায় এবং তাদের সামনে ধর্ম ও সামাজিক প্রথার প্রকৃত ব্যাখ্যা, মূল্যবোধের গভীরতা ও শিক্ষার সর্বব্যাপী গুরুত্ব উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তারা দ্রুতই এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে সক্ষম। তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার উপায় সমাজে বিদ্যমান, এবং ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, এই শ্রেণীর মানুষরা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ভ্রান্তির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে সমাজের মূলধারায় নিজেদেরকে দক্ষতার সাথে অ্যাডাপ্ট করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রান্তিক মানুষের এই কুসংস্কার, ধর্মীয় বিগট্রি ও সামাজিক বিকৃতি রাষ্ট্রীয় জীবনে বড় ধরনের নেগেটিভ প্রভাব ফেলে না; বরং তা সীমিত এবং স্থানীয় পর্যায়েই আবদ্ধ থাকে।

3.

দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষরা হলো মধ্যবিত্ত। এদের কুসংস্কার মূলত অর্থনৈতিক ভিত্তিক এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে জন্ম নেয়। এই কুসংস্কার ও মিথের একটি সীমানা তারা নিজেরাই গড়ে তোলে, যেন এক অদৃশ্য বৃত্তের ভেতরে নিজেদের আবদ্ধ রাখে। রাষ্ট্রও এই কুসংস্কার ও মিথকে সচেতনভাবে আরো বেশি প্রমোট করতে চায়, যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সেই বৃত্তেই বন্দী থাকে।
মধ্যবিত্তের কুসংস্কারের মূল উৎস হলো, পরিবর্তনের প্রতি এক গভীর আতঙ্ক। তারা সর্বদা একটি স্ট্যাটাস কুয়ো বজায় রাখতে চায় এবং আশা করে সমাজ ও রাষ্ট্র তাদেরকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনায়কেরা তাদের এই চাওয়াকে কখনোই প্রকৃত গুরুত্ব দেয় না। বরং রাষ্ট্র তাদের সামনে একটি ফাঁপা বয়ান তৈরি করে, যা তারা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। মধ্যবিত্তরা প্রায়ই মনে করে, বুড়োক্র্যাট ও রাষ্ট্রনায়কেরাই তাদের সমস্ত স্বপ্নের হেফাজতদার, এবং তারা ধর্মের মতোই এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন করে।
মজার বিষয় হলো, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাষ্ট্রের প্রতি এই বিশ্বাস কখনও কখনও ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়েও বেশি দৃঢ় মনে হয়, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা খুবই ভঙ্গুর এবং ক্ষণস্থায়ী।
4.

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী হলো শিক্ষিত, সুশীল ও সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষ, যারা নিজেদেরকে সমাজের চোখ, মস্তিষ্ক এবং মাথা বলে মনে করে। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সমাজের সমস্ত কিছুই তাদের চিন্তা-চেতনা, মত ও পথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে। তাদের ধারণা, সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের চেতনা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। যদি সমাজের কোনো কিছু তাদের চিন্তার বাইরে গিয়ে যায়, তারা ধরে নেয় যে সমাজ ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। তাদের মূল ভ্রান্তিটা এখানেই, তারা বিশ্বাস করে, অন্য কেউ সমাজের ভালো-মন্দ নিয়ে চিন্তা করার যোগ্য নয়।
এই মানসিকতা থেকে তারা রাষ্ট্র ও সমাজে এমন সব নিয়মকানুন তৈরি করতে চায়, যা একেবারেই abstract, বিমূর্ত, যার কোনো বাস্তব, ফিজিক্যাল অস্তিত্ব নেই। তারা রাষ্ট্রপিতা, রাষ্ট্রীয় নায়ক, দেশনায়ক, জননায়ক, রাষ্ট্রের হিরো, সংবিধান, রাষ্ট্রীয় সংগীত, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ইত্যাদিকে এক ধরনের পবিত্রতার আসনে বসিয়ে দেয়। প্রত্যেক নাগরিককে এগুলো মেইনটেইন করতে ও মানতে বাধ্য করা হয়। এইসবকেই তারা এতটাই sacred করে তোলে যে এগুলোতে কেউ যদি বিশ্বাস না রাখে, তাকে যেন ধর্মদ্রোহীর মতো বিবেচনা করা হয়, তার প্রতি blasphemous আচরণ করা হয়। ফলে সেই অবিশ্বাসীকে রাষ্ট্রীয় চিন্তা-চেতনার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলত, এটি এক ধরনের sacredness, যা রাষ্ট্রের নামে এক অদৃশ্য ধর্মীয় কাঠামো তৈরি করে।
আমাদের সুশীল শ্রেণি, সমাজের উচ্চতলার একাডেমিসিয়ান, ফিলোসফার, পলিটিশিয়ান ও বুড়োক্র্যাটরা সমাজের নিচের তলা থেকে এইসব কুসংস্কার, ক্যারেক্টার, মিথ এবং রাষ্ট্রীয় মিথিক্যাল ক্যারেক্টার তৈরি করে, যেগুলো সবাইকে মানতে বাধ্য করা হয়। তারা নিজেরাও এগুলো মানে, কখনও সুবিধার কারণে, কখনও স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তারা নিত্যনতুন ইতিহাস নির্মাণ করে, সেগুলোকে পবিত্র করে তোলে এবং সমাজে এক ধরনের sacred vibe তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় সংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, অন্ধ রাষ্ট্রীয় চেতনা ও অন্ধ রাষ্ট্রবাদ। আর এরই ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠে দুর্নীতি, অপশাসন, শাসন-নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল বাহিনী। এগুলোও এক ধরনের কুসংস্কার, শুধু এর আকার আরও বৃহৎ এবং প্রভাব আরও বিপজ্জনক।

5.
আমাদের সবাইকে এই তিন শ্রেণীর মানুষের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি বাধা আসবে তৃতীয় শ্রেণীর কাছ থেকে। কারণ প্রথম শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে আপনি আপনার যৌক্তিক চিন্তা ও যুক্তিবাদ দিয়ে লড়তে পারবেন। তাদেরকে বোঝানো সম্ভব যে তাদের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সমাজের জন্য কতটা নেগেটিভ প্রভাব সৃষ্টি করছে। তারা একসময় বুঝতে শেখে এবং নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে পারে।
কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং বিশেষত তৃতীয় শ্রেণীর সেই সুশিক্ষিত, সুশীল, তথাকথিত সমাজের মাথারা ,যারা রাষ্ট্রীয় চিন্তা-চেতনাকে এক ধরনের ধর্মীয় মোড়কে আচ্ছাদিত করেছে, তাদেরকে আপনি কখনোই যুক্তি বা চিন্তার আলোয় পরিবর্তন করতে পারবেন না। এরা এতটাই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন যে তারা আপনার প্রতিটি যুক্তিকে শত্রুতার চোখে দেখবে। তারা প্রতিনিয়ত ঘৃণার উৎপাদন করবে এবং আপনাকে ও আপনার চিন্তা-চেতনাকে দমন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এদের প্রতিরোধের ধরন হবে নির্মম; প্রয়োজনে তারা জুলুম-নির্যাতনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করবে না। এরা মানবিকতার ন্যূনতম বোধকেও উপেক্ষা করবে, কারণ তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় কুসংস্কারই চূড়ান্ত সত্য।

তৃতীয় শ্রেণীর মানুষেরাই মূলত আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা, তারা অগ্রগামীতার শত্রু। যারা নিজেদের সমাজের মাথা মনে করে এবং বিশ্বাস করে তারাই সমাজের সমস্ত কিছুর একমাত্র জিম্মাদার, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই। তাদের দমন করতে হবে, তাদের চিন্তার একচেটিয়াতা ভেঙে দিতে হবে, আর সমাজকে মুক্ত করতে হলে এই শ্রেণীর কুসংস্কারের মূলে আঘাত হানতে হবে।

The dilemma of Ultra Nationalist fanatics... and Donald Trump



Donald Trump will become an example for all the nationalists and Ultra Nationalist political fanatics across the world. Who thinks that a Nationalist leader can change the fate of a country and he will go against the deep state and establishment .But in reality he will be the victim of the deep state and establishment. 

In any country where such a person rises to power ,someone who believes that nation comes first, someone who sees himself as the one to reshape the country's destiny with his own hands , Someone who sees himself as a messiah, and whose supporters also see him as the savior and messiah of the nation, both the fanatic leaders and their supporters should mind it that the Ultra Nationalist leaders can't do anything for the nation moreover  he will create more chaos and destructions for the Nations. 

Donald Trump consistently said that he would not push the United States into any new war. In his earliest speeches, he made it clear that America should not attack Iran. He openly criticized previous leaders who had escalated conflict. So the question arises, even in a superpower like the USA, where the President seemingly holds ultimate power, what actually happened?

Could Donald Trump truly go against the so called deep state or military industrial establishment?
Was he really able to resist war initiatives, or did he end up serving the very agenda he once opposed?

গনতন্ত্রই ছাড়া কি মুক্তি নেই ?

আমাদের একটা ভুল কনসেপ্ট আছে যে গণতন্ত্র ছাড়া জনগণের প্রকৃত  ক্ষমতায়ন হবে না, বা জনগণ ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। মানে গণতন্ত্রই হচ্ছে একমাত্র ওয়ে যেখানে জনগণ ক্ষমতাকে নিজেদের মনে করবে।  আমাদের ভেতরে ঢুকায়া দেওয়া হয় যে গণতন্ত্রের হত্যা মানে জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল টুকু হারিয়ে যাওয়া এই চিন্তা আমাদেরকে ত্যাগ করতে হবে ও এই কনসেপ্টটা কে রেফিউট  করতে হবে আমাদের। দেখেন আমাদেরকে বুঝতে হবে গণতন্ত্র কোন চিরস্থায়ী ব্যবস্থা না, গণতন্ত্র যুগ যুগ ধরে মানুষ ,মানবতা, সমাজ ও সামাজিকতার কথা বলে এসেছে তা কিন্তু না। একমাত্র গণতন্ত্রই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে , প্রকৃত মুক্তির স্বাদ মানুষকে দিতে পারে, এই ধারণা আমাদেরকে ত্যাগ করতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে গণতন্ত্র, জাস্ট ওয়ে টু এলেক্ট অর সিলেক্টে এ রাজা অর প্রাইম মিনিস্টার অফ কান্ট্রি ওর স্টেট  আবার এটাও বলা যায়  টু ইলেক্ট এ পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ। এর বাইরে গণতন্ত্রকে অপরিবর্তনীয় এবং গণতন্ত্র ছাড়া আমাদের চলবেই না গণতন্ত্র না হলে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হবে না ,জনগণ গণতন্ত্র ছাড়া নিজেদেরকে প্রকৃত মালিক মনে করতে পারবে না, এই ধারণা রাখা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। 

আমাদেরকে এটাও মাথায় রাখতে হবে, একটা চরম স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থায়ও জনগণ ক্ষমতার স্বাদ পেতে পারে, যদি সেই স্বৈরশাসক মানবিক ও দরদী হয়। একজন রাজা,  রাজতন্ত্রে তার জনগণকে প্রকৃত ক্ষমতার স্বাদ দিতে পারে, যদি তিনি মানবতাবাদী হন এবং পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা এই ধরনের প্রচুর উদাহরণ পেয়ে যাব। 

গণতন্ত্রের যাত্রা মূলত বিংশ শতাব্দীর পরেই।  যদিও আমাদেরকে শেখানো হয় গ্রীস রোমানদের যে সভ্যতা এবং সভ্যতার বিকাশ সেটা গণতন্ত্রের মাধ্যমে কিন্তু আমাদেরকে বুঝতে হবে গ্রীস এবং রোমান যে গণতন্ত্র সেটা মূলত কোন প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না, গণতন্ত্রের নামে সেখানে এলিটতন্ত্রের একটা প্রয়োগ ঘটেছিল, যেখানে এলিটেরা নিজেদের মধ্যে থেকেই তাদের শাসক নিয়োগ দি গণতন্ত্র ই গণতন্ত্র (
গণতন্ত্রের যে আধুনিক ধারণা সেটা মূলত বিংশ শতাব্দীর পর থেকে এসেছে । আমাদেরকে এবং নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গণতন্ত্রের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে দ্বারা হচ্ছে, এবং এ বিষয়টাও আমাদেরকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যেন গণতন্ত্র ছাড়া আমাদের কোন উপায় নাই, গণতন্ত্রের শেষ মানে মানবতার মানুষের শেষ, এবং এই বিষয়গুলোকে আমাদের  ভেতরে এমন ভাবে সেটাপ করে দেয়া হচ্ছে যে গণতন্ত্র ছাড়া আর কোন ওয়ে নাই যেন গণতন্ত্র ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই, গণতন্ত্র ছাড়া গরীব দুঃখী মানুষের কোন স্বাধীনতা নাই । কিন্তু আসলেই কি গণতন্ত্র ছাড়া আমাদের কোন মুক্তি নাই?

চরম উগ্রতায় নাস্তিক ও আস্তিকতার মিল যেখানে

১.
একজন নাস্তিক তখনই প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্র হয়ে ওঠে, যখন সে চায়, তার নাস্তিকতা, তার ঈশ্বরে অবিশ্বাস, এটি সবাই জানুক এবং সবাই যেন ধর্মের অসারতা ও অপ্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে। অর্থাৎ, যখন একজন নাস্তিক নিজেকে নাস্তিকতার একপ্রকার প্রচারক (preacher) মনে করে এবং নাস্তিকতা প্রচারের জন্য আকুল হয়ে ওঠে, তখনই সে এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে, একজন ডানপন্থী, উগ্র ধার্মিক কিংবা অন্ধ বিশ্বাসীর মতোই প্রতিক্রিয়াশীল ও কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ করতে থাকে।

একজন ধার্মিক ও একজন নাস্তিকের মধ্যে পার্থক্য মূলত তাদের চিন্তাগত গঠনে। একজন ধার্মিক মনে করেন, তিনি অন্যদের তুলনায় একজন ভালো মানুষ ,শুদ্ধ, পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং তিনি এক 'গ্রেটার পাওয়ার' এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজেকে এক উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে স্থাপন করেন। 

২.
অন্যদিকে একজন নাস্তিক মনে করেন, তিনি জ্ঞানী; তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঈশ্বর, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে অসার ও অপ্রয়োজনীয় হিসেবে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। একজন নাস্তিক তার চিন্তাকে সুপিরিয়র মনে করে। 
এখানেই গড়ে ওঠে আত্মচেতনার এক ভিন্ন ধরণ। একজন নাস্তিক, প্রায়শই নিজেকে পৃথিবীর আর সব মানুষের চেয়ে ভিন্ন, অধিকতর চিন্তাশীল এবং যুক্তিবাদী মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর চিন্তাই একমাত্র 'শুদ্ধচিন্তা', এবং সমাজের অন্যান্য মানুষ জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে নিকৃষ্ট। ফলে, তিনি অন্যদের চিন্তা-চেতনাকে নগণ্য বা দুর্বল বলে মনে করেন। 

৩.
আর এই ভিন্নধর্মী দুই মেরুর চিন্তাধারার কারণেই আপনি একজন নাস্তিক ও একজন উগ্র ডানপন্থী ধার্মিককে এক কাতারে  প্রতিক্রিয়াশীল বলে অভিহিত করতে পারেন। তারা উভয়েই, যদিও বিপরীত মতাদর্শে দাঁড়িয়ে, একরকম উগ্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণ করে এবং সমাজে দ্বন্দ্ব, অসহিষ্ণুতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। একজন প্রতিক্রিয়াশীল নাস্তিক ও একজন প্রতিক্রিয়াশীল ধার্মিক এই দুই চরম অবস্থান সমাজের জন্য সমানভাবে বিপজ্জনক। তারা একে অপরকে বাতিল করতে চায়, কিন্তু ফলাফল হয় একই, বৈচিত্র্যের প্রতি অবজ্ঞা, পারস্পরিক শ্রদ্ধার অবলুপ্তি, এবং সমাজে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি। আজকের সমাজে অশান্তি ও বিভাজনের মূল উৎপাদক অনেকাংশেই এই দুই ধরনের চরমপন্থী মানসিকতা।

সমাজের স্বাধীন অথরিটি ও রাষ্ট্রের বৈধতার সীমানা

এই আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসমূহের কারণে বর্তমানে সমাজের অথরিটি রাষ্ট্র স্বীকার করতে চায় না। এই কারণেই আপনি দেখবেন, সমাজে ও রাষ্ট্রে একটা chaos বিদ্যমান। সমাজের তার অস্তিত্বের হুমকি স্বরূপ সমাজবিরোধী যেকোনো প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার বা প্রতিরোধ করার যে প্রয়াস, রাষ্ট্র তা বরাবরই অবৈধ বলে গণ্য করে এবং আইন-আদালতের মাধ্যমে বিষয়টিকে নিষিদ্ধ করে রাখে। এর ফলে যা ঘটে তা হলো, সমাজ তার স্বকীয়তা হারায়, সমাজের নিজস্বতা বিলুপ্ত হয়।

রাষ্ট্রের কাছে সমাজের অথরিটি বিলীন হওয়ার ফলে ব্যক্তিরাও সমাজকে হেয়  ও ডিমীন করতে থাকে। সমাজকে তারা নগণ্য ও অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে, সমাজের value system বা  ইথিক্স ,মূল্যবোধ, ইতিহাস ,ঐতিহ্য থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক ও অনুপযোগী বলে প্রতিভাত হয়। ব্যক্তি সমাজের কোনো authority-কে স্বীকার করতে চায় না। সমাজের স্বাধীন অথরিটি তার কাছে একরকম irrelevance বা সময়চ্যুততায় পরিণত হয়। 

যদিও ব্যক্তি সমাজের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে, তবুও সমাজের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে সে অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ মনে করে। কারণ ব্যক্তি চাই অশেষ স্বাধীনতা ও অফুরন্ত লিবার্টি এবং যেটার ঘোষণার মাধ্যমে একটা দেশ রাষ্ট্র হয়ে ওঠে এবং সোসাইটি ব্যক্তির অফুরন্ত লিবার্টিকে একটা সীমার মধ্যে রাখতে চাই যেখানেই ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজের বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়। ব্যক্তির লিবার্টিকে রাষ্ট্র মেনে নিলেও সমাজ ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সহজে মানতে চায় না। এ কারণেই রাষ্ট্র ও ব্যক্তি মিলে সমাজকে ও সমাজের স্বাধীন অথরিটিকে অস্বীকার করে।

দেখুন, সমাজ কেবলমাত্র বাস করার জায়গা নয়। কারণ, বর্তমানে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি মিলে সমাজ এবং সমাজের ধারণাকে এমনভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে, যেন সমাজ শুধু সবাই মিলে সহাবস্থানের একটি পরিসর, যেখানে সমাজ উদার চিত্তে প্রত্যেক মত, পথ ও ঘরানার সবাইকে একসাথে নিয়ে বাস করে। But আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজের কাজ কেবল ব্যক্তিকে জায়গা দেওয়া নয়, ব্যক্তির বাসস্থান তৈরি করা নয়। সমাজের পরিকাঠামো ও পরিসর আরও ব্যাপক, আরও গভীর। সমাজের একটি নিজস্বতা রয়েছে, এবং এই নিজস্বতা, স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্রতা ফুটে ওঠে তখনই, যখন সমাজ নিজে অথরিটি হয়ে ওঠে।

এই অথরিটি তখনই কার্যকর হয়, যখন সমাজ তার মূল্যবোধবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডকে কিংবা মূল্যবোধবিরোধী যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। আর এই নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য সমাজের একটি আলাদা পদ্ধতি থাকে, যার মাধ্যমে সে ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

আধুনিক সময়ে মূল সমস্যাটা এখানেই, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সমাজকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম কাঠামো হিসেবে দেখতে চায় না। বরং রাষ্ট্র বরাবরই চায় সমাজের কোনো সার্বভৌমত্ব না থাকুক। এ কারণেই আপনি দেখবেন, সমাজের নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধমূলক পদ্ধতিকে রাষ্ট্র সবসময় অবৈধ বলে ঘোষণা করে। আর এখানেই সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল দ্বন্দ্ব নিহিত। আর এই দ্বন্দ্বের মূল কারিগর হচ্ছে ব্যক্তির স্বৈরতান্ত্রিকতা ও ব্যক্তির মূল্যবোধ বিরোধী লিবার্টি ও তার প্রয়োগ।

ইসলামে ইবাদতের ধারণা ও সামাজিকতা

ইসলামের মৌলিক যে কাঠামো বা পাঁচটি স্তম্ভ নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত , তার প্রতিটিই মৌলিকভাবে সামাজিকতার অংশ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হোক বা হজ, কিংবা যাকাতের মতো আর্থিক দায়িত্ব , এসব প্রতিটি ইবাদতেই সমাজের অন্যদের সম্পৃক্ত করতে হয়। ইসলাম এভাবেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর অংশ করে তোলে, যেখানে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য। ইসলাম ব্যক্তিগত এবাদতের মাধ্যমে সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেয়। 

ইসলাম আমাদের শেখায় হাউ টু বি এ ‘social being’ , হাউ টু বি  ‘socially attached’ ও ‘kind-hearted’ ব্যক্তি হিসেবে সমাজে বেঁচে থাকা যায়। আজকের এই individualism এর যুগে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর  global citizen ( যেখানে পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তের মানুষ একে অপরের সম্পর্কে জানে ,বোঝে ও জ্ঞান  রাখে)  ধারণার মধ্যেও   ব্যক্তি ক্রমাগত তার নিজস্ব বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, সেখানে ইসলামের এই সামাজিক ও সমষ্টিকেন্দ্রিক ইবাদতসমূহ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হাজির করে। এই আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে , একটি সহানুভূতিশীল, সংবেদনশীল ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। 

আপনার পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। আপনার সমাজের প্রতিটি শিশুকে , সে পরিচিত হোক বা না হোক সালামি দিন। কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে হোন উদার। মনে রাখবেন, এগুলো হয়তো আপনার কাছে ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ (এবাদত) মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এগুলোই সমাজে শান্তি, সহানুভূতি ও ঐক্য রক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। এইসব এবাদতই সমাজকে একটা সফল সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে।

বাংলার মানুষ এর নিকট নির্বাচনের প্রতি এত বেশি অনীহা তৈরি হল কেন?












বাংলার মানুষ নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার, গণতান্ত্রিক সরকার অথবা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এত বেশি ঘৃণা করে কেন, যেটা আমলা বা আমলাতান্ত্রিক, কিংবা সেনাবাহিনীর সামরিক সরকার, এদের দ্বারা পরিচালিত যে কোনো সরকারকে বাংলার মানুষ ঠিক ততটা ঘৃণা করে না? এর কোনো রিজন বা কারণ রাজনীতিবিদরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আমার তো মনে হয়, না। না হলে এখনো রাজনীতিবিদরা নির্লজ্জের মতো ভোট! ভোট!  করে যেতেন না।

দেখুন, এটা কিন্তু একটা চিন্তার বিষয়। কেননা গত ১৬ থেকে ১৭ বছর বাংলাদেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলার মানুষ দেখেনি। আবার স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যত গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে-গেছে, বাংলার মানুষ সেইভাবে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা যে কী, তা কখনোই উপলব্ধি করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারেররা কখনোই বাংলার জনগণকে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধি করাতে পারেনি ,এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা, রাজনীতিবিদদের আর কি হতে পারে?

এর অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতি, দুঃশাসন,  অপশাসন ও জনগণকে দাস মনে করা। একের পর এক তাবর-তাবর রাজনীতিবিদ এসেছে, দেশ শাসন করেছে, তবুও দেশের মানুষের ভাগ্যের সেইরকম কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এবং ওই সব মহান রাজনীতিবিদদের কর্মীরা ও তাদের দলের রাজনৈতিক কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষকে যেভাবে নির্যাতন করেছে, দাসসুলভ আচরণে মানুষকে হেয় করেছে, তাতে বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক কর্মীবাহিনীর প্রতি এক ধরনের চাপা দুঃখ ও ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছে। যে ঘৃণা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং ভবিষ্যতে বাড়বে বলে আমার মনে হয়। এই কারণেই দেখা যাচ্ছে, গত ১৭ বছর নির্বাচন না হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। তারা চায় সংস্কার, দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন। তারা জানে, নির্বাচিত কোনো সরকার আসা মানেই তাদের কর্মীবাহিনী দেশের মানুষকে মানুষ মনে করবে না। এটাই বারবার ঘটেছে। আর সেই পুনরাবৃত্তির কারণেই নির্বাচনের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে।

আমাদের নবাগত প্রজন্মের মধ্যেও রাজনীতিবিদদের এই ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। তারা ইতিহাস ঘেটে দেখেছে ,এই রাজনীতিবিদরা দেশের কোন ধরনের পরিবর্তন করতে পারেনি ,এরা শুধু দুর্নীতির মধ্যেই ছিল, এরা অপসাশন , দুঃশাসন এবং জনগণকে যেভাবে পারা যায় শোষণ করে গেছে।  তাদের ঘৃণাও রাজনীতিবিদদের ব্যাপকভাবে ভোগাবে বলে আমার মনে হয় । সুতরাং নতুন প্রজন্ম চাই দেশে পরিবর্তন আসুক, কাঠামোগত একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ,  নতুন দেশ হিসেবে পরিগণিত হোক।  তারা চায় , দেশে একটা ভালো ধরনের পরিবর্তন হোক এবং এ পরিবর্তন সেটা সামরিক সরকারই হোক না কেন কিবা অনির্বাচিত যে কোন সরকারই হোক না কেন ইতিবাচক পরিবর্তন হলেই হবে। এটার জন্য তারা সেটা গণতান্ত্রিক সরকার কি বা অবনতান্ত্রিক সরকার তাদের নিকট এটার কোন গুরুত্ব রাখে না। 


সুতরাং, এই অনীহা কাটানোর জন্য , আমাদের রাজনীতিবিদদের এ ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এই অনীহা শুধু আজকের বিষয় নয় , গত ৫০ বছর এবং  ৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান আমলেও নির্বাচিত সরকার ও  রাজনৈতিক দল , কখনোই বাংলা বা পাকিস্তানের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাস্তবে কিছু করতে পারেনি। এদের নিকট ক্ষমতা ও ক্ষমতার রাজনীতি ছাড়া কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। তারা বাংলার জনগণ ও নাগরিক সমাজকে শুধু ক্ষমতার জন্যই ব্যবহার করে গেছে।

জনগণ দেখেছে, নির্বাচিত সরকারও দেশের কোনো ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কার করতে পারে না। তারা  জানে, নির্বাচিত সরকার মানেই তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। সুতরাং, এই পরিস্থিতিতে শুধু নির্বাচন দিয়েই যদি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে আবার ‘মূলা ধরিয়ে দেওয়া’র মতো নাটক করা হয়, তাহলে বাংলার মানুষ আর সেই মুলা নিতে চায় না। তারা একটা স্থায়ী পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক আমুল পরিবর্তন দেখতে চায়।  এই পরিবর্তনের জন্য গণতান্ত্রিক সরকার এই যে গুরুত্বপূর্ণ এটা তারা ভাবতেও চায়না। সুতরাং তাদের নিকট ভোট ও ভোটের রাজনীতি কোন গুরুত্বই রাখে না। 

নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিকে তারা ঘৃণা করে। তারা চায় মানুষের জন্য , নাগরিক রাজনীতি, নাগরিক সুবিধা আদায়ের রাজনীতি, যাতে বাংলাদেশে আবার ফিরে আসে নতুন আশার রাজনীতি। সুতরাং, আমাদের বড় বড় রাজনৈতিক দলসমূহের উচিত , মানুষের চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণাকে আমলে নিয়ে নিজেদের সংস্কার করা এবং দেশের মানুষের নাগরিক রাজনীতির প্রতি যাতে আগ্রহ বাড়ে , সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া।

হোমলেসনেস, সামাজিকতা গ্রাম ও শহরে

১।
দেখেন সামাজিক ব্রেক ডাউন যখন হবে, মানে আপনার ওই সমাজে হোমলেসনেস এর সংখ্যা বেড়ে যাবে। দেখেন পৃথিবীর তাবক যত শহর আছে বড় বড় শহর প্রত্যেকটা শহরের সোশ্যাল রুলস রেগুলেশনস , ইন্সট্রাকশনস ভ্যালুস কাস্টমস কাজ করে না । ফলে আপনি বলতে পারেন ওই সব দেশ ও শহরে সামাজিকতা কোন ইফেকটিভ কিছু নয়। সেইসব বড় বড় শহরের সামাজিকতা মূলত একটা জাস্ট ফেইস এর আলাদা কোন গুরুত্ব নাই। এর ফলে দেখবেন ওই সব সোসাইটিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে গৃহহীন ঘরহীন দারিদ্র মানুষের প্রচুর আনাগোনা।  এবং তুলনামূলক যেসব জায়গাতে সামাজিক ও সামাজিকতার প্রভাবটা প্রচুর ওইসব সমাজে আপনি দেখবেন দারিদ্রতা রয়েছে বাট গৃহীন এর সংখ্যা খুবই কম নেই বললেই চলে। অর্থাৎ সামাজিক মূল্যবোধ ও সামাজিকতার গুরুত্ব যে সোসাইটিতে বেশি সোসাইটিতে দারিদ্র থাকলেও গ্রহীন এবং ঘরহীনদের সংখ্যা খুবই নগণ্য নেই বললেই চলে। 

২।
এটার কারণ কী?
এটার মূল কারণ হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজ তো কানেকশনের একটি বিষয় ,এখানে ব্যক্তি ও ব্যক্তিরা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, এবং এই সংযোগ মূলত ভ্যালুজ ও মূল্যবোধ হিসেবেই পরিচিত। এই কারণেই ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ একে অপরকে চেনে এবং চিনে রাখে। এর ফলেই আপনি গ্রামে গৃহহীন ও ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা খুব একটা দেখতে পাবেন না, যেটা শহরে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কারণ, শহরে মানুষে-মানুষে যে সংযোগ, তা অনেক বেশি লুজ বা দুর্বল। আর এই দুর্বল সংযোগের কারণেই শহরের সমাজে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট বা আবেগগত সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে না। এই ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের অভাব থেকেই শহরে মানুষে-মানুষের মধ্যে যে দয়া, মমতা ও ভালোবাসা থাকা উচিত, সেটা অনেক কম দেখা যায়। আর ঠিক এই কারণেই শহরে গৃহহীন ও ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা এত বেশি। কারণ গ্রামের সমস্ত গৃহীন ও ঘর ছাড়া মানুষ শহরে এসে বাস করে লোক লজ্জার ভয়ে যেটা গ্রামে সম্ভব না। হয়তো গ্রামে দয়া মমতা বেশি বাট দয়ামতাহীন শহরে লোক লজ্জার ভয়েই এই গৃহহীন রা এখানে আশ্রয় নেই।

বৈশ্বিক সভ্যতা ও সামাজিক অস্তিত্বহীনতা

A.
আচ্ছা, এই আধুনিক সময়ে সমাজের ভেতরের যে চিত্র, সেখানে একটা বড় গলদ দেখা যাচ্ছে ,আমাদের নবাগত ও অনাগত প্রজন্ম সমাজের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব ক্রমশ কম অনুভব করছে। তারা এক ধরনের মিশ্র ভাবনা নিয়ে বড় হচ্ছে, যেটাকে আমরা বলতে পারি ‘গ্লোবাল ওয়ার্ল্ড’। এই গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডের কালচার, সভ্যতা, ধারণা, ধ্যান সবকিছুর প্রভাবে তারা গঠিত হচ্ছে।
এবং এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ,মানুষের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে মৌলিক বিষয়, অর্থাৎ সামাজিক অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা ,এটি ক্রমাগতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, গ্লোবাল কালচারের চাপে তা হ্রাস পাচ্ছে।
মিশ্র বৈশ্বিক সভ্যতার যে ব্যাপক অগ্রসর মানসিকতা, তার ভালো দিক থাকলেও এর ভয়াবহ কিছু দিকও রয়েছে। এর একটি হচ্ছে সমাজের প্রতি মানুষের অকৃতজ্ঞতা, এবং সমাজের প্রতি মানুষের যে লয়ালটি ,তা ভেঙে পড়ছে।

B.
তবে এখনো কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা সমাজের প্রতি অনুগত; যারা সমাজের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চিন্তাভাবনা করেন। তবে তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য, কোটিতে হাতে গোনা। আর সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতিটা এখানেই।
অগ্রসরমান বৈশ্বিক সভ্যতাকে জায়গা দিতে গিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র এন্টিটি, সোসাইটি ,তার নিজস্ব কালচার ও সভ্যতাকে বাইপাস করছে। এই প্রবণতা মানুষের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে এই ভবিষ্যৎ খুবই দুর্বল, নিকট ভবিষ্যতেই আমরা এর ফল অনুভব করব।

সমাজ আসলে কি ?

সমাজ আসলে কি ? এই কোশ্চেনটা যদি আমরা করি, যে উত্তরটা পায় ,তা কিন্তু খুবই স্বাভাবিক এবং খুবই সহজ। মানুষ সহজেই বুঝতে পারে, এমন একটা কোশ্চেন, আসলে সমাজ কি? 

সমাজ হচ্ছে মানুষের একাকিত্বকে ডিনাই করা, মানুষের একাকিত্বের বিপরীত অবস্থাকে আমরা সমাজ বলতে পারি। ফলে একজন ব্যক্তি যখন একাকীত্ব ফিল করে তখন বুঝতে হবে ব্যক্তির সমাজের সাথে নিজেকে এডপ্ট করতে পারছে না । একাকীত্বকে রুখে দিতেই মূলত সমাজের প্রয়োজন। মানুষ কখনোই একাকীত্বকে ভালবাসেনি একা ও থাকেনি সে সবার মাঝে নিজের পরিচয় আত্ম উপলব্ধির মাধ্যমে সে নিজেকে চিনেছে নিজেকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং এটার অধিকাংশ ক্রেডিট যাবে সমাজের প্রতি। যদিও সমাজ কোন সেলফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিষয় না, সমাজ হচ্ছে একটা বিষয় যে মানুষের উপরই নির্ভর করে সে আসলেই কেমন সমাজ চাই কিভাবে চাই কাদের সাথে চায়। সমাজের পরিচয় ফুটে ওঠে ব্যক্তি বর্গের উপর। সমাজের সব ব্যক্তিরা যখন তাদের ইন্ডিভিজুয়ালিটি কে বাই পাস করে সমগ্র হয়ে ওঠে তখনই একটা সমাজ সার্থকতা লাভ করে। সমাজের আরো অনেক বিষয় আছে যা ব্যক্তি থেকে সমাজে প্রবাহিত হয়। সমাজের কোন চাওয়া-পাওয়া নেই ,চাওয়া পাওয়া মূলত ব্যক্তির। সমাজের কোন চাহিদা নেই, চাহিদা মূলত ব্যক্তির। সমাজে এর আসলে কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই ,সমস্ত প্রয়োজন মূলত ব্যক্তির। সুতরাং ব্যক্তির কমফোর্ট কে পূরণ করতেই সমাজের আবির্ভাব ,সমাজের প্রয়োজন। সমাজ ব্যক্তিকে কমফোর্ট করবে, ব্যক্তি-সমগ্র কে কন্ট্রোল করবে এবং ব্যক্তি ও ব্যক্তির সমূহের সমস্ত কিছুকে ধারণ করে সমাজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এর বাইরে মূলত সমাজের কোন কিছুই নাই। সমাজের অস্তিত্বও নেই সমাজের নিজ পরিচয় বলে কোন কিছুই নাই। আর সমাজ কি এর সহজ উত্তর হচ্ছে এটাই। 

সামরিক বাহিনীর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ অর্থাৎ রাষ্ট্র হিসেবে আপনার দেশ ব্যর্থ হবেই হবে

পৃথিবীর যেসব দেশে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, সেই প্রতিটি দেশই নানা রকম সংকট ও জটিলতায় জর্জরিত এবং রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে। আপনি যে দেশই দেখেন না কেন, পাকিস্তান, মিশর, ইরান, তুরস্ক কিংবা মিয়ানমার প্রত্যেকটি উদাহরণেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যেখানে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে, সেখানে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দমননীতি এবং অস্থিরতা জন্ম নিয়েছে।

সেনাবাহিনীর একমাত্র কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের বাইরের যেকোনো ধরনের হুমকি বা আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা তাদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে, বরং তা তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সমস্যার মূল শিকড়টি নিহিত রয়েছে তৃতীয় বিশ্বের সেই সব দেশের মানসিকতায়, যেখানে সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্য মনে করেন, দেশের প্রকৃত রক্ষক কেবল তারাই; দেশপ্রেম, সাহস, এবং নেতৃত্বের ‘ক্যালিবার’ শুধুমাত্র তাদের মধ্যেই আছে। তারা ধারণা করেন, রাজনীতিবিদ বা সাধারণ জনগণ দেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যথেষ্ট যোগ্য নন। এই আত্মঅহংকার থেকেই জন্ম নেয় সামরিক হস্তক্ষেপ, যা কখনোই কাম্য নয়।

সেনাবাহিনীকে বুঝতে হবে ,রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনীতি, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা , এই তিনটি ক্ষেত্রের নিজস্ব গতি ও গণ্ডি আছে। দুর্নীতি যদি রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকে, সেটা সামরিক বাহিনীর মধ্যেও থেকে যেতে পারে। একে দমন করতে হলে সংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পথ খুঁজে নিতে হবে; সামরিক অভ্যুত্থান বা হস্তক্ষেপ নয়।

রাজনীতিবিদ, আমলা এবং সেনাবাহিনীর প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা আছে। কেউ কারো বিকল্প নয়, কেউ কারো প্রতিপক্ষও নয়। এই সীমারেখা লঙ্ঘন করলেই রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়ে, এবং রাষ্ট্র ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হয়।

উগ্র ডানপন্থী সরকার ও তার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শত্রুতা

যেকোনো দেশের উগ্র ডানপন্থী সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এক ধরনের শত্রুতার মনোভাব পোষণ করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সন্দেহের চোখে দেখে, কারণ এসব জায়গা থেকে যুক্তিবাদ, সমালোচনামূলক চিন্তা, এবং স্বাধীন মত প্রকাশের চর্চা গড়ে ওঠে, যা উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহ্য করতে পারে না, কারণ উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারা মূলত স্বল্পশিক্ষিত, আবেগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল। কারণ তাদের বিভ্রান্ত করা সহজ, এবং তারা প্রশ্ন কম তোলে, সহজে বিভ্রান্ত করতে পারে। সেটা মোদী , ট্রাম্প , এরদোয়ান,  বলসোনারো হোক কিবা হাভিয়ের মিলে, এই উগ্র ডানপন্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে  গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়। এই প্যাটার্নটা আপনি স্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন ভারতের JNU  বা জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কে যেভাবে বিজেপি আরএসএস দ্বারা  আক্রমণ করা হয় ।  এই একই কান্ড করেছে ট্রাম্প হার্ভাডের সাথে। 

আমাদের একটি বিষয় জেনে রাখতে হবে , হয়তো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কোনো দেশ বা  জাতি, ধর্ম,  সংস্কৃতির ধারক ও বাহক নয়, কিন্তু একটি দেশের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং মানবাধিকার রক্ষায় এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উগ্র ডানপন্থীরা বরাবরই মৌলিক অধিকার এবং মানবাধিকার বিষয়ক ধারণাগুলোর প্রতি গভীর বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। এই কারণেই দেখা যায়, উগ্র ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদরা প্রায়শই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিছক বিদ্রোহ বা  দেশদ্রোহী কার্যক্রমের ঘাঁটি হিসেবে তুলে ধরে, যাতে জনগণের মধ্যে এদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করা যায়।

রাষ্ট্রের প্রয়োজন নাগরিক জ্ঞান, দেশপ্রেম নয়! রাষ্ট্রের উচিত তার নাগরিকদেরকে নাগরিক জ্ঞান দেওয়া, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা নয়!

একটি দেশের জনগণ শুধুমাত্র আদর্শবাদ, দেশপ্রেম বা চেতনা দিয়ে কখনোই একটি রাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন বা উন্নত করতে পারে না। এগুলো কোনোভাবেই রাষ্ট্রের উন্নতির প্রকৃত উপায় নয়। একটি রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নাগরিকদের মধ্যে সিভিক সচেতনতা  বা নাগরিক জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করা। দেশপ্রেম, চেতনা বা দেশের প্রতি ভালোবাসা একটি রাষ্ট্রকে কখনোই উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। এ ধরনের আলোচনা রাজনীতিবিদদের কাজ হতে পারে, কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রকে গঠন ও উন্নত করতে চায়, তাদের জন্য এই ধরনের আদর্শবাদী ভাষা বা শূন্য বুলি যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র গঠনের জন্য দেশপ্রেম বা চেতনার বাইরে একটি সুনির্দিষ্ট নাগরিক জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে নাগরিক সেন্স বা সিভিক সেন্স কী? নাগরিক সেন্স বা সিভিক সেন্স হলো এমন একটি মানসিকতা ও আচরণবোধ, যা একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা স্বেচ্ছায় সভ্য, ভদ্র এবং দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করে এবং সামাজিক নিয়মকানুন ও নৈতিকতা মেনে চলে।অর্থাৎ, নাগরিক সেন্স হলো এমন একটি জ্ঞান ও সচেতনতা, যার মাধ্যমে একজন নাগরিক বুঝতে পারে কোন কাজটি শালীন, কোনটি অন্যের জন্য ক্ষতিকর, এবং কোনটি সমাজ বা পরিবেশের ক্ষতি করে। এই সচেতনতার ভিত্তিতে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই নাগরিক সেন্সের মূল উদ্দেশ্য। 
সিভিক সেন্স  ও দেশপ্রেমের মধ্যে  পার্থক্য রয়েছে! আপনার রাষ্ট্রকে আপনি কেমন দেখতে চান এবং সেটার বাস্তব প্রয়োগ,  কিন্তু দেশপ্রেম আপনাকে একটা ইউটুপিয়ান চিন্তা ধারণ করতে শেখায় এবং নিজের রাষ্ট্রের নাগরিককে শত্রু জ্ঞান করতে শেখায়, বিভাজন ও বিভক্তির পথে হাটে। 
অন্যদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা, সামান্য কথায় কাউকে দেশদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করা, দেশ বা জাতির শত্রু মনে করা, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা, বা কারো দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা, এগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং বস্তিবাসীদের ঝগড়ার মতো আচরণ। আর মুখগুলাই হচ্ছে দেশপ্রেম ও চেতনার বাই প্রোডাক্ট। একটি দেশকে  ও তার নাগরিকদেরকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড, চিন্তা  থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের এ ব্যাপারে আরও বেশি সংযত হওয়া প্রয়োজন।

বিপরীত মতাদর্শের ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে গালি নয়, যুক্তির ভাষা শেখা জরুরি !

ধরা যাক, আপনার কাছে কোনো একটি মতবাদ বা আদর্শ খারাপ বলে মনে হচ্ছে, কিংবা সেটি সাধারণের দৃষ্টিতেও অনৈতিক বা ক্ষতিকর বলে বিবেচিত, অথবা সেই মতবাদটি আপনার ব্যক্তিগত বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী অবস্থান করছে। তবুও, যদি কেউ সেই মতবাদ বা আদর্শ সম্পর্কে একটি প্রকাশ্য সোশাল মিডিয়া পোস্ট করে বা বিপরীত মতবাদের সমর্থন জানায় তাই বলে আমাদের উচিত নয় কেবল বিরোধিতা করার কারণে তাকে তার পোস্টে গিয়ে তাকে অন্ধভাবে আক্রমণ করা বা কমেন্টের মাধ্যমে গালিগালাজে মেতে ওঠা। আবার এমন মন্তব্য করাও সমীচীন নয় যেখানে কেউ না জেনে না বুঝে কেবল শুনা কথার ভিত্তিতে বলে দিচ্ছে যে মতবাদটি সমাজের বিরুদ্ধে।
ধরা যাক, কোনো একজন নারীবাদী ফেসবুকে পোস্ট করলেন যে, নারী উন্নয়ন কমিশনের কোনো কার্যক্রম ইসলামবিদ্বেষী কিনা, তিনি তা জানতে চাচ্ছেন বা কোন নাস্তিক জানতে চাচ্ছেন যে কেন ধর্মের বিরুদ্ধে সে কথা বলতে পারবে না ? সাধারণ মানুষের এখানে বোঝা উচিত, এমন পোস্ট দেখে অযথা বিক্ষিপ্ত ও খারাপ বা হুমকি মুলক কোন মন্তব্য করার দরকার নেই। মন্তব্যে বলা উচিত নয় যে “এইসব তো ইহুদী-খ্রিস্টানরা বানিয়েছে” কিংবা পশ্চিমারা নারীর স্বাধীনতার নামে আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চায় , শালা নাস্তিক, শাহাবাগি, বা এমন কোন গালি যা আসলে কোন ভাল কিছু বয়ে আনেনা । আবার, সেই ব্যক্তিকে তার পরিবার তুলেও গালিগালাজ করাও উচিত নয়। এতে লাভ তো হয়ই না, বরং ক্ষতি হয়। আপনি যে তাদের গালি গালাজ করে দেশ , জাতি ও আপনার ধর্ম কে উদ্ধার করে ফেলছেন তাও কিন্তু না ।
যেমন, আপনি ইচ্ছেমতো তসলিমা নাসরিনকে, আসাদ নুর কে গালি দিতে পারেন না, বা কোনো নাস্তিককে কেবল তার মতবাদে দ্বিমত থাকার কারণে গালি দেওয়ার অধিকারও আপনার নেই। অযথা তাদের প্রোফাইলে গিয়ে এমন মন্তব্য করা একপ্রকার নিজের বিশ্বাসের ক্ষতিসাধন করে। আবার আপনার সমমনা যারা জানে ও তাদের কে কাউন্তার দিতে সক্ষম তাদের কে আপনার দুর্বল করেন। আমরা আরও দেখি, কোনো নায়ক বা নায়িকার ফেসবুক পোস্টে গিয়ে অনেকেই অহেতুক গালিগালাজ করে। এ ধরনের আচরণ থেকেও আমাদের বিরত থাকা উচিত। বরং বোঝা উচিত, এই আচরণগুলো দিনের শেষে কাউকে উপকার করে না, বরং সমাজের মানসিকতা ও পরিবেশকে আরও কলুষিত করে তোলে।
তাই আমাদের সমাজের নেতৃত্বদানকারী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের উচিত এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক নেতিবাচক কার্যকলাপ যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা। আমাদের সবাইকে বোঝাতে হবে যে, কোনো ব্যক্তির প্রোফাইলে গিয়ে মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে , আমি কি এই বিষয়ে মন্তব্য করার যোগ্যতা রাখি? যেটি নিয়ে পোস্ট করা হয়েছে, সেটি কি আমার বোধগম্য? যদি হয়ও, তাহলেও মন্তব্য এমনভাবে করতে হবে যাতে তা নেতিবাচক, অপমানজনক বা আক্রমণাত্মক না হয়। কেবল এই ভেবে যে আমি একটি মন্তব্য করে সমাজ, জাতি, ধর্ম বা দেশকে রক্ষা করে ফেলেছি, এই রকম আত্মতুষ্টিমূলক ধারণা থেকে মন্তব্য করা উচিত নয়।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...